রূপকথা নয়

রূপকথা নয়
— দীপ্তেন্দু চক্রবর্ত্তী

— ১ —
স্কুল থেকে বাড়ী ফিরতেই পিসির খ্যাঁচখ্যাঁচানি।
– ব্যাগ সোফায় রাখবি না, জুতো-মোজা একসাথে রাখবি, ইউনিফর্ম বাথরুমের খালি গামলায় রাখবি।
পিসিকে চটালে বকতেই থাকবে, থামবে না। খেলতে দেরী হয়ে যাবে। তাই চটপট স্নান করে পিসির কাছে গা মুছিয়েই দৌড়ে মায়ের ঘরে চলে গেল। আস্তে করে আলনার র‍্যাক থেকে মায়ের লাল শাড়ীটা তুলে নিল। গামছার ওপর জড়িয়ে, সুন্দর করে কুচি করল, মা যেমন আঁচল প্লিট করে তেমন করে প্লিট করল। ভুরুর মাঝে আয়না খুঁটে পাওয়া লাল টিপ পরল, ড্রেসিং টেবিল হাটকে পাওয়া গোলাপী লিপস্টিক যত্ন করে ঠোঁটে বুলিয়ে, ইমিটিশনের চুড়ি-হার পরে বড় আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের থেকে নিজেই চোখ ফেরাতে পারছে না।
— ২ —
স্কুল শেষ। সবাই হয় খেলছে নয় বাড়ী ফেরার জন্য নীচে নামছে। ক্লাস থেকে বেরোনর সময় চোখের ইশারা দেখে নিয়েছে। বাথরুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে চট করে দুপাশ দেখে প্রথম থেকে তিন নং বাথরুমে ঢুকে পরল।
-এত দেরী করলি?
-কি করব সবাই তো নামছিল একসাথে। ফাঁকা না হলে আসব কি করে।
-আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি এখানে তোর জন্য।
-রাগ করে না মনা..
ফিসফিস থেমে যায়, শরীর দু’টো ছোট্ট বাথরুমে আরো কাছাকাছি হয়।
— ৩ —
কলেজে ক্লাসের পর প্রায়ই দু’জনে চলে যায় এসপ্লানেড, পার্কস্ট্রীট। সিটিমার্ট, বাজার কোলকাতা হয়ে শ্রীরাম আর্কেড।
হাত খরচের অল্প টাকাতে বড় রেস্টুরেন্ট হয়না, তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না।
রাস্তার চাউ, রোল, ফুচকা তো আছে। বছরে কয়েকদিন হাতে টাকা বেশী থাকলে পিপিং বা হাতিবাগান চত্বরে গেলে বিরিয়ানী কর্ণার।
খাওয়া বা কেনা তো বাহানা, একসাথে যতক্ষণ থাকা যায় সেটাই ওদের বাড়তি পাওনা। ভীড়ের মাঝে হাত না ধরলেও আঙুলে আঙুলে জট পাকে মাঝে মাঝে। আর কথা কিন্তু ফুরোয় না, তাই নটেগাছটিও চড়চড় করে বাড়তে থাকে। শহরতলির আকাশ ছেড়ে কলকাতার আকাশ খুঁজতে থাকে ডালপালা মেলে।
— ৪ —
লাইট টা জ্বলতেই বিছানার চাদর টাই গায়ে টেনে নিল।
– লজ্জা পাচ্ছিস নাকি?
– ন্যাকামো করিস না। তুই সব সময় শেষ হলেই স্নান করতে চলে যাস কেন রে?
– আরে এমনি যাই, তুই এটা নিয়ে আবার প্যাঁচ কষাস না।
– এক জায়গায় পড়েছিলাম এরপর সাথে সাথে স্নান করা মানে সে সমস্ত কিছু ধুয়ে ফেলতে চায়, পছন্দ করে না।
– তুই আর তোর পড়া। সত্যি কোত্থেকে যে কি পড়িস। মনা তোমাকে আমি খুব ভালবাসি এটা বোঝ না? না হলে অফিস ফেরত তোমার কাছে দৌড়ে আসি?
উদোম শরীর ধুম করে এসে পরে আরেক উদোম গায়ে। বিছানার চাদর সরে যায় অভিমান মেটাতে।
— ৫ —
২২শে জুন রাত ২:৪০
ঘুম আসেনি। একসাথে সিনেমা দেখার পর শুতে এসেছে। কিন্তু মাথা থেকে কিছুতেই খচখচানিটা যাচ্ছে না। ওর ঘুমানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। ঘুমিয়ে পরতেই আস্তে উঠে হাতে মোবাইল টা নিল। সিনেমা দেখার সময় প্যাটার্ন টা দেখে নিয়েছিল।
কললিস্ট- লাস্ট কল বিকেল ৩টেয়।
মেসেজ ইনবক্স- কোন মেসেজ নেই।
মেয়েটার নাম দেখতে না পেয়ে খুব মন খারাপ লাগছে। নিজেকে প্রচন্ড ঘেন্না করছে। ওর ঘুমন্ত মুখ টা শিশুর মতন সরল। “ছিঃ!” এটুকুতেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল ভেবে নিজেকেই ধিক্কার দিল।
“করুক না রোজ সন্ধ্যেবেলায় ফোন, হোক না ফেসবুকে বন্ধু, বারান্দায় গিয়েও কথা বলুক তাতে কি এমন এসে যায় যে সন্দেহের বশে চোরের মতন ফোন ঘাঁটতে হয়।”
ফোনের লক বোতাম টা টিপতে গিয়ে একটু থমকে দাঁড়ায়।
হোয়াটস্ অ্যাপ আইকন টা কি জ্বলজ্বল করছে!
দেখব না দেখব না করেও আঙুল স্পর্শ করে মোবাইলের ত্বক।
নামটা প্রথমেই আছে..।
কিন্তু এটা কি! একি দেখছে ও..!
-সোনা তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, ঘুমাও।    আই লাভ ইয়ু
-বাবু তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।
বুকে যেন হাতুড়ি পিটছে, পা দু’টো মেঝেতে গেঁথে গেল। গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে আটকে আছে।
কে শুয়ে আছে বিছানায় ওটা? চিনতে পারছে না। ও কে? কে ও?
— ৬ —
তিন বছর পার হয়ে গেছে..।
অনন্য অফিস ফেরত গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে মাঝে মাঝে। একা।
কালো জলে ওপারের আলো ঝিকমিক করে। ছোটবেলার সেই লাল শাড়ীটার পাড় টা ঠিক ওরকম ছিল না?
কোচিং ফেরত প্রায়ই একদল ছেলেমেয়ে আসে। তাদের কলকল, ফুচকা, ঝালমুড়ি, পাপড়ি চাট, লঞ্চের ভোঁ। জমজমাট গঙ্গার ঘাট। কিন্তু অনন্যের মনের নিঃসঙ্গতা কি কাটে?
কলকাতায় তখন..
রণজয় বান্ধবীর হাত ধরে রেস্টুরেন্টে ঢোকে।
জীবন মেতে ওঠে উল্লাসে।
অক্ষত মমির মতন হোয়াটস্ অ্যাপে পরে থাকে শুধু “আই লাভ ইউ মনা।”
———
[ছবিঃ অরূপ দাস]

ধারা ৩৭৭ – খবর এখন (চোখ রাখুন কখন কি হচ্ছে জানতে)

ধারা ৩৭৭ – খবর এখন (চোখ রাখুন কখন কি হচ্ছে জানতে)

** আইনি হিসেব নিকেশ বুঝিনা, যেটুকু বুঝি সেটুকুই বন্ধুদের জন্যে সংক্ষেপে

১৭ই জুলাই ২০১৮

১০. যেসকল পক্ষ ৩৭৭এর এই মামলায় পক্ষে/বিপক্ষে সওয়াল করেছেন, তাদের সবাইকে সুপ্রিমকোর্ট এই শুক্রবার (২০শে জুলাই) এর মধ্যে তাদের বক্তব্য লিখিতভাবে জমা দিতে বলেছে। এবার শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।

৯. এর পরে আরো দুই উকিল ৩৭৭ ধারার পক্ষে সওয়াল করেন এবং এর সাথেই শেষ হলো ৩৭৭ ধারার শুনানি।

৮. দুপুরের খাওয়ারের পরে আরেক আইনজীবী রাধাকৃষ্ণণ আবারো এইডসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে বিচারক ইন্দু মালহোত্রা জানান, এইডস কিন্তু শুধু সমকামী নয় বিসমকামীদের মধ্যেও ছড়ায়। বিচারক চন্দ্রচূড় জানান গ্রামের কোন বিসমকামী পুরুষ বাইরে গিয়ে মারণরোগ বহণ করে গ্রামে নিজের পরিবারের মধ্যে ছড়ায়। অসুবিধেটা যৌনক্রীয়ার নয়, বরং অসুরক্ষিত যৌনক্রীয়ার।

৭. শ্রী জর্জ অনুরোধ করেন যাতে ৩৭৭কে জামিনযোগ্য করা হয়, আর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছায়ারা যাতে এই ধারার আওতায় কাউকে গ্রেপ্তার না করা যায়, শুধু এইটুকুই যেন পরিবর্তন আনা হয়, এই বলে তিনি রণে ভঙ্গ দেন, থুড়ি, ক্ষান্ত হন।

৬. শ্রী জর্জ জানান অবাধ সমকামিতা এইডস প্রভৃতি ছোঁয়াচে রোগের কারন, যার উত্তরে বিচারক চন্দ্রচূড় বলেন সঠিক তথ্য আর রোগীদের গ্রহণযোগ্যতাই ছোঁয়াচে রোগের প্রসারে রাশ টানোট সাহায্য করে। এ বিশয়ে জাসটিস নারিমান খুব সুন্দর একটি বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন যৌনকর্মীদের নিয়েও এভাবে ভাবা যায়। যদি যৌনকর্মীদের কাজকে আইনি বৈধতা দেওয়া যায়, আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে তাদেরো স্বাস্থ্য আর অধিকারকে সুনিশ্চিত করা যাবে৷ আজ ৩৭৭ ধারার শুনানি যৌনকর্মীদের লড়াইকেও আরো এক ধাপ এগিয়ে দিলো।

৫. শ্রী জর্জের কথার উত্তরে বিচারক শ্রী নারিমান আরো একটি সুন্দর মন্তব্য করেন। তিনি জানান যে মৌলিক অধিকারের মূল লক্ষ্যই হলো, বস্তাপচা সেইসব আইন যেগুলিকে সংখ্যাগুরু তোষণের সরকার সরাতে চায়না সেগুলিকে বাতিল করা। আর সুপ্রিমকোর্ট এই ব্যাপারে সরকারের জন্যে অপেক্ষা করবেনা। কোন আইন যদি সংবিধানের পরিপন্থী হয়, কোর্টই তা বাতিল করে দেবে।

৪. শ্রী জর্জ ৩৭৭ ধারা সরে গেলে অন্যান্য আরো অসুবিধে হতে পারে বলে জানান। বিচারক নারিমান জানান তাতে সমস্যা নেই, সে শিশুকামিতা, পশুকামিতা ইত্যাদিকে ৩৭৭এর আওতায় একইভাবে রেখে দেওয়া যাবে না হয়।

৩. শ্রী জর্জ যে লিখিত বয়ান কোর্টের সামনে পেশ করেন, তাতেও এই বিদ্বেষের ছোয়াঁচ যথেষ্ট। মূখ্য বিচারক শ্রী মিশ্রা ওনাকে দোন কিখোতে-র কবিতা পড়ার পরামর্শ দেন৷ যাতে উনি ভালোবাসা সম্পর্কে নিজের ধারণাকে আরো প্রসারিত করতে পারেন।

২. দুটি খ্রিস্টান সংগঠনের হয়ে আইনজীবি মনোজ জর্জ সওয়াল করছেন। এবং এই নিরিখে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের কিছু মন্তব্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। শ্রী জর্জ একটি সমীক্ষা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করে বলেন বয়ঃসন্ধিতে সমলিঙ্গে আকর্ষণ পরিণত বয়সে আর থাকেনা। এত উত্তরে বিচারক চন্দ্রচূড় বলেন, যে ওয়েবসাইটে এই সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে তাতে লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের প্রতি প্রভূত বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে।

১. শুনানি শুরুর অপেক্ষায়।

১৬ই জুলাই ২০১৮

১. আজ সুপ্রিমকোর্টে ৩৭৭ ধারার শুনানি নেই, তবে জানা যাচ্ছে এ বিষয়ে সর্বভারতীয় মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড আবার পালটি খেয়েছে। তারা আজ জানিয়েছে যে তারা ৩৭৭ ধারাকে সমর্থন করেন। বোর্ডের তরফে শ্রী জাফরইয়াব জিলানি জানান যে “সমকামিতা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক”। ভারতের সরকার ৩৭৭ ধারার বিষয়ে কোর্টে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ায় বোর্ড আপসোস জ্ঞাপন করে। শ্রী জিলানি বলেন “কেন্দ্রীয় সরকারের উচিৎ ছিলো ৩৭৭এর পক্ষে সুপ্রিমকোর্টে আইনি ভাবে সওয়াল করা”। তাহলে সর্বভারতীয় মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড কি আইনিভাবে আমাদের পথের কাঁটা হতে চলেছে সুপ্রিমকোর্টে? এর উত্তর সময়ই দেবে।

১৩ই জুলাই ২০১৮

১. আজ সুপ্রিমকোর্টে ধারা ৩৭৭এর কোন শুনানি নেই। তবে জানা যাচ্ছে যে সর্বভারতীয় মুসল পারসোনাল ল বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছে যে তারা ৩৭৭এর ভবিষ্যৎ সুপ্রিম কোর্টের হাতেই ছেড়ে দেবে। অর্থাৎ শুনানি চলাকালীন তারা কোনভাবে আইনী পদ্ধতি অবলম্বন করে এর পক্ষে বা বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করবেনা।

১২ই জুলাই ২০১৮

৭. শুনানি আবার মঙ্গলবার ১৭ তারিখ। আজকের মতো শেষ।

৬. মূখ্য বিচারক দীপক মিশ্রা মন্তব্য করেছেন কোর্ট কখনোই সংখ্যাগুরু মানসিকতার উপরে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করবেনা। করবে সাংবিধানিক ভিত্তির উপরে।

৫. রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ জানিয়েছে যদিও ৩৭৭ ধারায় কাউকে আইনের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত করার পক্ষে তারা নন, কিন্তু সমকামিতা কখনোই ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।

৪. সর্বভারতীয় মুসলিম পার্সোনাম ল বোর্ডের সদস্য সৈয়দ কাসিম রসুল জানিয়েছেন যে তারাও ৩৭৭ এর পক্ষে সওয়াল করবেন। তিনি জানান সমকামিতা সমস্ত ধর্মেই নিন্দিত।

৩. এপস্টলিক চার্চের তরফে আইনজীবি শ্রী মনোজ ভি জর্জ ৩৭৭ এর পক্ষে পিটিশন জমা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন বাইবেলের মতে সোডমি বা পায়ুমেহণ গর্হিত অপরাধ।

২. অপেক্ষা শেষ । শুনানি আবার শুরু

১. সকাল সাড়ে এগারোটার অপেক্ষা

১১ই জুলাই ২০১৮

৯. শুনানি আবার কাল চালু হবে।

৮. বিভিন্ন আবেদনকারীর পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবীরা যে সকল বিষয় উত্থাপন করেছেন, তার মধ্যে লিঙ্গ-যৌন-সংখ্যালঘুদের একসাথে মিলত হয়ে সংগঠন তৈরির পক্ষে বাঁধা এবং নালসা জাজমেন্টের পরেও রূপান্তরকামীদের পুলিশি নিগ্রহ গুরুত্বপূর্ন ।

৭. জানা যাচ্ছে যে মূখ্য বিচারক দীপক মিশ্রা মন্তব্য করেছেন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরা নিজেদের ইচ্ছেয় নিজেদের ঘরে বিছানায় কি করবেন তা কখনোই বেয়াইনি হতে পারেনা। আশার আলো দেখছেন লিঙ্গ-যৌন-মানবাধিকারকর্মীরা।

৬. বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে যে কোর্টের তরফে মন্তব্য করা হয়েছে যে যৌনতা মানুষ নিজে পছন্দ করে বেছে নেয়না।

৫. সুপ্রিমকোর্টের রায় যেন কোনভাবে “বিকৃতরুচি” প্রদর্শনের রাস্তা খুলে না দেয় সে বিষয়ে নজর রাখারও অনুরোধ রাখা হয়েছে সরকারের হলফনামায়।

৪. কেন্দ্রীয় সরকারের হলফনামায় এও বলা আছে যে যদি এই শুনানি ৩৭৭ ধারার সাংবিধানিকত্ব অথবা দুজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক সম্মতিতে যৌনতার বাইরে গিয়ে বিয়ে বা দত্তক ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রসর হয়, তাহলে সরকার আরো সুনির্দিষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করবে।

৩. বিচারক শ্রী চন্দ্রচূড় মন্তব্য করেছেন যে কোর্ট কখনোই চাইবেনা যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হাতধরাধরি করে সমুদ্রসৈকতে হাঁটাচলা করলে পুলিশ তাদের ৩৭৭এর অছিলায় বন্দি করবে।

২. কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিমকোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছে যে ৩৭৭ ধারা নিয়ে তারা কোন অবস্থান নেবেননা। উল্লেখ্য গতকাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যম/সূত্র থেকে পাওয়া খবরে এ বিশয়ে বিভিন্ন জল্পনা তৈরি হয়েছিলো, সে সবের অবসান ঘটলো। ২০১৩ সালে সুপ্রিমকোর্ট সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছিলো ধারা ৩৭৭ ধারায় প্রয়োজনীয় রদবদল আনতে। এখন আবার সেটি বুমেরাং হয়ে ফিরে এলো কোর্টেরই কাছে। আবার এই সরকারই গতকাল শুনানি শুরুর আগে আরো একমাস সময় চেয়েছিলো নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে।

১. ১১ই জুলাই শুনানি শুরু হওয়ার অপেক্ষা।
১০ই জুলাই ২০১৮

১৭. কে কে ভেনুগোপালন, এটর্নি জেনারেল, জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ৩৭৭ ধারার পক্ষে সওয়াল করবে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় সরকার চায়, ৩৭৭ ধারা যেমন আছে, সেভাবেই বহাল তবিয়তে টিকে থাকুক।

১৬. আজকের মতো শুনানি শেষ। শুনানি কাল আবার শুরু হবে।
১৫. বিচারক শ্রীমতী ইন্দু মালহোতরা মন্তব্য করেছেন, সমকামিতা শুধু মানুষের মধ্যেই নয় প্রাণীজগতে বিভিন্ন প্রজাতিতেও এর অস্তিত্ব রয়েছে।
১৪. ৩৭৭ ধারার যৌক্তিকতাকে প্রশ্ন করে আবেদনকারী কেশব সূরির পক্ষে সওয়াল করছেন আইনজীবী অরবিন্দ দাতার।
১৩. সুব্রমনিয়ম স্বামী ৩৭৭ ধারার রয়ে যাওয়ার পক্ষে সওয়াল করার পড়ে রামদেব বাবা জানিয়েছেন ৩৭৭ ধারা সরে গেলে সারা দেশে এই নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচী নেওয়া হবে।
১২. কেন্দ্রীয় সরকার সম্ভবত আজই এ বিশয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবে।
১১. শুনানি আবার চালু হয়েছে।
১০. সুপ্রিমকোর্টে এখন দুপুরের খাওয়ার বিরতি চলছে, এবং আজকে আর কি সামনে আসে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
৯. কেন্দ্রীয় সরকার এলজিবিটি (লিঙ্গ-যৌণ-সমান্তরাল) মানুষদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
৮. শ্রী দীপক মিশ্রা জানিয়েছেন বিয়ে বা সন্তান দত্তক নেওয়ার বিষয়গুলি নির্দিষ্টভাবে ৩৭৭ ধারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পড়ে আলোচনা হবে।
৭. শ্রী ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় সিং মন্তব্য করেছেন যৌনতার অধিকার মানুষের বৃহত্তর অধিকারের মধ্যে পড়ে।
৬. আইনজীবী মুকুল রোহাতগি, লিঙ্গ-যৌন-সমান্তরাল (এলজিবিটি+) মানুষদের সপক্ষে কোর্টে সওয়াল করছেন।
৫. সুপ্রিমকোর্টের তরফে জানানো হয়েছে যে শুধুমাত্র আইনজীবীরাই নন, অন্যান্য অনেকেই এ ব্যাপারে কোর্টে নিজেদের বক্তব্য রাখতে পারে।
৪. শ্রী রোহিনতন এফ নারিমান মন্তব্য করেছেন যে যৌন অভিমুখিতা কখনই অপ্রাকৃতিক নয়।
৩. সরকারী আইনজীবী শ্রী তুষার মেহতার তরফে জানানো হয়েছে, শুনানি চলাকালীন সরকার নিজের অবস্থান কোর্টকে জানাবে। এবং সরকারকে আরো সময় দেওয়া উচিৎ ছিলো বলে জানিয়েছেন।
২. পাঁচজন বিচারক এই শুনানি শুনছেন। আছেন মুখ্য বিচারক শ্রী দীপক মিশ্রা, বাকি চারজন হলেন শ্রীমতী ইন্দু মালহোতরা, শ্রী এ কে খানউইলকার, শ্রী ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় সিং এবং শ্রী রোহিনতন এফ নারিমান।
১. ৩৭৭ ধারার শুনানি শুরু হয়েছে সুপ্রিমকোর্টে আজ বেলা সাড়ে এগারোটায়।
[ছবিঃ অরূপ দাস]

কাল সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারার শুনানি – অপেক্ষায় আমরা সবাই

কাল সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারার শুনানি – অপেক্ষায় আমরা সবাই

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন / নিজস্ব সংবাদদাতা

কাল ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সেই মহা লগ্ন, যার অপেক্ষায় ছিলো ভারতবর্ষের আপামর লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক বা এলজিবিটি নাগরিক। হ্যাঁ, কাল সুপ্রিমকোর্টের পাঁচজন বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় ধারা ৩৭৭, যা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদন্ডের অভিশাপ বয়ে আনতে পারে তাদের জীবনে যারা পুরুষ-লিঙ্গ-দন্ড আর নারী-যোণীর সংগমব্যাতিত অন্য কোনভাবে সংগমসুখে আনন্দলাভ করেন। স্বভাবতই শুধুমাত্র বিছানায় নয়, বিছানার বাইরেও এই ধারা বারবার প্রযুক্ত হয়েছে এলজিবিটি+ মানুষদের হেয় করার জন্যে,বা কখনো ব্ল্যাকমেল করার জন্যেও। ৩৭৭ না সরলে সম-দৈহিক-লিঙ্গে বিবাহের ক্ষেত্রেও রয়ে যাবে এক বড়ো বাধা। বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ন মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার স্পষ্ট করেছে যে সমকামী যৌনাচার সম্পূর্ন স্বাভাবিক । তবুও ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন হিসেবে ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধানেও জায়গা করে নেয় এই বস্তাপচা আইন। শুধু ভারত নয়, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ আরো অনেক দেশই এখনো এই আইনের আওতায় বাঁধা, তারা তাদের লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক নাগরিকদের সমানাধিকার সুনিশ্চিত করতে অক্ষম। তবে কি কাল অন্তত ভারতের ইতিহাস থেকে অবসান হতে চলেছে এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের?

২০০৯ সালে দিল্লী হাইকোর্টের কলমের খোঁচায় অসাংবিধানিক তকমা পায় ৩৭৭, কিন্তু ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে, সুপ্রিমকোর্ট সেই রায়কে নস্যাৎ করে ভারতের সরকারের হাতে দায়িত্ব চাপায় ৩৭৭ ধারা নিয়ে আলোচনা করে তাতে প্রয়োজনীয় রদবদল আনার। কিছু মন্ত্রী আমলা লোকসভা/রাজ্যসভার ভিতরে বা বাইরে এই নিয়ে মাঝেমধ্যে মন্তব্য করেছেন, বা বিল আনারও চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অন্যদিকে সুপ্রিমকোর্টের সামনে এই নিরিখে দাখিল হয়েছে একের পরে আরেক পিটিশন, কখনো মুখচেনা মানবাধিকারকর্মীদের তরফে, কখনো বা সাংস্কৃতিক মহল থেক।

সম্প্রতি আইআইটির ২০জন প্রাক্তনী এবং ছাত্রেরা মিলে আবারো সুবিচার চেয়ে দারস্থ হন সুপ্রিমকোর্টের কাছে, এর নিরিখে মে মাসে কোর্ট বয়ান জারি করে এ বিষয়ে সরকারকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে নির্দেশ দেয়। গড়িমসি করে সরকার সে ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত না দেওয়ায়, সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় ১০ই জুলাই শুনানির তারিখ হিসেবে ধার্য করেন৷ এর পরেই তড়িঘড়ি সরকারের তরফে আর্জি জানানো হয় শুনানির তারিখ আরো এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে। কোর্টের তরফে জানানো হয়েছে, যেহেতু এই বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার জন্যে সরকার প্রায় সাড়ে চার বছর সময় পেয়েছেন, তবুও কিছুই করেনি, তাই আর সময় দেওয়া সম্ভব না। অতএব কাল শুনানি হচ্ছে সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

প্রসংগত উল্লেখ্য, ৩৭৭ ধারার বন্দুকের ডগায়, শুধুমাত্র সমকামী পুরুষেরা নয়, সমকামী নারী, উভকামীরা, এবং সম্পুর্ণরূপে দৈহিক-লিঙ্গ পরিবর্তন না করে ওঠা অথবা করতে না চাওয়া রূপান্তরকামীরাও এর আওতায় আসেন৷ এ ছাড়া প্যান্সেক্স্যুয়াল প্রভৃতি অন্যান্য যৌন-সমান্তরাল মানুষেরাও বাদ যাননা। বিছানায় “পাপ-কাজ” করেছো কি মরেছো।

তবে আর নয়। সম্প্রতি গোপণীয়তার অধিকার, নিজের ইচ্ছে মতো সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার, ইত্যাদি কালজয়ী রায়গুলি অনেকাংশে সুপ্রিমকোর্টকে খানিক বাধ্যই করবে, হয় ৩৭৭ ধারাকে কলমের খোঁচায় বাতিল করতে, অথবা প্রয়োজনীয় রদবদল আনতে। ঐতিহাসিক নালসা রায়ও কাল কোর্টে লিঙ্গ-সমান্তরাল মানুষদের যৌনতার সমানাধিকারকে আবার করে ভাবতে বাধ্য করবে। তবুও না আঁচালে বিশ্বাস নেই বাবা।

সবার পাখির চোখ অতএব কালকের সুপ্রিমকোর্ট। শুনানি কতোদিন ধরে চলবে জানিনা। রায় কি আসতে চলেছে সে ব্যাপারেও আমরা অনিশ্চিত। ধর্মীয় এবং সামাজিক গোঁড়া সংগঠনগুলি এর বিরুদ্ধাচরণ করবে তাও মোটামুটি সুনিশ্চিত । সরকার কি অবস্থান নেবে তাও জানা যাবে হয়তো, যদি আদৌ তারা কোন অবস্থান নেয়। তবে যাই হোকনা কেন, লড়াই এখনো যে অনেকটা বাকি সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই৷ হয় আবার করে লড়াই, নয়তো বৃহত্তর আইনি/সামাজিক পদক্ষেপ, কালকের রায় আমাদের দেখাবে, এরপরের পথচলার রাস্টাটুকু। আপাতত আমাদের শ্লোগান হয়ে উঠুক “৩৭৭ ভারত ছাড়ো”। রামধনু আওয়াজে মুখরিত হোক দেশের আকাশ-বাতাশ-মাটি। ব্রিটিশদের নিজের দেশে ৫০ বছরেরও আগে লুপ্ত আইন, সরে যাক, তাদের এক সময়ের উপনিবেশগুলির থেকেও। ভারতবর্ষ, আবারো পথ দেখাক, সত্যিকার স্বাধীনতার মানে পৌঁছে দিক, ৩৭৭ এর অভিশাপ বয়ে চলা বাকি দেশগুলিকেও।

ছবিসূত্রঃ উইকিপিডিয়া (ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স)


‘রিচ আউট’ উদ্যোগ নিল লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটি অসামান্য অনলাইন লোকেটারের

‘রিচ আউট’ উদ্যোগ নিল লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটি অসামান্য অনলাইন লোকেটারের

 

-অভিষেক (নিজস্ব সংবাদদাতা)

 

যৌন প্রান্তিক মানুষদের শারীরিক ও মানসিক হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয় জীবনের প্রতি পদে পদে। নানাবিধ হেনস্থার প্রমান গোটা দেশে কম নেই , কখনও কর্ম ক্ষেত্রে তো কখনও আপনজনেরাই স্বাভাবিক সম্পর্কের মাঝে দেওয়াল তুলে করে দেয় ব্রাত্য। তাছাড়া অনেকেই জটিল আইনি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অসুবিধাতেও প্রতিনিয়ত জেরবার হচ্ছেন। আর এই ধরনের সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেতে তারা অনেকেই বেছে নেন আত্মহত্যার মত ভয়ানক কোনো রাস্তা। সমস্যাগুলোর সমাধান কোথায় পাওয়া যায় বিশেষ করে কোনো প্রফেশনাল হেল্প কিভাবে পাওয়া যাবে তা খুঁজতেই চলে যায় অনেকটা সময়। এইসব সমস্যার সুরাহার স্বার্থেই বার্তা ট্রাস্ট(কলকাতা) , গ্রাইন্ডার ফর ইকুয়ালিটি (লস এঞ্জেলস) এবং সাথী(চেন্নাই) এক সাথে একটি অনলাইন লোকেটার তৈরি করেছেন যাতে ক্লিক করলেই ভারতের নানা প্রান্তে অবস্থিত যৌন স্বাস্থ্য , মানসিক স্বাস্থ্য ও আইনি বিষয়ক সমমনস্ক ও সহানুভূতিশীল ক্যুয়ের বান্ধব সাহায্যের খোঁজ পাওয়া যাবে সহজেই।

জুন মাস প্রাইড মান্থ হওয়ার সুবাদে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে আয়োজিত হয় নানা অনুষ্ঠান সেখানেই  ২৮শে জুন এই লোকেটারের উদ্বোধন করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি রিচ আউট বলে এক মাল্টিমিডিয়া ক্যাম্পেইনের অন্তর্গত আয়োজিত হয়। বার্তাকে সেই শুরুর দিন থেকেই যৌন প্রান্তিক মানুষেরা স্বাস্থ্য ও আইনি বিষয়ক নানা প্রশ্ন করে থাকেন , সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই এই প্রচেষ্টা।

 

বার্তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পবন ঢাল জানান – “কিছু এলজিবিটি মানুষ স্থানীয় স্তরে স্বাস্থের পরিষেবা গ্রহণ করে থাকেন। অনেকেই নির্ভর করেন অন্যের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের উপর। যদিও বা তথ্যের আদান প্রদান ,আলাপ আলোচনা অনেকটাই আজ অনলাইন হয়ে থাকে, ক্যুয়ের মানুষদের কাছে আজও আইন ও স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্যের অভাব লক্ষ করা যায়। তথ্য প্রযুক্তির দৌলতে আজ নিজের পছন্দ মত যৌনসাথী বা সম্পর্ক তৈরি করা অনেকটাই সহজ। কিন্তু যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয়? যদি স্বাস্থ্য বা আইন সংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হয় বা আপনার সাথী যদি আপনার যৌনতা নিয়ে ব্ল্যাকমইল করে? আমাদের লোকেটার তখন আপনার ভারতে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সাহায্যকারীদের যোগাযোগ করার তথ্য দিয়ে দেবে। সাহায্যকারীদের জন্যেও এই ব্যবস্থা খুব জরুরী কারণ তারা যত ক্যুয়ের মানুষ দেখবেন, তাদের বিকল্প যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচিতি সম্বন্ধে চিন্তাধারাও পালটাবে।”

 

এই মুহূর্তে ভারতের ১৬টি রাজ্য ও ৩০টি বড় ও ছোট শহর সম্বন্ধে তথ্য প্রদান করছে লোকেটরটি। সব থেকে বেশি তথ্য এসেছে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও অসম থেকে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা , বারাসাত, বারুইপুর, বহরমপুর ও ইটাহারের মত ছোট জেলা বা শহর থেকেও তথ্য এসেছে। আরও তথ্য আসলে বোঝা যাবে পরিষেবা কেমন লাগছে সবার এবং এই পরিষেবাকে আরও কিভাবে উন্নততর করে তোলা যায় সেই বিষয়ে একটি সম্যক ধারনাও পাওয়া যাবে।  লোকেটারটি আরও আপডেট করতে সকলের মতামতও গ্রহন করা হবে। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে বিকল্প যৌনতা এবং লিঙ্গ পরিচিতি নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন ফলে তারা এই দুটি রাজ্যের নাগরিক সমাজে কিছু সচেতনতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, তাছাড়া সরকারী সাহায্যও পাওয়া গেছে কিছুটা তাই এই দুটি রাজ্য থেকেই সবচেয়ে বেশি তথ্য এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে বছরখানেক আগে কাঁচালঙ্কাও পশ্চিমবঙ্গ , বাংলাদেশ তথা বিভিন্ন বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলে লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের স্বার্থে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাদের তালিকা তৈরির প্রয়াস নেয়। তাই আমাদের তরফেও আশা থাকল যে রিচ আউট এর এই অভিনব উদ্যোগ আমাদের সেই তালিকাকেও আরও সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করবে।

 

এই লোকেটারটি পাওয়া যাবে বার্তার নিজস্ব ওয়েবপেজে (http://www.vartagensex.org/reachout.php)

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবন ঢাল লোকেটারটি কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা দেখালেন। ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি নিতান্তই সহজ , চারটি বক্স একটিতে বেছে নিতে হবে নির্দিষ্ট শহরের নাম অপরটিতে রয়েছে রাজ্যের নাম, বাদ বাকি দুটো বক্সে ক্লিক করে বেছে নিতে হবে কি ধরনের সাহায্য চাই আপনার, ব্যাস তারপরেই পাওয়া যাবে সাহয্যকারীদের নাম ও অন্যান্য তথ্যের একটি লিস্ট। এই সব পরিষেবা প্রদানকারীরা অত্যন্ত কুয়ের বান্ধব এবং যৌন প্রান্তিক সমস্যা সম্পর্কেও যথেষ্ট সচেতন। পবন ঢাল আরও জানান যে এই লোকেটারের সাহায্য নিতে কোনরকমের লগ ইন করতে হবেনা আর এই লোকেটারটিও কোনও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করবেনা।

 

তবে এই লোকেটার  ক্যুয়ের বা যৌন প্রান্তিক মানুষ ছাড়াও মহিলা , যুব সমাজ , প্রতিবন্ধী ব্যক্তি , এইচ আইভি পজিটিভ ব্যাক্তি প্রভৃতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখেই বানানো হয়েছে। ফলে যারা ক্যুয়ের নন তারাও এর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবেন না।

 

সুপ্রিম কোর্টে আসন্ন ৩৭৭ধারার শুনানি এবং লোকসভায় ট্রান্সজেন্ডার বিল পেশ করার পর এই আইনিপ্রক্রিয়াগুলো নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন আসবেই, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কাজে আসবে এই লোকেটার। গ্রাইন্ডার ফর ইকুয়ালিটির অধিকর্তা জ্যাক হ্যারিসন কুইন্টানা জানালেন যে তাঁরা এই লোকেটারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্যান্য দেশেও লোকেটার তৈরি করার কথা ভাবছেন। তিনি আরও বলেন যে গ্রাইন্ডার এর আগে এর চেয়ে বড় কোনো তথ্য ও পরিষেবা সংক্রান্ত লোকেটারের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।

 

এই উদ্বোধনের পরে এলজিবিটি মানুষদের স্বাস্থ্যের ও আইনি অধিকার নিয়ে একটি আলোচনাসভা বসে। বক্তারা ছিলেন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী ও সমিক্ষনি সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ এন্ড থেরাপির প্রতিষ্ঠাতা জলি লাহা, কলকাতা হাই কোর্টের অ্যাডভোকেট ও যৌনতার অধিকার কর্মী কৌশিক গুপ্ত, এইচ আইভি কাউন্সেলর এবং ন্যাশনাল ইনস্টিউট অফ কলেরা এন্ড এন্টেরিক ডিসিসের যৌন স্বাস্থ্য কর্মী পিয়ালী ঘোষ এবং রুপান্তরকামী অধিকার কর্মী সুদেব সাধু। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন রিচ আউট ক্যাম্পেন ম্যানেজার বৃন্দালক্ষী।

 

এই আলোচনায় উঠে আসে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন সুদেব সাধু বলেন সাম্প্রতিক কালে এলজিবিটি সংক্রান্ত সমস্যা বলতে শুধুই এইচ আইভি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়েই কথা হয়, মানসিক স্বাস্থ্যের কথাকে প্রায় অবজ্ঞাই করা হয়। জলি লাহা সুদেব সাধুর কথায় একমত হয়ে আরোও জানান যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করছেন তাঁরা যৌন প্রান্তিক মানুষদের মানসিক সমস্যার ব্যাপারে একেবারেই অবগত নন আর এর কারণ যথাযথ ট্রেনিং এর অভাব। পিয়ালী ঘোষ এর মতে এই বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছ থেকেও জোটে, অনেক ডাক্তারই যৌন স্বাস্থের ক্ষেত্রে বিষমকামীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাকেই প্রাধান্য দেন সমকামিদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার চেয়ে।

 

তবে আলোচনা শেষে প্রত্যেকেই একমত হন যে আগামীদিনের যাবতীয় পরিবর্তনের জন্য বিকল্প যৌনতার মানুষদের তৈরি থাকতে হবে।

(ছবি সৌজন্যে – বার্তা ট্রাষ্ট)


সায়ান – দ্বিতীয় অধ্যায় – কিছু জানা/অজানা হাসিকান্নার গপ্পো

সায়ান – দ্বিতীয় অধ্যায় – কিছু জানা/অজানা হাসিকান্নার গপ্পো

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন / নিজস্ব সংবাদদাতা

(বাকি আট শহরের সাথে সায়ানের আলোচনায় কোলকাতা / ছবিসূত্রঃ বাপ্পাদিত্য মুখার্জী)

১লা মার্চে প্রথম জন্ম নেওয়ার পর, ২০শে জুন ২০১৮, সায়ান (সাউথ এশিয়ান ইয়ং অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক) -এর দ্বিতীয় অধ্যায়, আগের চেয়ে অনেকটাই বড়ো, অনেকটাই শক্তিশালী। এবারে আর ৪টি নয়, যুক্ত হলো ৯খানি শহর, ভাগ করে নিলো নিজেদের হাসিকান্নার কথা। আমেরিকান কনসুলেটের তরফে অনুরোধ রাখা হয়েছে এই পর্বের গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যে, অতএব বন্ধুদের কাছে আপাতত পৌঁছে দিচ্ছি, দ্বিতীয় পর্বের বিশদ, এক আলোচনা সভা, যার বিষয়বস্তু ছিলো প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌন-পরিচয়ের তরুণদের উপরে ঘটে চলা বৈষম্য। যাতে যুক্ত হলো আরো অনেক গল্প, আরো অনেক আনন্দ/ক্ষোভ/বঞ্চনা।

সমর্পণ মাইতি, শুভাগতা ঘোষ, নমিত বাজোরিয়া, রঞ্জিতা সিনহা এবং বাপ্পাদিত্য মুখার্জি, পাঁচ ধরণের মানুষ, পাঁচমিশালী অভিজ্ঞতা। সকলের সাথে তাদের এই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ রাখেন জে ট্রিলার। এর সাথেই বেড়িয়ে আসতে থাকে একের পরে আরেক বঞ্চনার খবর।

মিঃ গে ইন্ডিয়া এবং মিঃ গে ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানাধিকারী সমর্পণ জানায়, কিভাবে স্কুলে তাকে বিভিন্ন ঠাট্টা তামাশার সম্মুখীন হতে হয়েছে তার নরম মেয়েলী ব্যবহারের জন্যে। সন্তস্ত্র শিশু সমর্পণের ভয় হতো স্কুলে যেতে, অসহ্য লাগতো সবকটা ক্লাস করতে। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষকেরাও অসম্মানসূচক মন্তব্য ছুড়ে দিতো অনায়াসে।

“আগে গ্রামে ছিলাম, সেখান থেকে এলাম কোলকাতায়, আর মিঃ গে ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার সুবাদে পাড়ি দিলাম বিদেশেও। বৈষম্য সব জায়গায় আছে। ধরণটা খালি আলাদা। কলেজে পড়ার সময় মফঃস্বলে এক হোস্টেলে আমায় সমকামী, শুধু এই সন্দেহেই বের করে দেওয়া হয়েছিলো। ভেবেছিলাম কোলকাতা শহরের অবস্থা হয়তো আলাদা। কিন্তু কোথায়? যেই গবেষণাগারে আমি কাজ করতে শুরু করলাম, সেখানেও দেখলাম মেয়েলী ছেলেদের কিভাবে হ্যাটা করা হয়। ভাবলাম, নাহ! আত্মপ্রকাশ করাটা জরুরী, উদাহরণ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরাটা জরুরী। কিন্তু মিঃ গে ইন্ডিয়া হওয়ার সাথে সাথে আমাকেও ওখানে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করা হয়। আমি নাকি সহকর্মীদের উপরে খারাপ প্রভাব বিস্তার করতে পারি। আর এখন অন্য কোন গবেষণাগারে গেলেও আমার উপস্থিতি নিয়ে তারা সচ্ছন্দ নয়। আমার যোগ্যতার চেয়ে আমার যৌনতাটাই বেশী বড়ো হলো?”

“স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি”-র সাথে যুক্ত শুভাগতাদি জানালেন কিভাবে সমকামী মেয়েরাও প্রায় একইভাবে বঞ্চনার শিকার হয়।

“যতক্ষণ মেয়ে চুপচাপ আছে, সব ভালো, যেই মুখ ফুটে বলে ফেললো যে সে আরেকটা মেয়েকে ভালোবাসে, ব্যাস, তখন থেকেই সব শেষ। সবার আগে তো মেয়ের পড়াশোনাটা বন্ধ করো, যাতে জোড় করে বিয়ে দেওয়াটা সুবিধে হয়। যদি কোনভাবে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে বাবা-মা রাই আপিস বয়ে গিয়ে বলে আসেন, দেখবেন, আমার মেয়ে কিন্তু সমকামী, আপনাদের আপিসে বাকি যে মেয়েরা কাজ করেন, তাদের সাবধানে রাখবেন। এরপর আর কার চাকরী থাকে? মফঃস্বলের অবস্থা আরো ভয়ানক। এই গত ২৫শে মেই দুইজন একই কলেজে পড়া মেয়ে আত্মহত্যা করলো। আমাদের হাতে এমন কিছু প্রমাণ এসেছে, যাতে মনে হচ্ছে নিজেদের ভালোবাসাকে পূর্ণতা না দিতে পারার হতাশাই এই আত্মহত্যার কারণ।”

একদিকে সমকামী তরুণীরা যেমন শোষণ হয়ে চলেছে এভাবে, রুপান্তরকামী পুরুষদের অসুবিধে আবার অন্য জায়গায়। শুভাগতাদির ভাষায় স্কুল-কলেজে নিজেদের ইচ্ছে মতো পোশাক না পড়তে পারা, আর অন্যদিকে সঠিক বাথরুম না থাকায় তাদের দৈনন্দিন সাঙ্ঘাতিক সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয়।

কুচিনা সংস্থার কর্ণধার নমিত বাজোরিয়া তুলে ধরলেন সংস্থাদের ভিতরে এলজিবিটি / লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের কাজ দেওয়াটাও কতোটা জরুরি।

“আমি সেভাবে কখনো এই এলজিবিটি কি জিনিষ জানতামই না, বুঝতাম কম বিষয়টা নিয়ে, কিন্তু গত এক সভায় মালদা জেলার রুপান্তরকামী প্রিয়াঙ্কার কথা জানলাম, আমি ঠিক করলাম, নাহ, ৩/৪ বছর ধরে কাজ করে চলা কুচিনা ফাউন্ডেশান, এবার থেকে রুপান্তরকামীদেরও পাশে দাঁড়াবে। আজ আমাদের সহযোগিতায়, প্রিয়াঙ্কা, নিজের জেলায় খুব ভালো কাজ করছে। অন্যদিকে রুপান্তরকামী জিয়াকেও আমি যোগাযোগ করিয়ে দি, মেডিকা হাসপাতালের সাথে। আর আজ সে ভারতের প্রথম ট্রান্স ও.টি. টেকনিশিয়ান। আসলে নিজের লিঙ্গচেতনা অথবা যৌনপরিচয় যাই হোকনা কেন, এক সফল মানুষের সাফল্যটাই পারে সমস্ত বঞ্চনার জবাব হয়ে দাঁড়াতে।”

রূপান্তরকামীদের কথা প্রসঙ্গে রঞ্জিতা সিনহা জানান এলজিবিটি গোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভবত রূপান্তরকামীদেরই বঞ্চনার স্বীকার হতে হয় বেশী, কারণ তাদের নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই।

“ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের কাজ নিয়েও আমি হতাশ। ১৫ই এপ্রিল শ্রেয়া আর জো-এর উপর শ্লীলতাহানির ঘটনায় ট্রান্স বোর্ডের নীরবতা আমায় দুঃখিত করে। আসলে আমাদের জনসমীক্ষায় আরো বেশী করে নথিভুক্ত হতে হবে। ট্রান্সবোর্ড নারী এবং শিশুকল্যান দপ্তরের অধীনে কেন থাকবে? আমরা তো আলাদা। শিক্ষা/স্বাস্থ্য/অন্ন/বস্ত্র এই সামান্যতম প্রয়োজনটুকুও মেটেনা আমাদের। তাই রূপান্তরকামী মানুষদের মানবাধিকারের স্বার্থে আপনারা সবাই এগিয়ে আসুন”।

প্রান্তকথার পুরোধা বাপ্পাদিত্য মুখার্জি জানালেন অভিযোগ না করে, অন্যের জন্যে অপেক্ষা না করে, নিজেদেরই কিছু করে দেখানোর সময় এসেছে। “সতরঙ্গী” উদ্যোগের সাফল্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জানান

“আমাদের নিজেদের সমাধানসূত্র আমাদের নিজেদেরকেই খুঁজে নিতে হবে, কি করবো, কিভাবে করবো, এসব না ভেবে আমরা এগিয়ে যাই বরং। আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। সংবিধানের চোখে আর পাঁচজন নাগরিকের যে অধিকার, আমারও সেই সবকটা অধিকার আছে”।

দর্শকদের কাছে এবার প্রশ্নের জন্যে যাওয়া হলে সেখান থেকেও উঠে আসতে থাকে একের পরে আরেক ঘটনার গাঁথা। অপর্ণা ব্যানার্জি শ্রী নমিত বাজোরিয়ার উদ্দেশ্যে জানান, কিভাবে এলিট ট্রান্স মানুষদের সাথে নিয়ে চলার থেকেও, যাদের সুযোগ সুবিধে কম সেইসব ট্রান্সদের নিয়ে চলা আরো কঠিন।

“নিজের সাফল্যের পরিচয়ে সব বঞ্চনা মুছে দেওয়ার আগে তো চাই শিক্ষা, সেই শিক্ষাটাই তো অধিকাংশ ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের নেই। তাদের আপনি কিভাবে কাজে নিযুক্ত করবেন? তার চেয়ে আপনি কি কোনভাবে আমাদেরকে সুযোগ করে দিতে পারেন, যাতে আমরা বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সের সামনে আমাদের পিছিয়ে পড়া ভাইবোনেদের কথাগুলো তুলে ধরতে পারি? তাদের বোঝাতে পারি কিভাবে সি-এস-আর প্রকল্পগুলিতে আমাদের আরো সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়? আসুননা, আমরা পিছিয়ে পড়ার মধ্যেও আরো বেশী পিছিয়ে পড়া ট্রান্স মানুষদের নিয়ে কথা বলি।”

অন্যদিকে শিক্ষিকা সুচিত্রা জানান কিভাবে একজন সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার তাকে আলাদা করে নিজের চেম্বারে আসার কু-আমন্ত্রণ জানান।

“সব জায়গায় এখনও নাজেহাল হতে হয়। অন্য স্কুলে চাকরি খুঁজবো? ট্রান্সজেন্ডার শুনেই, প্রিন্সিপালরা ফোন নামিয়ে রাখেন। কেউ বলেন ছোট থেকে যতো সার্টিফিকেট, সবগুলিতে নাম পাল্টে আনুন। ইন্টারভিউতে তো একজন পুরুষ অধ্যক্ষ জিজ্ঞেসই করে বসলেন, আমার স্তন থেকে তরল দুধ বেড়ানো সম্ভব কি না, অথবা সঙ্গমের পরে আমি গর্ভধারণ করতে পারবো কি না, ছি!!”।

গল্পের সাথে উঠে এলো কিছু তথ্যও। তিস্তা দাস আর রঞ্জিতা সিনহার কথাসূত্রে জানা গেলো ট্রান্সবোর্ডের অপ্রাসঙ্গিক লিটারারি মিট নিয়ে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের কথা। অন্যদিকে এক দর্শকের প্রশ্নের উত্তরে হিউম্যান রাইটস ল’ নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি জানালেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের শিকার হলে তার জন্যে সুনির্দিষ্ট আইন আছে, কিন্তু লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের জন্যে সেরকম কোন আইন ভারতের দন্ডবিধিতে নেই।

বাংলা থিয়েটারে কর্মরত সুজয় এবং অনুরাগ মৈত্রেয়ী জানালেন। কিভাবে মানবাধিকার এবং মুক্তমনা এই ক্ষেত্রটিতেও বঞ্চনার ঘটনা লুকিয়ে আছে। ট্রান্সজেন্ডার বলে সবরকম পাত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়না ট্রান্স অভিনেতা/অভিনেত্রীদের, কিভাবে অনেক কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অভিনেতা/অভিনেত্রীদের থেকেও তাদের কম টাকা দেওয়া হয়।

“কাজ দিয়েছি, তাতেই তুমি ধন্য হয়ে যাও, ভাবখানা এমনই। আমাদের সাথে কাজ করে নাকি অভিনেতারা সুখ পাননা। তা তারা অভিনয় করতে আসেন? না সুখ নিতে?”

এক হাতে পেয়ে যাওয়া নালসা রায়, অন্য হাতে ৩৭৭ ধারার সংবিধান-বিরোধী অণুচ্ছেদের সরে যাওয়ার স্বপ্ন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই গল্পগুলো জানান দিয়ে গেলো, সত্যিই পথ চলা অনেকটাই বাকি। আগে ছিলোনা পরিচয়ের কোন ভাষা। এখন আস্তে আস্তে নিজেদের পরিচয়ে বাঁচার তাগিদে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচুর মানুষ। রূপান্তরকামী হোক অথবা সমকামী। পড়াশোনা জানা উচ্চশিক্ষিত থেকে শুরু করে নাম না জানা সেইসব আধন্যাংটা পেট ভরে খেতে না পাওয়া হিজড়েরা। শহর হোক বা মফঃস্বল। নাটকে ১৫ বছর ধরে কাজ করা অভিনেত্রী অথবা সদ্য কলেজ পড়ুয়া, বঞ্চনার ভাষারা খালি আলাদা। বৈষম্যের সুরটুকুই অন্যরকম। পুরুষতন্ত্রের বিষবীজ, তা থেকে তৈরি হওয়া অমানবিক মহীরুহ। এই মহীরুহ আমাদেরই উপড়ে ফেলতে হবে। একসাথে। একজোট হয়ে। আমরা পথ চেয়ে রইলাম সায়ানের তৃতীয় পরিচ্ছেদের দিকে।

— o — o — o —


যৌনতায় যখন পরিচয়/সমাপ্তি পর্ব

যৌনতায় যখন পরিচয়/সমাপ্তি পর্ব

— অবকাশে সঞ্জয়

– মহাশয়ের পরিচয়?

– কোন্‌ পরিচয় জানতে চান?

– এ আবার কেমন প্রশ্ন? আপনার পরিচয় জানতে চায়।

– একজন মানুষের তো অনেক রকম পরিচয় হয়। আপনি কোন্‌ টা জানতে চান?

– তাই নাকি!

– হ্যাঁ। আপনার এ নিয়ে কোন সন্দেহ আছে নাকি?

– না, ঠিক সন্দেহ নয়। কিন্তু কেমন একটা ধন্দ লাগছে।

– আমি সেই ধন্দ কাটিয়ে দিচ্ছি। আপনি বলুন তো ঋতুপর্ণ ঘোষ কে ছিলেন?

– কে আবার! একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। আচ্ছা উনি কি সত্যিই ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলের সঙ্গে…

– সত্যজিৎ রায় কে ছিলেন?

– ওরে বাবা, উনিও বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। একমাত্র বাঙালী যিনি অস্কার পেয়েছেন। – ঋতুপর্ণ ঘোষও প্রচুর আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। আপনি কিন্তু সেই আলোচনায় গেলেন না।

– না মানে…

– মানে আবার কি? আপনি ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্য আরেকটা পরিচয় জানতে চাইছিলেন। আর সেটা হল, ওনার যৌন পরিচয়। তাই তো?

– না, হ্যাঁ। আসলে…

– আসলে একজন মানুষের কর্ম পরিচয় বা অন্য কোন পরিচয় তা সে যতই খ্যাতি দিক না তাকে, তিনি যদি যৌনতায় সংখ্যালঘু হন, তাহলে সংখ্যাগুরুরা তার সব পরিচয় বাদ দিয়ে কেবল যৌন পরিচয় নিয়েই কথা বলেন।

– হুম। আসলে…

– আসলে মানুষ যৌনজীবী। যৌনতা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলে আর অন্য কিছু নিয়ে কথাই বলতে চাই না।

– কিন্তু…

– কোন কিন্তু নেই এর মধ্যে। যে যৌনতা একজন মানুষের ব্যক্তিগত, গোপনীয় অধিকার। যা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা নিষিদ্ধ করা দরকার, তা কিনা মানুষের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

– সত্যি। ঠিক বলেছেন তো। যৌনতা কখনও মানুষের পরিচয় হতে পারে না।

– কিন্তু এমন দুর্ভাগ্য, যৌনতায় পরিচয় হয়ে দেখা দেয়। দেখা দিলে ক্ষতি ছিল না। ক্ষতি তখন হয়, যখন মানুষের কর্মক্ষমতা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এই যৌনতার দাঁড়িপাল্লায় তুলে মাপা হয়।

– ঠিক। আচ্ছা এসব কি কোনদিনও বন্ধ হবে না?

– জানি না। তবু আশায় তো থাকি। একদিন নিশ্চয় মানুষ বুঝবে যৌনতা নয়, কর্মই আমাদের একমাত্র পরিচয়।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

(সমাপ্ত)


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৯

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৯

অবকাশে সঞ্জয়

–      আপনার নাম?

–      অনিমেষ দত্ত।

–      পিতার নাম?

–      অরবিন্দ দত্ত।

–      বয়স?

–      বত্রিশ।

–      লিঙ্গ?

–      পুং

–      লেখাপড়া?

–      ইতিহাসে এম.এ.

–      জীবিকা?

–      প্রাইভেট টিউশন।

–      অবসরে কি কি করেন?

–      গান শুনি। একটু আধটু বই পড়ি।

–      ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ।

–      ব্যাস? আর কোন জিজ্ঞাসা নেই?

–      না! কোন মানুষের পরিচয় হিসাবে এটুকু তো যথেষ্ট।

–      তাই?

–      হুম।

–      আমার মনে হয় এগুলো কোন মানুষের পরিচয়ই নয়।

–      তাহলে আপনিই বলুন কোন মানুষের পরিচয় পেতে কি কি জানা উচিৎ?

–      কেন বাসের গায়ে লেখা থাকে তো কি জানে উচিৎ?

–      মানে!

–      বা রে, বাসে উঠলে দেখেন তো বড়বড় করে লেখা থাকে আপনার ব্যবহার আপনার পরিচয়।

–      বুঝলাম। তা আপনার ব্যবহার কেমন তা কিছু প্রশ্ন করে জানার উপায় আছে বলে তো কখনো শুনি নি। আপনিই বলুন কি প্রশ্ন করব।

–      নাম ধাম জিজ্ঞেস করার পরেই আপনি জানতে চাইতে পারতেন যে রাস্তাঘাটে কাদের দেখতে ভালো লাগে?

–      গুড কোশ্চেন। বেশ বলুন কাদের দেখেন?

–      ছেলেদের।

–      সে কি! আপনি ছেলে হয়ে মেয়েদের না দেখে ছেলেদের দেখেন কেন?

–      ভালো লাগে তাই।

–      হুম। কিন্তু…

–      অনুচ্চারিত প্রশ্ন করবেন না। সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন।

–      ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হন। তার মানে আপনি কি…

–      আবার অসম্পূর্ন জিজ্ঞাসা। স্পষ্ট বলুন।

–      আপনি কি সমকামী?

–      হ্যাঁ। বিছানায় ভালোবাসার সময় পাশে কোন পুরুষই পছন্দ।

–      আপনাকে দেখে তো…

–      আবার কথার কথায় থেমে যাওয়া। যাইহোক আপনাকে তো বললাম,  দেখে বা নাম ধাম জেনে কারও পরিচয় জানা যায় না। জানতে চেষ্টাও করবেন না। পরিচয় জানা যায় ব্যবহারে। আর ব্যবহার জানা যায়…

–      কাছাকাছি হলে। তাই না।

–      হুম। কিন্তু বেশিরভাগ যতটা কাছে আসা উচিৎ ততটা না এসেই মনগড়া কিছু বিশ্বাস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। সেটা আরও মুশকিল।

–      আমি তেমন সিদ্ধান্ত নেব না। কাছে এসে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নেব। আজ আসি। পরিচয়পর্বে এর বেশি কাছাকাছি হওয়াটা ভালো দেখায় না।

–      আসুন।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

মুখোশ তুমি কার?

মুখোশ তুমি কার?

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন

১০ই ডিসেম্বর ২০১৭ কোলকাতায় অনুষ্ঠিত হলো ১৬তম রামধনু গৌরব যাত্রা। দিনের বদল, রাতের বদল, আর বদল রাষ্ট্রের শোষণের পদ্ধতিতে। বদল এসেছে পুরুষতন্ত্র আর নারীবাদের মধ্যেকার বাদ-বিসম্বাদ-সংঘাতে। তার সাথে তাল মিলিয়ে বদল এসেছে চলার ছন্দে, পোশাকের ধৃষ্টতায়, আর প্রতিবাদ প্রকাশের ভঙ্গিমায়। ব্রিটিশ যুগের ভারতীয় দণ্ডবিধি ৩৭৭, ২০০৯ সালের ১০রা জুলাই অনৈতিক বাতিলের দলে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সাথে সাথে, উৎসবে ফেটে পড়লো ভারতের লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের এতদিনের ক্ষোভ-জ্বালা-যন্ত্রণা, আনন্দের ঝলকানিতে, এক নতুন স্বাধীন জীবনের রূপ নিয়ে। ২০১২এর ২৭শে মার্চ, সেই নতুন স্ফুলিঙ্গরা নিভে গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া কলঙ্কিত রায়ে। ৩৭৭ ধারা ফিরে এলো ভারতের সংবিধানে, বহাল তবীয়তে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মাঝেসাঝে — ৩৭৭ ধারা খারাপ, ৩৭৭ এই, ৩৭৭ ঐ — ইত্যাদি ট্যাঁফোঁ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা হয়তো নগণ্য।

অন্যদিকে, তার দু’বছর বাদে ২০১৪ সালের ১৫ই এপ্রিল, সেই সর্বোচ্চ আদালতের নালসা রায় সম্মান দিলো তৃতীয় লিঙ্গস্বত্বার। আমি কি, তা ঠিক করবো আমি — আর রাষ্ট্র তাকে সম্মান দিতে বাধ্য থাকবে, রক্ষা করতে, লালন করতে প্রতিশ্রুত থাকবে সর্বোতভাবে। ২০১৭ সালের শীতকালীন অধিবেশনে কেন্দ্রের সরকার আবার নিয়ে আসতে চাইলো নতুন এক বিল। নালসার উপরে ভিত্তি থাকলেও এই বিল কেড়ে নিতে চাইলো স্ব-লিঙ্গ-নির্ধারণের অধিকার। দেশের লিঙ্গ-সংখ্যালঘু মানুষকে দাঁড় করাতে চাইলো এক উদ্ভট স্ক্রিনিং কমিটির সামনে। তাদের উপর আক্রমণ/শোষণের জন্যে দোষীদের উপর ধার্য করতে চাইলো লঘুদণ্ড। আর শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকুরীক্ষেত্রে সংরক্ষণের বালাই ছাড়াই কাঁচি চালানোর জন্যে উঠে এলো কিছু হাত, তাদের স্বাভাবিক জীবিকার ক্ষেত্রকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে। স্বাধীন ভারতের বয়স ৬০ পেরিয়েছে, ইতিহাসও অনেকটা রাস্তা পেরিয়েছে রামধনু ধুলো গায়ে মেখে। তার সবকিছু বলতে গেলে নিজেই গুলিয়ে যাবো। তাই, সে’সমস্ত থাক। বরং যে রাস্তা দিয়ে হাটলাম ১০ই ডিসেম্বর ২০১৭তে, সেই রাস্তাতেই হেঁটে আসি আবারো।

১৯৯৯ সালের ২রা জুলাই, কোলকাতা শহরের ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক, খাতায় কলমে শুধু ভারতবর্ষ না, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভবত প্রথম প্রাইড ওয়াক। তারই স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে পবনদা (পবন ঢাল) তুলে আনলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

“আমি জানিনা এর আগে এরকম গুরুত্বপূর্ণ কোন ইভেন্ট হয়েছিলো কি না, অন্তত আমাদের বা কোন সংবাদমাধ্যমের নজরে সেটা আসেনি। এই ইভেন্টে দেশের অন্যান্য জায়গার ভূমিকা/অংশগ্রহণ থাকলেও, সেই সময় কোলকাতাতেই এটা করা গেছিলো বোধহয় বাংলার এই মাটিতে প্রোথিত সামাজিক আর রাজনৈতিক ঔদার্যের জন্যেই। তখন ব্যাঙ্গালোরে অতোটাও কমিউনিটি মোবিলাইজেশন নেই, মুম্বইতে দক্ষিণপন্থি উগ্র পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির রমরমা। দিল্লীতে সেভাবে কোন সংগঠন দানা বাঁধেনি, যারা এরকম একটা প্রাইড ওয়াকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। চেন্নাই/হায়দ্রাবাদে প্রায় কিছুই ছিলোনা। উল্টোদিকে আমরা কোলকাতার লোকেরা কিন্তু লড়াইয়ের জন্যে বেশ কিছু সংগঠন তৈরি করে ফেলেছিলাম ততোদিনে। এবং তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাতেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই মাটি ভারতের অন্যান্য সব জায়গা থেকে অনেক বেশী করে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, আপন করার ক্ষমতা রাখে, এখনও অবধি এটাই আমার নিজস্ব মতামত।”

… তবু প্রাইড ওয়াকের এই ধরণ পাল্টেছে অনেকটা …

“সংখ্যায় এখন অনেক মানুষ আসেন। আগে ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা বেশী আসতেন। এখন গে লেসবিয়ানরা বেশী আসছেন। আর তাছাড়া অনেক বন্ধু-সংগঠনও এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পাশে। এবারে আমরা বধিরদের জন্যে সাইন ল্যাংগুয়েজের ব্যাবস্থা করতে পেরেছি, হুইলচেয়ার নিয়ে যাতে মানুষ স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারেন তার ব্যবস্থা করেছি, দৃষ্টিহীনদের স্বাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছি। — হ্যাঁ, সবাইকে নিয়ে চলা জানিনা কবে হবে, কিন্তু, চেষ্টা থামালে কি চলে?”

মানুষের ইতিহাসে উদ্যমতা আর স্বাধীনতা এক অজেয় অধ্যায়। তাকে চাপা দেওয়া যায়না কোনভাবে। পবনদা জানালেন কীভাবে ২০০৫ সালে হাইকোর্টের এক জাজ বলেছিলেন

“আমি যৌনতার বিরুদ্ধে নয়, সমকামিতার বিরুদ্ধেও নয়, আজ যখন কোলকাতার রাস্তায় প্রাইড ওয়াক হচ্ছে সেটাই কিন্তু একটা বড়ো ব্যাপার।”

… কখনো পাড়ার মুদীর দোকানীর সাধুবাদ, টিভিতে প্রাইড দেখে তার ভালো লেগেছে, তার সাথে সেই মিছিলের বক্তব্যগুলোও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে সেই মানুষটির, কখনো আবার “অতি-উচ্চশিক্ষিত” পরিচিত মানুষের কথা বন্ধ করে দেওয়া, এই দুই নিয়ে পবনদা কিন্তু উৎসাহী সমাজে প্রাইড ওয়াকের ইতিবাচক প্রভাব নিয়েই।

“এতোগুলো মানুষ এরকম অদ্ভুতভাবে সেজে নিজের বাড়ি থেকে আজ রাস্তায় বেড়িয়ে ঠিক কি বলার চেষ্টা করছে — এই প্রশ্নের মুখে তো আজ আমরা শহরের লোকেদের দাঁড় করাতে পেরেছি, তাই বা কম কিসের?”

তাই হাঁটা বন্ধ করার প্রশ্ন নেই, এবং হেঁটে চলেছি সেই একই রাস্তায়,কদিন আগেই যেখান দিয়ে হেঁটে এলাম সেখান দিয়েই, মিলিয়ে নিচ্ছি, উলের মতো বুনে নিচ্ছি, কিছু স্মৃতিপট। আগের বছর, মনে আছে, প্রাইডে চলার সময়, রাস্তার দু’ধারের বাচ্চাদের বেলুন বিলি করেছিলাম। সংগঠকদের বিলি করা লিফলেট, যাতে আমাদের নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার দাবী, আর সঙ্গে কিছু বেলুনরঙ্গা একসাথে চলার আহ্বান। আমাদের স্লোগান, আমাদের উল্লাস, আমাদের অহংকার, এই একটা দিনে মুছে দিয়ে যায় “আমরা/ওরা”-এর ব্যবধান। আজ সমাজ পাল্টাচ্ছে, আমার বন্ধুরা শুধু আলাদা বলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়না আমায়। আমার চেয়ে ছোট যারা, তারা তো কলেজে স্কুলে নিজেদের পরিচয়/অধিকার নিয়েই সোচ্চারভাবে টিকে আছে। প্রশ্ন, উত্তর, কথা, আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব, আলোচনা — আর অবশ্যই তর্কও — সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে আমরা মিশে যাচ্ছি বাকিদের সাথে — মিশছি, কিন্তু আমাদের নিজের “আমি”টাকে নিয়েই।

“এটা অবশ্যই একটা স্বাধীনতার জায়গা” —

২০১১ সালে তৈরি হওয়া কে-আর-পি-এফ সদস্য সৌভিকের কাছে এটাই ছিলো কোলকাতা প্রাইড ওয়াকের মানে। কথায় কথায় ফুটে উঠলো তার কাছে প্রাইড ওয়াকের এক বৃহত্তর সংজ্ঞা।

“আসলে সবকিছুই তো একসাথে যুক্ত — সমকামবিদ্বেষ, রুপান্তরকামবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ, বর্ণপ্রথা, দলিত-অবদমন। আজ এই হাঁটার ছন্দে শুধু যৌনতার অধিকার আর লিঙ্গস্বাধীনতাই থাকেনা, কিছু মানুষ হয়তো কাশ্মীর মাংগে আজাদি স্লোগান তোলেন, অন্যদিকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা বলার জন্যেও কি কেউ থাকেনা? নিশ্চয়ই থাকে। দলিতদের নিয়ে কথা হয়। নারী স্বাধীনতা নিয়ে শ্লোগান ওঠে।”

কোলকাতা রেইনবো প্রাইড “কে-আর-পি-এফ” -এর হাত ধরে পথচলা শুরু করে ২০১১ সালে। সেইবছর ৫০০জন মানুষ হেঁটেছিলেন নিজেদের অধিকার রক্ষায়। ২০১২তে ১০০০, ২০১৩তে ১৫০০।

“আগের বছর পুলিশ/প্রশাসনের কাছ থেকে জেনেছিলাম যে প্রায় ২৫০০ লোক প্রাইডে হেঁটেছিলেন, এবার ভেবেছিলাম হয়তো ৩০০০ জন আসবেন, কিন্তু সংখ্যাটা দাঁড়ায় গিয়ে ৫০০০এ!!”

এই জনসমুদ্র হওয়ার কারন? পবনদা বলছে…

“ট্রান্সজেন্ডার বিলের প্রতিবাদ এবারের প্রাইডওয়াকের সাথে মিশে যাওয়ার জন্যে অনেক ট্রান্স মানুষেরাই এবারে অংশগ্রহণ করেছেন।”

আর সৌভিকের কথায়…

“তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি। সেই শকতি-ই আজ বাড়ছে। কেউ আছেন নিজের স্বত্বা প্রদর্শনে ব্যস্ত, কেউ হয়তো রামধনু পতাকাটাকে ছুঁয়ে দেখতে চায় একবার, কেউ শ্লোগানে ব্যস্ত — আসলে এই একটা দিনে তুমি জানো যে কেউ তোমাকে টিটকিরি দেওয়ার সুযোগ পাবেনা। কারন ওখানে তোমার মতো আরও হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে। এই উৎসবটাই আমাদের প্রতিবাদ প্রকাশের সেরা মাধ্যম।”

কোলকাতা রেইনবো প্রাইড ওয়াক, যাকে ছোট ভাষায় “কে-আর-পি-ডব্ল্যু” নামেই আমরা অনেকে চিনি, তার নিয়ম কিছু? সৌভিক বললো…

“নিয়ম একটাই, কোন তকমা নিয়ে এসোনা। ওখানে আমরা সবাই এক। নইলে আমাদের সাথে অ্যাক্সেঞ্চারের মতো সংস্থাও হেঁটেছে, হেঁটেছে রাজনৈতিক গোষ্ঠীরাও।”

পবনদা বললো…

“প্রত্যেকবারেই মানুষেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। ভলেন্টিয়াররা তাল রাখতে হিমশিম খান। কিন্তু তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র থেকেই যায়, কোন এক অদৃশ্য সুতোয় যেন সবাই বাঁধা। ট্রাফিক থেকে বেঁচে হাঁটো, এ’টুকুই, নইলে এটা তো আর মিলিটারি মার্চ নয়, নিয়মের সেরকম কোন বালাই নেই।”

নাহ! সত্যিই একটা ছন্দ থাকে। ৫০০০ জোড়া পা, তাদের অনুরণন থাকতেও বাধ্য। তারই আবেশে যেন মানুষের মাঝে মিশে যাচ্ছে এই স্রোত। রাষ্ট্র, ধর্মীয় গোঁড়ামো, পুরুষতন্ত্র নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে এই জনস্রোতের বিরুদ্ধে। ট্রান্স বিলের নাম করে, তাদের ভালো করার হুজুক তুলে সর্বনাশ ডেকে আনছে তাদের জীবনে। ৩৭৭ নিয়ে মাঝে মাঝে কথা বললেও কেউই কিস্যু করছেনা। বরং একের পরে আরেক পরোক্ষ নিয়ম চালু করে লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের অবদমনের নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে তারা। সন্তান দত্তক নেওয়ার পথে তৈরি করছে বাধা, রাষ্ট্রসংঘে ভোট দিচ্ছে সমকামীতার জন্যে মৃত্যুদন্ডের সপক্ষে। নারীকে পণ্য করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে নারীদিবসের এক নতুন মানে।

সৌভিকের কথায় খানিক প্রতিবেশী আরেক বঙ্গভূমির যন্ত্রণাও উঠে এলো।

“আমার শোভাযাত্রার অংশ হিসেবে যদি একদল মানুষ অংশগ্রহণ করে, তাহলে তারা তো আমার শোভাযাত্রাকেই বলীয়ান করছে। এসব নিয়ে আমায় বলতেই বোলোনা কিছু, কান্না চলে আসে আমার। তাদের লিঙ্গ-যৌন-পরিচয় ভিন্ন — শুধু এই কারণে তাদেরকে বাতিল করে দেবো এই অধিকার আমায় কে দিয়েছে? মাঝে মাঝে মনে হয় এই সভ্যতার দরকারই নেই। অভিজিৎ রায়, জুলহাস মান্নান, গৌরী লঙ্কেশ, আফ্রাজুল, তনয় –এই সব হত্যাই তো আমার কাছে একইরকম লাগে। যদি এই সভ্যতা একজন মানুষকে জীবন্ত জ্বালিয়ে মেরে ফেলতে পারে রাজস্থানে, তাহলে এই সভ্যতাটাই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাক।”

তবু জীবন চলে নিজের মতো করে। সুপ্রিমকোর্টের পরিসংখ্যানে ভারতের মাটিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের দায়ভার দেশের আইন স্বীকার করেনি, যাদের জন্যে রাষ্ট্র ভাবেনি, ধর্মের বর্তমান হোতারা যাদের নিয়ে মাথা ঘামায়না, পুঁজিবাদ শুধু নিজেদের কাজে ব্যবহার করে ছেড়ে দেয়, তারা নিজেদের গান খুঁজে নিয়েছে নিজেদের ভাষায়। নিজেদের প্রতিবাদ কুড়িয়ে পেয়েছে রাশভাঙ্গা উৎসবে।

হাঁটতে হাঁটতে প্রায় শেষ, দেখা হলো প্রতুলানন্দদার সাথে। দেখে একটাই প্রশ্ন করলো আমায়।

“ক’জন কে দেখলি রে মুখোশ পড়েছে আজ?”

উত্তর তৈরিই ছিলো, আমিও লক্ষ্য করেছিলাম। পাঁচ হাজার জন মানুষের ভিড়ে

“খুব বেশী না গো প্রতুলদা, ৩ থেকে ৪ জন”।

… মনে মনে বললাম, আমাদের মুখোশ পড়ার দিন শেষ হচ্ছে প্রতুলদা, আমরা আর লুকোবোনা, লুকাবে এবার রাষ্ট্র, ধর্ম, লুকাবে পুরুষতন্ত্র নিজের ধুতির আঁচলের পিছনে। দেখা যাক তাদের নতুন মুখোশ পরা ফন্দিগুলোর জবাব আমাদের প্রকাশ্য প্রতিবাদে আমরা ধুয়ে মুছে ফেলতে পারি কি না। পারবো তো? পারতে যে হবেই।

কৃতজ্ঞতাঃ পবন ঢাল এবং সৌভিক

ছবিঃ কৌশিক গুপ্ত এবং লীনা মহাল

প্রুফ রিডিংঃ অভিষেক মুখার্জী


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৮

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৮

অবকাশে সঞ্জয়

–      কালকের কোর্টের রায় শুনেছো?

–      কোর্টে তো রোজই রায় বেরোয়। তুমি কোন্‌ কোর্টের রায়ের কথা বলছ?

–      আরে এক বৃহন্নলাকে গ্রেফতার করে কাল আলিপুর কোর্টে তোলা হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে বিচারকের রায়।

–      ও তাই? না গো শুনিনি।

–      আরে পেপারে দিয়েছে। পড়ে নাও।

–      তুমি তো পড়েছো। তুমিই বলো না।

–      বিচারক বৃহন্নলার জামিন না দিয়ে লক আপে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

–      এই কথা। তা তো দিতেই পারে। তা নিয়ে আবার হৈ চৈ এর কি আছে।

–      আগে পুরো টা শোন।

–      বেশ বলো।

–      বিচারক লক আপে রাখার নির্দেশ দেওয়ার পরই ওই বৃহন্নলার উকিল বলেন, কোন্‌ লক আপে রাখা হবে হুজুর, আমার মক্কেল তো নারীও নন, পুরুষও নন। ইনি তৃতীয়লিঙ্গ।

–      তা ঠিক। তা বিচারক কি করলেন তখন?

–      বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, ওই বৃহন্নলাকে পৃথক বিশেষ সেলে রাখতে হবে।

–      বাহঃ। এই নির্দেশ সত্যি এক যুগান্তকারী রায়। তৃতীয়লিঙ্গের নিজস্ব সত্তার জয়।

–      হুম। সেজন্যই তো বললাম।

–      কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে।

–      কি?

–      ওই বৃহন্নলা কে যে পুলিশ অফিসার গ্রেফতার করেছিলেন তিনি কে?

–      মানে?

–      তিনি নিশ্চয় পুরুষ কিংবা নারী পুলিশ অফিসার?

–      হ্যাঁ, তা তো হবেই।

–      লক আপে যদি পৃথক সেল হয়, তাহলে গ্রেফতার করার সময় নারী বা পুরুষ কেন? কেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দিয়ে গ্রেফতার করা হবে না?

–      তাই তো… তার মানে তুমি বলতে চাইছো…

–      আমি বলতে চাইছি লিঙ্গ ভিত্তিক নারী ও পুরুষ যখন সকল কর্মক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে তৃতীয়লিঙ্গরা কেন পাবে না?

–      ঠিক। পাওয়া উচিৎ। পেলেই তবে তৃতীয় লিঙ্গের যৌন পরিচয় সার্থকতা লাভ করবে।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৭

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৭

অবকাশে সঞ্জয়

আচ্ছা জীবনের জয় পরাজয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব কতখানি?

বিশাল গুরুত্ব।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। সেজন্যই তো কেউ পরিচয় গোপন করে। কেউ আবার গোপন পরিচয় ফাঁস করে দেয়।

যেমন?

যেমন কর্ণ অস্ত্রশিক্ষায় জয়লাভ করতে গুরুদেব পরশুরামের কাছে নিজ পরিচয় গোপন করেছিলেন। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবদের জয় নিশ্চিত করতে কুন্তি নিজে গিয়ে কর্ণের জন্মপরিচয়ের গোপনীয়তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন।

হুম বুঝলাম। তাহলে তোমার মত কি? নিজ পরিচয় গোপন করা ভালো, নাকি সঠিক পরিচয় দিয়ে দেওয়া উচিৎ?

ভালো প্রশ্ন করেছো। কিন্তু গোপন করলেও বিপদ। আবার পরিচয় দিলেও সর্বনাশ।

তাহলে তো মহাসমস্যা।

সমস্যা বলে সমস্যা। তুমি নিশ্চয় জানো সম্প্রতি এক স্কুলশিক্ষক নিজ যৌন পরিচয় প্রকাশ করায় তার চাকরী গিয়েছে।

হুম জানি। এবং তার বিরুদ্ধে এও অভিযোগ তিনি তার যৌন পরিচয় গোপন করে এই চাকরীতে ঢুকেছিলেন।

ঠিক সেদিনের কর্ণের মতো তাই না?

হ্যাঁ। তাহলে এখন উপায়। জীবনযুদ্ধে কর্ণের মতো ইনিও কি পরাজিত হবেন?

কর্ণ কি শেষ পর্যন্ত পরাজিত নাকি বিজয়ীবীর হয়ে বেঁচে আছেন?

বিজয়ী হয়ে।

তবে?

তাহলে তুমি বলতে চাইছো প্রয়োজনে নিজ পরিচয় গোপন করায় কোন দোষ নেই?

একদম। তবে তা ঠিক সময়ে প্রকাশও কোরো। তাহলেই বিজয় তিলক পরিয়ে দেবে তোমার ললাটে মহাকাল।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

[সম্পাদকীয় পুনশ্চঃ সাম্প্রতিক বাস্তব ঘটনার উল্লেখ থাকলেও, এই লেখা ১০০% তথ্যগতভাবে সঠিক নাও হতে পারে। সাহিত্যের স্বার্থে কিছু কল্পনার মিশ্রণের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। লেখক, সম্পাদক, এবং কাঁচালঙ্কার দল, বরাবরই লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের উপরে হয়ে চলা অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করে চলেছে, এবং আমাদের তরফে এই লড়াই চলতেই থাকবে যতদিন না তাদের মানবাধিকার এবং সমানাধিকার সুপ্রতিষ্ঠা পাচ্ছে]