রূপকথা নয়

      No Comments on রূপকথা নয়
রূপকথা নয়
— দীপ্তেন্দু চক্রবর্ত্তী

— ১ —
স্কুল থেকে বাড়ী ফিরতেই পিসির খ্যাঁচখ্যাঁচানি।
– ব্যাগ সোফায় রাখবি না, জুতো-মোজা একসাথে রাখবি, ইউনিফর্ম বাথরুমের খালি গামলায় রাখবি।
পিসিকে চটালে বকতেই থাকবে, থামবে না। খেলতে দেরী হয়ে যাবে। তাই চটপট স্নান করে পিসির কাছে গা মুছিয়েই দৌড়ে মায়ের ঘরে চলে গেল। আস্তে করে আলনার র‍্যাক থেকে মায়ের লাল শাড়ীটা তুলে নিল। গামছার ওপর জড়িয়ে, সুন্দর করে কুচি করল, মা যেমন আঁচল প্লিট করে তেমন করে প্লিট করল। ভুরুর মাঝে আয়না খুঁটে পাওয়া লাল টিপ পরল, ড্রেসিং টেবিল হাটকে পাওয়া গোলাপী লিপস্টিক যত্ন করে ঠোঁটে বুলিয়ে, ইমিটিশনের চুড়ি-হার পরে বড় আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের থেকে নিজেই চোখ ফেরাতে পারছে না।
— ২ —
স্কুল শেষ। সবাই হয় খেলছে নয় বাড়ী ফেরার জন্য নীচে নামছে। ক্লাস থেকে বেরোনর সময় চোখের ইশারা দেখে নিয়েছে। বাথরুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে চট করে দুপাশ দেখে প্রথম থেকে তিন নং বাথরুমে ঢুকে পরল।
-এত দেরী করলি?
-কি করব সবাই তো নামছিল একসাথে। ফাঁকা না হলে আসব কি করে।
-আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি এখানে তোর জন্য।
-রাগ করে না মনা..
ফিসফিস থেমে যায়, শরীর দু’টো ছোট্ট বাথরুমে আরো কাছাকাছি হয়।
— ৩ —
কলেজে ক্লাসের পর প্রায়ই দু’জনে চলে যায় এসপ্লানেড, পার্কস্ট্রীট। সিটিমার্ট, বাজার কোলকাতা হয়ে শ্রীরাম আর্কেড।
হাত খরচের অল্প টাকাতে বড় রেস্টুরেন্ট হয়না, তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না।
রাস্তার চাউ, রোল, ফুচকা তো আছে। বছরে কয়েকদিন হাতে টাকা বেশী থাকলে পিপিং বা হাতিবাগান চত্বরে গেলে বিরিয়ানী কর্ণার।
খাওয়া বা কেনা তো বাহানা, একসাথে যতক্ষণ থাকা যায় সেটাই ওদের বাড়তি পাওনা। ভীড়ের মাঝে হাত না ধরলেও আঙুলে আঙুলে জট পাকে মাঝে মাঝে। আর কথা কিন্তু ফুরোয় না, তাই নটেগাছটিও চড়চড় করে বাড়তে থাকে। শহরতলির আকাশ ছেড়ে কলকাতার আকাশ খুঁজতে থাকে ডালপালা মেলে।
— ৪ —
লাইট টা জ্বলতেই বিছানার চাদর টাই গায়ে টেনে নিল।
– লজ্জা পাচ্ছিস নাকি?
– ন্যাকামো করিস না। তুই সব সময় শেষ হলেই স্নান করতে চলে যাস কেন রে?
– আরে এমনি যাই, তুই এটা নিয়ে আবার প্যাঁচ কষাস না।
– এক জায়গায় পড়েছিলাম এরপর সাথে সাথে স্নান করা মানে সে সমস্ত কিছু ধুয়ে ফেলতে চায়, পছন্দ করে না।
– তুই আর তোর পড়া। সত্যি কোত্থেকে যে কি পড়িস। মনা তোমাকে আমি খুব ভালবাসি এটা বোঝ না? না হলে অফিস ফেরত তোমার কাছে দৌড়ে আসি?
উদোম শরীর ধুম করে এসে পরে আরেক উদোম গায়ে। বিছানার চাদর সরে যায় অভিমান মেটাতে।
— ৫ —
২২শে জুন রাত ২:৪০
ঘুম আসেনি। একসাথে সিনেমা দেখার পর শুতে এসেছে। কিন্তু মাথা থেকে কিছুতেই খচখচানিটা যাচ্ছে না। ওর ঘুমানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। ঘুমিয়ে পরতেই আস্তে উঠে হাতে মোবাইল টা নিল। সিনেমা দেখার সময় প্যাটার্ন টা দেখে নিয়েছিল।
কললিস্ট- লাস্ট কল বিকেল ৩টেয়।
মেসেজ ইনবক্স- কোন মেসেজ নেই।
মেয়েটার নাম দেখতে না পেয়ে খুব মন খারাপ লাগছে। নিজেকে প্রচন্ড ঘেন্না করছে। ওর ঘুমন্ত মুখ টা শিশুর মতন সরল। “ছিঃ!” এটুকুতেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল ভেবে নিজেকেই ধিক্কার দিল।
“করুক না রোজ সন্ধ্যেবেলায় ফোন, হোক না ফেসবুকে বন্ধু, বারান্দায় গিয়েও কথা বলুক তাতে কি এমন এসে যায় যে সন্দেহের বশে চোরের মতন ফোন ঘাঁটতে হয়।”
ফোনের লক বোতাম টা টিপতে গিয়ে একটু থমকে দাঁড়ায়।
হোয়াটস্ অ্যাপ আইকন টা কি জ্বলজ্বল করছে!
দেখব না দেখব না করেও আঙুল স্পর্শ করে মোবাইলের ত্বক।
নামটা প্রথমেই আছে..।
কিন্তু এটা কি! একি দেখছে ও..!
-সোনা তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, ঘুমাও। আই লাভ ইয়ু
-বাবু তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।
বুকে যেন হাতুড়ি পিটছে, পা দু’টো মেঝেতে গেঁথে গেল। গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে আটকে আছে।
কে শুয়ে আছে বিছানায় ওটা? চিনতে পারছে না। ও কে? কে ও?
— ৬ —
তিন বছর পার হয়ে গেছে..।
অনন্য অফিস ফেরত গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে মাঝে মাঝে। একা।
কালো জলে ওপারের আলো ঝিকমিক করে। ছোটবেলার সেই লাল শাড়ীটার পাড় টা ঠিক ওরকম ছিল না?
কোচিং ফেরত প্রায়ই একদল ছেলেমেয়ে আসে। তাদের কলকল, ফুচকা, ঝালমুড়ি, পাপড়ি চাট, লঞ্চের ভোঁ। জমজমাট গঙ্গার ঘাট। কিন্তু অনন্যের মনের নিঃসঙ্গতা কি কাটে?
কলকাতায় তখন..
রণজয় বান্ধবীর হাত ধরে রেস্টুরেন্টে ঢোকে।
জীবন মেতে ওঠে উল্লাসে।
অক্ষত মমির মতন হোয়াটস্ অ্যাপে পরে থাকে শুধু “আই লাভ ইউ মনা।”
———
[ছবিঃ অরূপ দাস]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *