যৌনতায় যখন পরিচয়/সমাপ্তি পর্ব

যৌনতায় যখন পরিচয়/সমাপ্তি পর্ব

— অবকাশে সঞ্জয়

– মহাশয়ের পরিচয়?

– কোন্‌ পরিচয় জানতে চান?

– এ আবার কেমন প্রশ্ন? আপনার পরিচয় জানতে চায়।

– একজন মানুষের তো অনেক রকম পরিচয় হয়। আপনি কোন্‌ টা জানতে চান?

– তাই নাকি!

– হ্যাঁ। আপনার এ নিয়ে কোন সন্দেহ আছে নাকি?

– না, ঠিক সন্দেহ নয়। কিন্তু কেমন একটা ধন্দ লাগছে।

– আমি সেই ধন্দ কাটিয়ে দিচ্ছি। আপনি বলুন তো ঋতুপর্ণ ঘোষ কে ছিলেন?

– কে আবার! একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। আচ্ছা উনি কি সত্যিই ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলের সঙ্গে…

– সত্যজিৎ রায় কে ছিলেন?

– ওরে বাবা, উনিও বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। একমাত্র বাঙালী যিনি অস্কার পেয়েছেন। – ঋতুপর্ণ ঘোষও প্রচুর আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। আপনি কিন্তু সেই আলোচনায় গেলেন না।

– না মানে…

– মানে আবার কি? আপনি ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্য আরেকটা পরিচয় জানতে চাইছিলেন। আর সেটা হল, ওনার যৌন পরিচয়। তাই তো?

– না, হ্যাঁ। আসলে…

– আসলে একজন মানুষের কর্ম পরিচয় বা অন্য কোন পরিচয় তা সে যতই খ্যাতি দিক না তাকে, তিনি যদি যৌনতায় সংখ্যালঘু হন, তাহলে সংখ্যাগুরুরা তার সব পরিচয় বাদ দিয়ে কেবল যৌন পরিচয় নিয়েই কথা বলেন।

– হুম। আসলে…

– আসলে মানুষ যৌনজীবী। যৌনতা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলে আর অন্য কিছু নিয়ে কথাই বলতে চাই না।

– কিন্তু…

– কোন কিন্তু নেই এর মধ্যে। যে যৌনতা একজন মানুষের ব্যক্তিগত, গোপনীয় অধিকার। যা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা নিষিদ্ধ করা দরকার, তা কিনা মানুষের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

– সত্যি। ঠিক বলেছেন তো। যৌনতা কখনও মানুষের পরিচয় হতে পারে না।

– কিন্তু এমন দুর্ভাগ্য, যৌনতায় পরিচয় হয়ে দেখা দেয়। দেখা দিলে ক্ষতি ছিল না। ক্ষতি তখন হয়, যখন মানুষের কর্মক্ষমতা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এই যৌনতার দাঁড়িপাল্লায় তুলে মাপা হয়।

– ঠিক। আচ্ছা এসব কি কোনদিনও বন্ধ হবে না?

– জানি না। তবু আশায় তো থাকি। একদিন নিশ্চয় মানুষ বুঝবে যৌনতা নয়, কর্মই আমাদের একমাত্র পরিচয়।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

(সমাপ্ত)


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৯

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৯

অবকাশে সঞ্জয়

–      আপনার নাম?

–      অনিমেষ দত্ত।

–      পিতার নাম?

–      অরবিন্দ দত্ত।

–      বয়স?

–      বত্রিশ।

–      লিঙ্গ?

–      পুং

–      লেখাপড়া?

–      ইতিহাসে এম.এ.

–      জীবিকা?

–      প্রাইভেট টিউশন।

–      অবসরে কি কি করেন?

–      গান শুনি। একটু আধটু বই পড়ি।

–      ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ।

–      ব্যাস? আর কোন জিজ্ঞাসা নেই?

–      না! কোন মানুষের পরিচয় হিসাবে এটুকু তো যথেষ্ট।

–      তাই?

–      হুম।

–      আমার মনে হয় এগুলো কোন মানুষের পরিচয়ই নয়।

–      তাহলে আপনিই বলুন কোন মানুষের পরিচয় পেতে কি কি জানা উচিৎ?

–      কেন বাসের গায়ে লেখা থাকে তো কি জানে উচিৎ?

–      মানে!

–      বা রে, বাসে উঠলে দেখেন তো বড়বড় করে লেখা থাকে আপনার ব্যবহার আপনার পরিচয়।

–      বুঝলাম। তা আপনার ব্যবহার কেমন তা কিছু প্রশ্ন করে জানার উপায় আছে বলে তো কখনো শুনি নি। আপনিই বলুন কি প্রশ্ন করব।

–      নাম ধাম জিজ্ঞেস করার পরেই আপনি জানতে চাইতে পারতেন যে রাস্তাঘাটে কাদের দেখতে ভালো লাগে?

–      গুড কোশ্চেন। বেশ বলুন কাদের দেখেন?

–      ছেলেদের।

–      সে কি! আপনি ছেলে হয়ে মেয়েদের না দেখে ছেলেদের দেখেন কেন?

–      ভালো লাগে তাই।

–      হুম। কিন্তু…

–      অনুচ্চারিত প্রশ্ন করবেন না। সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন।

–      ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হন। তার মানে আপনি কি…

–      আবার অসম্পূর্ন জিজ্ঞাসা। স্পষ্ট বলুন।

–      আপনি কি সমকামী?

–      হ্যাঁ। বিছানায় ভালোবাসার সময় পাশে কোন পুরুষই পছন্দ।

–      আপনাকে দেখে তো…

–      আবার কথার কথায় থেমে যাওয়া। যাইহোক আপনাকে তো বললাম,  দেখে বা নাম ধাম জেনে কারও পরিচয় জানা যায় না। জানতে চেষ্টাও করবেন না। পরিচয় জানা যায় ব্যবহারে। আর ব্যবহার জানা যায়…

–      কাছাকাছি হলে। তাই না।

–      হুম। কিন্তু বেশিরভাগ যতটা কাছে আসা উচিৎ ততটা না এসেই মনগড়া কিছু বিশ্বাস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। সেটা আরও মুশকিল।

–      আমি তেমন সিদ্ধান্ত নেব না। কাছে এসে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নেব। আজ আসি। পরিচয়পর্বে এর বেশি কাছাকাছি হওয়াটা ভালো দেখায় না।

–      আসুন।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

মুখোশ তুমি কার?

মুখোশ তুমি কার?

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন

১০ই ডিসেম্বর ২০১৭ কোলকাতায় অনুষ্ঠিত হলো ১৬তম রামধনু গৌরব যাত্রা। দিনের বদল, রাতের বদল, আর বদল রাষ্ট্রের শোষণের পদ্ধতিতে। বদল এসেছে পুরুষতন্ত্র আর নারীবাদের মধ্যেকার বাদ-বিসম্বাদ-সংঘাতে। তার সাথে তাল মিলিয়ে বদল এসেছে চলার ছন্দে, পোশাকের ধৃষ্টতায়, আর প্রতিবাদ প্রকাশের ভঙ্গিমায়। ব্রিটিশ যুগের ভারতীয় দণ্ডবিধি ৩৭৭, ২০০৯ সালের ১০রা জুলাই অনৈতিক বাতিলের দলে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সাথে সাথে, উৎসবে ফেটে পড়লো ভারতের লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের এতদিনের ক্ষোভ-জ্বালা-যন্ত্রণা, আনন্দের ঝলকানিতে, এক নতুন স্বাধীন জীবনের রূপ নিয়ে। ২০১২এর ২৭শে মার্চ, সেই নতুন স্ফুলিঙ্গরা নিভে গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া কলঙ্কিত রায়ে। ৩৭৭ ধারা ফিরে এলো ভারতের সংবিধানে, বহাল তবীয়তে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মাঝেসাঝে — ৩৭৭ ধারা খারাপ, ৩৭৭ এই, ৩৭৭ ঐ — ইত্যাদি ট্যাঁফোঁ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা হয়তো নগণ্য।

অন্যদিকে, তার দু’বছর বাদে ২০১৪ সালের ১৫ই এপ্রিল, সেই সর্বোচ্চ আদালতের নালসা রায় সম্মান দিলো তৃতীয় লিঙ্গস্বত্বার। আমি কি, তা ঠিক করবো আমি — আর রাষ্ট্র তাকে সম্মান দিতে বাধ্য থাকবে, রক্ষা করতে, লালন করতে প্রতিশ্রুত থাকবে সর্বোতভাবে। ২০১৭ সালের শীতকালীন অধিবেশনে কেন্দ্রের সরকার আবার নিয়ে আসতে চাইলো নতুন এক বিল। নালসার উপরে ভিত্তি থাকলেও এই বিল কেড়ে নিতে চাইলো স্ব-লিঙ্গ-নির্ধারণের অধিকার। দেশের লিঙ্গ-সংখ্যালঘু মানুষকে দাঁড় করাতে চাইলো এক উদ্ভট স্ক্রিনিং কমিটির সামনে। তাদের উপর আক্রমণ/শোষণের জন্যে দোষীদের উপর ধার্য করতে চাইলো লঘুদণ্ড। আর শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকুরীক্ষেত্রে সংরক্ষণের বালাই ছাড়াই কাঁচি চালানোর জন্যে উঠে এলো কিছু হাত, তাদের স্বাভাবিক জীবিকার ক্ষেত্রকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে। স্বাধীন ভারতের বয়স ৬০ পেরিয়েছে, ইতিহাসও অনেকটা রাস্তা পেরিয়েছে রামধনু ধুলো গায়ে মেখে। তার সবকিছু বলতে গেলে নিজেই গুলিয়ে যাবো। তাই, সে’সমস্ত থাক। বরং যে রাস্তা দিয়ে হাটলাম ১০ই ডিসেম্বর ২০১৭তে, সেই রাস্তাতেই হেঁটে আসি আবারো।

১৯৯৯ সালের ২রা জুলাই, কোলকাতা শহরের ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক, খাতায় কলমে শুধু ভারতবর্ষ না, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভবত প্রথম প্রাইড ওয়াক। তারই স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে পবনদা (পবন ঢাল) তুলে আনলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

“আমি জানিনা এর আগে এরকম গুরুত্বপূর্ণ কোন ইভেন্ট হয়েছিলো কি না, অন্তত আমাদের বা কোন সংবাদমাধ্যমের নজরে সেটা আসেনি। এই ইভেন্টে দেশের অন্যান্য জায়গার ভূমিকা/অংশগ্রহণ থাকলেও, সেই সময় কোলকাতাতেই এটা করা গেছিলো বোধহয় বাংলার এই মাটিতে প্রোথিত সামাজিক আর রাজনৈতিক ঔদার্যের জন্যেই। তখন ব্যাঙ্গালোরে অতোটাও কমিউনিটি মোবিলাইজেশন নেই, মুম্বইতে দক্ষিণপন্থি উগ্র পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির রমরমা। দিল্লীতে সেভাবে কোন সংগঠন দানা বাঁধেনি, যারা এরকম একটা প্রাইড ওয়াকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। চেন্নাই/হায়দ্রাবাদে প্রায় কিছুই ছিলোনা। উল্টোদিকে আমরা কোলকাতার লোকেরা কিন্তু লড়াইয়ের জন্যে বেশ কিছু সংগঠন তৈরি করে ফেলেছিলাম ততোদিনে। এবং তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাতেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই মাটি ভারতের অন্যান্য সব জায়গা থেকে অনেক বেশী করে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, আপন করার ক্ষমতা রাখে, এখনও অবধি এটাই আমার নিজস্ব মতামত।”

… তবু প্রাইড ওয়াকের এই ধরণ পাল্টেছে অনেকটা …

“সংখ্যায় এখন অনেক মানুষ আসেন। আগে ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা বেশী আসতেন। এখন গে লেসবিয়ানরা বেশী আসছেন। আর তাছাড়া অনেক বন্ধু-সংগঠনও এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পাশে। এবারে আমরা বধিরদের জন্যে সাইন ল্যাংগুয়েজের ব্যাবস্থা করতে পেরেছি, হুইলচেয়ার নিয়ে যাতে মানুষ স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারেন তার ব্যবস্থা করেছি, দৃষ্টিহীনদের স্বাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছি। — হ্যাঁ, সবাইকে নিয়ে চলা জানিনা কবে হবে, কিন্তু, চেষ্টা থামালে কি চলে?”

মানুষের ইতিহাসে উদ্যমতা আর স্বাধীনতা এক অজেয় অধ্যায়। তাকে চাপা দেওয়া যায়না কোনভাবে। পবনদা জানালেন কীভাবে ২০০৫ সালে হাইকোর্টের এক জাজ বলেছিলেন

“আমি যৌনতার বিরুদ্ধে নয়, সমকামিতার বিরুদ্ধেও নয়, আজ যখন কোলকাতার রাস্তায় প্রাইড ওয়াক হচ্ছে সেটাই কিন্তু একটা বড়ো ব্যাপার।”

… কখনো পাড়ার মুদীর দোকানীর সাধুবাদ, টিভিতে প্রাইড দেখে তার ভালো লেগেছে, তার সাথে সেই মিছিলের বক্তব্যগুলোও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে সেই মানুষটির, কখনো আবার “অতি-উচ্চশিক্ষিত” পরিচিত মানুষের কথা বন্ধ করে দেওয়া, এই দুই নিয়ে পবনদা কিন্তু উৎসাহী সমাজে প্রাইড ওয়াকের ইতিবাচক প্রভাব নিয়েই।

“এতোগুলো মানুষ এরকম অদ্ভুতভাবে সেজে নিজের বাড়ি থেকে আজ রাস্তায় বেড়িয়ে ঠিক কি বলার চেষ্টা করছে — এই প্রশ্নের মুখে তো আজ আমরা শহরের লোকেদের দাঁড় করাতে পেরেছি, তাই বা কম কিসের?”

তাই হাঁটা বন্ধ করার প্রশ্ন নেই, এবং হেঁটে চলেছি সেই একই রাস্তায়,কদিন আগেই যেখান দিয়ে হেঁটে এলাম সেখান দিয়েই, মিলিয়ে নিচ্ছি, উলের মতো বুনে নিচ্ছি, কিছু স্মৃতিপট। আগের বছর, মনে আছে, প্রাইডে চলার সময়, রাস্তার দু’ধারের বাচ্চাদের বেলুন বিলি করেছিলাম। সংগঠকদের বিলি করা লিফলেট, যাতে আমাদের নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার দাবী, আর সঙ্গে কিছু বেলুনরঙ্গা একসাথে চলার আহ্বান। আমাদের স্লোগান, আমাদের উল্লাস, আমাদের অহংকার, এই একটা দিনে মুছে দিয়ে যায় “আমরা/ওরা”-এর ব্যবধান। আজ সমাজ পাল্টাচ্ছে, আমার বন্ধুরা শুধু আলাদা বলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়না আমায়। আমার চেয়ে ছোট যারা, তারা তো কলেজে স্কুলে নিজেদের পরিচয়/অধিকার নিয়েই সোচ্চারভাবে টিকে আছে। প্রশ্ন, উত্তর, কথা, আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব, আলোচনা — আর অবশ্যই তর্কও — সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে আমরা মিশে যাচ্ছি বাকিদের সাথে — মিশছি, কিন্তু আমাদের নিজের “আমি”টাকে নিয়েই।

“এটা অবশ্যই একটা স্বাধীনতার জায়গা” —

২০১১ সালে তৈরি হওয়া কে-আর-পি-এফ সদস্য সৌভিকের কাছে এটাই ছিলো কোলকাতা প্রাইড ওয়াকের মানে। কথায় কথায় ফুটে উঠলো তার কাছে প্রাইড ওয়াকের এক বৃহত্তর সংজ্ঞা।

“আসলে সবকিছুই তো একসাথে যুক্ত — সমকামবিদ্বেষ, রুপান্তরকামবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ, বর্ণপ্রথা, দলিত-অবদমন। আজ এই হাঁটার ছন্দে শুধু যৌনতার অধিকার আর লিঙ্গস্বাধীনতাই থাকেনা, কিছু মানুষ হয়তো কাশ্মীর মাংগে আজাদি স্লোগান তোলেন, অন্যদিকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা বলার জন্যেও কি কেউ থাকেনা? নিশ্চয়ই থাকে। দলিতদের নিয়ে কথা হয়। নারী স্বাধীনতা নিয়ে শ্লোগান ওঠে।”

কোলকাতা রেইনবো প্রাইড “কে-আর-পি-এফ” -এর হাত ধরে পথচলা শুরু করে ২০১১ সালে। সেইবছর ৫০০জন মানুষ হেঁটেছিলেন নিজেদের অধিকার রক্ষায়। ২০১২তে ১০০০, ২০১৩তে ১৫০০।

“আগের বছর পুলিশ/প্রশাসনের কাছ থেকে জেনেছিলাম যে প্রায় ২৫০০ লোক প্রাইডে হেঁটেছিলেন, এবার ভেবেছিলাম হয়তো ৩০০০ জন আসবেন, কিন্তু সংখ্যাটা দাঁড়ায় গিয়ে ৫০০০এ!!”

এই জনসমুদ্র হওয়ার কারন? পবনদা বলছে…

“ট্রান্সজেন্ডার বিলের প্রতিবাদ এবারের প্রাইডওয়াকের সাথে মিশে যাওয়ার জন্যে অনেক ট্রান্স মানুষেরাই এবারে অংশগ্রহণ করেছেন।”

আর সৌভিকের কথায়…

“তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি। সেই শকতি-ই আজ বাড়ছে। কেউ আছেন নিজের স্বত্বা প্রদর্শনে ব্যস্ত, কেউ হয়তো রামধনু পতাকাটাকে ছুঁয়ে দেখতে চায় একবার, কেউ শ্লোগানে ব্যস্ত — আসলে এই একটা দিনে তুমি জানো যে কেউ তোমাকে টিটকিরি দেওয়ার সুযোগ পাবেনা। কারন ওখানে তোমার মতো আরও হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে। এই উৎসবটাই আমাদের প্রতিবাদ প্রকাশের সেরা মাধ্যম।”

কোলকাতা রেইনবো প্রাইড ওয়াক, যাকে ছোট ভাষায় “কে-আর-পি-ডব্ল্যু” নামেই আমরা অনেকে চিনি, তার নিয়ম কিছু? সৌভিক বললো…

“নিয়ম একটাই, কোন তকমা নিয়ে এসোনা। ওখানে আমরা সবাই এক। নইলে আমাদের সাথে অ্যাক্সেঞ্চারের মতো সংস্থাও হেঁটেছে, হেঁটেছে রাজনৈতিক গোষ্ঠীরাও।”

পবনদা বললো…

“প্রত্যেকবারেই মানুষেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। ভলেন্টিয়াররা তাল রাখতে হিমশিম খান। কিন্তু তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র থেকেই যায়, কোন এক অদৃশ্য সুতোয় যেন সবাই বাঁধা। ট্রাফিক থেকে বেঁচে হাঁটো, এ’টুকুই, নইলে এটা তো আর মিলিটারি মার্চ নয়, নিয়মের সেরকম কোন বালাই নেই।”

নাহ! সত্যিই একটা ছন্দ থাকে। ৫০০০ জোড়া পা, তাদের অনুরণন থাকতেও বাধ্য। তারই আবেশে যেন মানুষের মাঝে মিশে যাচ্ছে এই স্রোত। রাষ্ট্র, ধর্মীয় গোঁড়ামো, পুরুষতন্ত্র নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে এই জনস্রোতের বিরুদ্ধে। ট্রান্স বিলের নাম করে, তাদের ভালো করার হুজুক তুলে সর্বনাশ ডেকে আনছে তাদের জীবনে। ৩৭৭ নিয়ে মাঝে মাঝে কথা বললেও কেউই কিস্যু করছেনা। বরং একের পরে আরেক পরোক্ষ নিয়ম চালু করে লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের অবদমনের নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে তারা। সন্তান দত্তক নেওয়ার পথে তৈরি করছে বাধা, রাষ্ট্রসংঘে ভোট দিচ্ছে সমকামীতার জন্যে মৃত্যুদন্ডের সপক্ষে। নারীকে পণ্য করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে নারীদিবসের এক নতুন মানে।

সৌভিকের কথায় খানিক প্রতিবেশী আরেক বঙ্গভূমির যন্ত্রণাও উঠে এলো।

“আমার শোভাযাত্রার অংশ হিসেবে যদি একদল মানুষ অংশগ্রহণ করে, তাহলে তারা তো আমার শোভাযাত্রাকেই বলীয়ান করছে। এসব নিয়ে আমায় বলতেই বোলোনা কিছু, কান্না চলে আসে আমার। তাদের লিঙ্গ-যৌন-পরিচয় ভিন্ন — শুধু এই কারণে তাদেরকে বাতিল করে দেবো এই অধিকার আমায় কে দিয়েছে? মাঝে মাঝে মনে হয় এই সভ্যতার দরকারই নেই। অভিজিৎ রায়, জুলহাস মান্নান, গৌরী লঙ্কেশ, আফ্রাজুল, তনয় –এই সব হত্যাই তো আমার কাছে একইরকম লাগে। যদি এই সভ্যতা একজন মানুষকে জীবন্ত জ্বালিয়ে মেরে ফেলতে পারে রাজস্থানে, তাহলে এই সভ্যতাটাই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাক।”

তবু জীবন চলে নিজের মতো করে। সুপ্রিমকোর্টের পরিসংখ্যানে ভারতের মাটিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের দায়ভার দেশের আইন স্বীকার করেনি, যাদের জন্যে রাষ্ট্র ভাবেনি, ধর্মের বর্তমান হোতারা যাদের নিয়ে মাথা ঘামায়না, পুঁজিবাদ শুধু নিজেদের কাজে ব্যবহার করে ছেড়ে দেয়, তারা নিজেদের গান খুঁজে নিয়েছে নিজেদের ভাষায়। নিজেদের প্রতিবাদ কুড়িয়ে পেয়েছে রাশভাঙ্গা উৎসবে।

হাঁটতে হাঁটতে প্রায় শেষ, দেখা হলো প্রতুলানন্দদার সাথে। দেখে একটাই প্রশ্ন করলো আমায়।

“ক’জন কে দেখলি রে মুখোশ পড়েছে আজ?”

উত্তর তৈরিই ছিলো, আমিও লক্ষ্য করেছিলাম। পাঁচ হাজার জন মানুষের ভিড়ে

“খুব বেশী না গো প্রতুলদা, ৩ থেকে ৪ জন”।

… মনে মনে বললাম, আমাদের মুখোশ পড়ার দিন শেষ হচ্ছে প্রতুলদা, আমরা আর লুকোবোনা, লুকাবে এবার রাষ্ট্র, ধর্ম, লুকাবে পুরুষতন্ত্র নিজের ধুতির আঁচলের পিছনে। দেখা যাক তাদের নতুন মুখোশ পরা ফন্দিগুলোর জবাব আমাদের প্রকাশ্য প্রতিবাদে আমরা ধুয়ে মুছে ফেলতে পারি কি না। পারবো তো? পারতে যে হবেই।

কৃতজ্ঞতাঃ পবন ঢাল এবং সৌভিক

ছবিঃ কৌশিক গুপ্ত এবং লীনা মহাল

প্রুফ রিডিংঃ অভিষেক মুখার্জী


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৮

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৮

অবকাশে সঞ্জয়

–      কালকের কোর্টের রায় শুনেছো?

–      কোর্টে তো রোজই রায় বেরোয়। তুমি কোন্‌ কোর্টের রায়ের কথা বলছ?

–      আরে এক বৃহন্নলাকে গ্রেফতার করে কাল আলিপুর কোর্টে তোলা হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে বিচারকের রায়।

–      ও তাই? না গো শুনিনি।

–      আরে পেপারে দিয়েছে। পড়ে নাও।

–      তুমি তো পড়েছো। তুমিই বলো না।

–      বিচারক বৃহন্নলার জামিন না দিয়ে লক আপে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

–      এই কথা। তা তো দিতেই পারে। তা নিয়ে আবার হৈ চৈ এর কি আছে।

–      আগে পুরো টা শোন।

–      বেশ বলো।

–      বিচারক লক আপে রাখার নির্দেশ দেওয়ার পরই ওই বৃহন্নলার উকিল বলেন, কোন্‌ লক আপে রাখা হবে হুজুর, আমার মক্কেল তো নারীও নন, পুরুষও নন। ইনি তৃতীয়লিঙ্গ।

–      তা ঠিক। তা বিচারক কি করলেন তখন?

–      বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, ওই বৃহন্নলাকে পৃথক বিশেষ সেলে রাখতে হবে।

–      বাহঃ। এই নির্দেশ সত্যি এক যুগান্তকারী রায়। তৃতীয়লিঙ্গের নিজস্ব সত্তার জয়।

–      হুম। সেজন্যই তো বললাম।

–      কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে।

–      কি?

–      ওই বৃহন্নলা কে যে পুলিশ অফিসার গ্রেফতার করেছিলেন তিনি কে?

–      মানে?

–      তিনি নিশ্চয় পুরুষ কিংবা নারী পুলিশ অফিসার?

–      হ্যাঁ, তা তো হবেই।

–      লক আপে যদি পৃথক সেল হয়, তাহলে গ্রেফতার করার সময় নারী বা পুরুষ কেন? কেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দিয়ে গ্রেফতার করা হবে না?

–      তাই তো… তার মানে তুমি বলতে চাইছো…

–      আমি বলতে চাইছি লিঙ্গ ভিত্তিক নারী ও পুরুষ যখন সকল কর্মক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে তৃতীয়লিঙ্গরা কেন পাবে না?

–      ঠিক। পাওয়া উচিৎ। পেলেই তবে তৃতীয় লিঙ্গের যৌন পরিচয় সার্থকতা লাভ করবে।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৭

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৭

অবকাশে সঞ্জয়

আচ্ছা জীবনের জয় পরাজয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব কতখানি?

বিশাল গুরুত্ব।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। সেজন্যই তো কেউ পরিচয় গোপন করে। কেউ আবার গোপন পরিচয় ফাঁস করে দেয়।

যেমন?

যেমন কর্ণ অস্ত্রশিক্ষায় জয়লাভ করতে গুরুদেব পরশুরামের কাছে নিজ পরিচয় গোপন করেছিলেন। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবদের জয় নিশ্চিত করতে কুন্তি নিজে গিয়ে কর্ণের জন্মপরিচয়ের গোপনীয়তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন।

হুম বুঝলাম। তাহলে তোমার মত কি? নিজ পরিচয় গোপন করা ভালো, নাকি সঠিক পরিচয় দিয়ে দেওয়া উচিৎ?

ভালো প্রশ্ন করেছো। কিন্তু গোপন করলেও বিপদ। আবার পরিচয় দিলেও সর্বনাশ।

তাহলে তো মহাসমস্যা।

সমস্যা বলে সমস্যা। তুমি নিশ্চয় জানো সম্প্রতি এক স্কুলশিক্ষক নিজ যৌন পরিচয় প্রকাশ করায় তার চাকরী গিয়েছে।

হুম জানি। এবং তার বিরুদ্ধে এও অভিযোগ তিনি তার যৌন পরিচয় গোপন করে এই চাকরীতে ঢুকেছিলেন।

ঠিক সেদিনের কর্ণের মতো তাই না?

হ্যাঁ। তাহলে এখন উপায়। জীবনযুদ্ধে কর্ণের মতো ইনিও কি পরাজিত হবেন?

কর্ণ কি শেষ পর্যন্ত পরাজিত নাকি বিজয়ীবীর হয়ে বেঁচে আছেন?

বিজয়ী হয়ে।

তবে?

তাহলে তুমি বলতে চাইছো প্রয়োজনে নিজ পরিচয় গোপন করায় কোন দোষ নেই?

একদম। তবে তা ঠিক সময়ে প্রকাশও কোরো। তাহলেই বিজয় তিলক পরিয়ে দেবে তোমার ললাটে মহাকাল।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

[সম্পাদকীয় পুনশ্চঃ সাম্প্রতিক বাস্তব ঘটনার উল্লেখ থাকলেও, এই লেখা ১০০% তথ্যগতভাবে সঠিক নাও হতে পারে। সাহিত্যের স্বার্থে কিছু কল্পনার মিশ্রণের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। লেখক, সম্পাদক, এবং কাঁচালঙ্কার দল, বরাবরই লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের উপরে হয়ে চলা অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করে চলেছে, এবং আমাদের তরফে এই লড়াই চলতেই থাকবে যতদিন না তাদের মানবাধিকার এবং সমানাধিকার সুপ্রতিষ্ঠা পাচ্ছে]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৬

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৬

অবকাশে সঞ্জয়

 

–আচ্ছা কাম বিষয়ক গ্রন্থ কখনও শাস্ত্রগ্রন্থ হতে পারে?

— ঠিক জানি না গো। কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন করছ কেন?

— না এমনি মনে হল। শাস্ত্র মানেই তো ধর্ম ধর্ম ব্যাপার।

— হুম। তা কাম কোন ধর্মীয় ব্যাপার নয় বলছ?

— কি যে বলো। কাম থেকে মুক্তির পথ খোঁজাই তো ধর্মের উদ্দেশ্য।

— তাই নাকি!

— হ্যাঁ। কোন সন্দেহ নেই।

— কিন্তু কাম যদি কারও ধর্ম হয়?

— দূর। তা কক্ষনো হয় না। হতে পারে না।

— তোমার মনে হয় না যে কাম জীবনের ধর্ম।

— কিভাবে?

— কিভাবে মানে! কাম যদি না থাকতো, তাহলে জীবন প্রবাহ থাকতো?

— না থাকতো না। তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। তারপরেও বলছি, সেটা মানুষের জৈবিক ক্রিয়া। ধর্ম নয়।

— বেশ। তা ধর্ম বলতে তুমি কি বোঝ?

— কেন মুক্তির পথ খোঁজা।

— কিসের থেকে মুক্তি?

— মনুষ্যজীবন থেকে মুক্তি।

— কিন্তু মানুষ কি সত্যি তার মনুষ্য জীবন থেকে মুক্তি চায়?

— চায় না বলছ?

— না চায় না। মানুষ বাঁচতে ভালোবাসে। বেঁচে থাকার জন্য কত কষ্ট করে বলো তো।

— কিন্তু…

— কোন কিন্তু নেই এরমধ্যে। মানুষ ভালোবাসে আনন্দ। শান্তি।

— আর…

— আর সেই শান্তি ও আনন্দ যে যার মতো করে পথ হেঁটে খুঁজে পেতে চায়।

—  বেশ। ধর্মে আনন্দ ও শান্তি পাওয়া যায় তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু কামে…

— কামও তো জীবনকে আনন্দদানের জন্য। আর সেই আনন্দ কত উপায়ে দেওয়া যায় তারই জন্য ঋষি বাৎসায়ন লিখেছেন নানা কামকলা যা জীবনের কাছে কামশাস্ত্র।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৫

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৫

অবকাশে সঞ্জয়

 

–বেশ তুমিই বলো কি দেখে যৌন পরিচয় ঠিক করা উচিৎ?

–সত্যি কি দেখে করা উচিৎ বলো তো?

–কি আবার! যৌনাঙ্গ দেখে।

— ঠিক। কিন্তু শরীরের কোন্‌ যৌনাঙ্গ দেখে?

— কোন্‌ যৌনাঙ্গ মানে! শরীরে আবার কটা যৌনাঙ্গ থাকে?

— অনেক থাকে। আমার মতে তো প্রতিটা অঙ্গ যৌনাঙ্গ।

— কি যা তা বকছ!

— কেন, ভুল কি বললাম?

— শরীরের প্রতিটা অঙ্গ যৌনাঙ্গ হয় কখনও? যৌনাঙ্গ তো একটি।

— তুমি ভুল বলছ এবার। তুমি যাকে যৌনাঙ্গ বলছ সেটা প্রকৃত অর্থে জননাঙ্গ। তবে হ্যাঁ, জননাঙ্গও যৌনাঙ্গ।

— বুঝলাম। তা অন্য আর কোন অঙ্গকে তুমি যৌনাঙ্গ বলছ?

— কেন? শরীরের যেসব অঙ্গ যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয়।

— মানে!

— মানে তো জলের মতো সোজা। যৌনাঙ্গ মানে কি? যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয় এমন অঙ্গ। তা ঠোঁট,জিভ, স্তন, হাত এগুলি কি যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয় না?

— তা নেয়। কিন্তু…

–কোন কিন্তু নেই। আসলে মানুষ জননক্রিয়া আর যৌনক্রিয়া কে গুলিয়ে ফেলে।

— হুম। তা ঠিক বলেছো। তা তোমার মতে কোন অঙ্গ দেখে যৌন পরিচয় ঠিক করা উচিৎ?

— কোন অঙ্গ দেখে নয়।

— তাহলে?

— যৌন পরিচয় যৌনক্রিয়া জেনে ঠিক করা উচিৎ। আর তা একমাত্র নিজস্ব ঘোষণা থেকে।

— অর্থাৎ…

— প্রতিটা মানুষ নিজস্ব যে যৌন পরিচয় দিতে ইচ্ছুক হবে তার যৌনপরিচয় সেটাই হবে।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৪

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৪

অবকাশে সঞ্জয়

ক’দিন আগে একটি দৈনিক সংবাদপত্রে সংবাদটা বেরিয়েছিল। ছেলে সেজে দশ বছর পার আফগান কন্যার। এই ছিল সংবাদটির শিরোনাম। মূল ঘটনা হল আফগানিস্তানের এক বিশেষ প্রথা অনুসারে যেসব পরিবারে কোন ছেলে জন্মায় না, শুধু মেয়ে জন্মায় সেই পরিবার কোন এক মেয়েকে ছেলে সাজিয়ে মানুষ করে। এই প্রথা স্থানীয় ভাষায় বাচা পোশি নামে পরিচিত। সংবাদটির শেষে সাংবাদিক মেয়েটির লিঙ্গ পরিচয় জনিত সংকট সংক্রান্ত প্রশ্নও তুলেছেন এবং জনৈক অধ্যাপক ফেতরাত-কে কোড করে লিখেছেন, এই মেয়েরা বাধ্য মেয়েদের ভূমিকায়  মানিয়ে নিতে পারে না। অবসাদের শিকার হয়। যাইহোক নিউজটি পড়ে জানতে পারি নি যে পরিবারে জন্ম নেওয়া একাধিক মেয়েদের মধ্যে কোন্‌ মেয়েকে ছেলে সাজানো হয়। যে কোন মেয়েকে কি? নাকি যে মেয়েটি শৈশবে বেশ দূরন্ত অর্থাৎ ছেলেলি আচরণ করে তাকে? নিউজটি এও জানিয়েছে, মেয়েটি ছদ্মবেশে অর্থাৎ ছেলে সেজে ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছেলেদের মতো ইঁটভাটায় কাজ করে রোজ। কিন্তু অন্য ছেলেরা বুঝতেই পারে না যে সে ছেলে নয়, মেয়ে। যত খটকা এইখানে। যতই ছেলে সেজে থাক। অন্যরা বুঝতে পারবে না? তা কি সম্ভব? সম্ভব হতে পারে যদি ছেলেটি রূপান্তরকামী পুরুষ হয়। কে বলতে পারে, ‘বাচা পোশি’ প্রথা হয়তো এক ধরনের রূপান্তরকামী প্রথার স্বীকৃতি। নইলে ছেলেদের ভিড়ে কোন মেয়ে যতই পরিবারের চাপ থাক কাজ করতে পারতো না। যৌনতা যে বড় বালাই। এ কেবল পরিচিতির সংকট তৈরি করে না, অন্যদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতেও দরকার হয়।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

 


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৩

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৩

অবকাশে সঞ্জয়

পরিচয়, পরিচয় আর পরিচয়। পরিচয়হীন হয়ে এ জীবনে বাঁচা যায় না। তাই তো আলাপের শুরুতেই আমরা একে অপরের পরিচয় জানতে চায়। যেমন একদিন জানতে চেয়েছিলেন গুরু দ্রোনাচার্য্য। গভীর জঙ্গলে এক অজ্ঞাতকুলশীল যুবককে দেখে শুধিয়েছিলেন কি তার পরিচয়। সেই যুবক নিজ নামটুকু বলতে পারলেও আর কোন সম্মানসূচক পরিচয় দিতে পারে নি। তবে হ্যাঁ, সে এটুকু বলেছিল যে, সে গুরু দ্রোনাচার্য্যের শিষ্য। সেই কথা শুনে গুরু দ্রোণ অবাক হয়ে বলেছিলেন, আমি তো তোমাকে অস্ত্রশিক্ষা দিই নি। তাহলে তুমি কেমন করে আমার শিষ্য হলে? এরপর সেই অজ্ঞাতকূলশীল যুবক অর্থাৎ একলব্য কি বলেছিল এবং তারপর গুরুদক্ষিনা হিসাবে গুরু দ্রোণ কি চেয়েছিলেন তা আমাদের সবার জানা। সেদিন একলব্য শুধুমাত্র  এক মহান  গুরুর শিষ্যত্বের পরিচয়টুকু পাওয়ার জন্য নিজ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ অঞ্জলি দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি একটি সংবাদের প্রেক্ষিতে উঠে এল আবার সেই একলব্য প্রসঙ্গ। লোক আদালতে দুই রূপান্তরকামী নারীর বিচারক হওয়া প্রসঙ্গে দেশের প্রথম রূপান্তরিত নারী হিসাবে কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হয়েছেন যিনি সেই মানবীদি বলেন, রূপান্তরকামীদের একলব্যের মতো নিজের যোগ্যতা দেখাতে হবে। সেদিন একলব্য নিজের যোগ্যতা দেখাতে গিয়ে গুরু দ্রোণের  নির্দেশে নিজ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে গুরুদেবের চরণে অঞ্জলি দিয়েছিলেন। এই সমাজ বা রাষ্ট্রকে যদি গুরু দ্রোণ ব’লে ধরে নিই তাহলে সেই গুরু কি নিজের গুরুগিরি দেখিয়ে বলছেন, ওহে রূপান্তরকামী তুমি যদি নিজেকে রূপান্তরকামী নারী বলতে চাও তাহলে প্রথমেই নিজ লিঙ্গচ্ছেদ করে সমাজের চরণে তা অর্পন করো। জানি এটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত। উনি এসআরএস নামক লিঙ্গান্তরকরণের সার্জারীর পক্ষে নিজ মতামত দিতেই পারেন। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট যেখানে সেলফ আইডেনটিফিকেশানের কথা স্পষ্ট বলেছেন, সেখানে ‘একলব্য’-এর মতো নিজ যোগ্যতা দেখাতে হবে একথা বলা কেন? তবু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই রূপান্তরকামীরা একলব্য হয়ে নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন। কিন্তু তারপর? সমস্ত যশ খ্যাতি প্রতিপত্তি নিয়ে রাজাধিরাজ হয়ে রাজত্ব করবে অর্জুন। আর একলব্যরা চিরকাল হারিয়ে যাবে গহীন বনে? তাহলে কি লাভ একলব্য হয়ে? শুধুই পরিচয় প্রাপ্তি? রূপান্তরকামীরা নিজ পরিচয়সংকটে ভোগেন ঠিকই। কিন্তু সেই সংকট দূরীকরণের জন্য সমাজের কাছে এইভাবে একলব্য হতে হবে? জানি না। সত্যি জানি না। তবে এটুকু জানি, পরিচয়, পরিচয় আর পরিচয়। পরিচয়হীন হয়ে এ জীবনে বাঁচা যায় না। আর সেই পরিচয় যদি হয়, যৌন পরিচয় তখন এ সমাজ বোধহয় এভাবেই গুরুদক্ষিণা চায়!

[ছবিঃ অরূপ দাস]


সমর্পণ মাইতিকে ভোট দাও। এক বাঙালীকে মিঃ গে ওয়ার্ল্ড বানাও।

সমর্পণ মাইতিকে ভোট দাও। এক বাঙালীকে মিঃ গে ওয়ার্ল্ড বানাও।

প্রিয় বন্ধু সমর্পণ,

বিশ্বের দরবারে ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করতে চলেছো তুমি, এ আমাদের সকলের জন্যে এক দারুণ ব্যাপার।
আশা করবো এই খেতাব তোমার সাথে সাথে আমাদের সকলের পুটুলিতে আসুক, আমরা বাঙ্গালী হিসেবে আরেকবার বলে উঠি, হ্যাঁ, আমরাই পারি।
কাঁচালঙ্কা যেহেতু বাংলা ভাষায় কাজ করে, আমাদের প্রচেষ্টা হবে, যাতে বাংলায় যতোটুকু সম্ভব তোমার পক্ষে দাঁড়ানো এবং বেশী বেশী ভোট সংগ্রহ করা। এর মাধ্যম হবে তোমার আমার ভাষা,… দেশ গণ্ডী নয়। চেষ্টা করছি কিছু সহজ সরল প্রশ্ন রাখার, আর তার উত্তর খোঁজার। একসাথে পথ চলার শুরু আগেই হয়েছে, কারন কোথাও আমরা সহযোদ্ধা তো বটেই, শুধু সেটুকু এগিয়ে নিয়ে চলা। এভং আরো এগিয়ে, আমরা বন্ধুও বটে। অতএব বন্ধুত্বের দাবীতে সরাসরি প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করা যাক এবার।
এভাবেই সহজ সরল কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলাম সমর্পণের উদ্দেশ্যে, তার উত্তরগুলিও একে একে পাঠিয়েছে ও। ওর উত্তরে ফুটে উঠেছে সারল্যের সাথে সাথে ভবিষ্যতে লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের জন্যে কিছু করে যাওয়ার আত্মপ্রত্যয়। না সমর্পণ কোন নেতা নয়, ওর কোন ইস্তেহার ছাপা নেই। কারন ও যে আমাদেরই মতো সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ মানুষের মনে দানা বেঁধে আছে কিছু অসাধারণ স্বপ্ন। তাই আমাদেরও আর্তি সকল বন্ধুদের কাছে, সমর্পণের পাশে এসে দাঁড়াও, যাতে ও আরো বেশী করে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতে পারে।
বন্ধু, তোমার জন্যে রইলো অনেক শুভকামনা। আশা করি তোমার মাথাতেই জ্বলজ্বল করুক মিঃ গে ওয়ার্ল্ডের মুকুট। ভালো থেকো, সং-“গে” থেকো। 🙂


কাঁচালঙ্কাঃ হঠাৎ মিঃ গে ওয়ার্ল্ড কেন?
সমর্পণঃ এর মূলত দুটো কারণ। প্রথমত, ছোটবেলা থেকে নিজের সমকামী যৌনতাকে লুকিয়ে দাবীয়ে বড়ো হয়ে ওঠা। তারপর নিজেকে মেনে নিয়ে সবার সামনে আত্মপ্রকাশ। কিন্তু কোথাও এখনও মনে হয়, যাই না, গোটা দুনিয়াটার সামনে গিয়ে বলিনা, যে, হ্যাঁ আমি সমকামী, আমার এর জন্যে কোন ক্ষোভ নেই, কোন দুঃখ নেই। নিজের আপনস্বত্বাকে নিজেই তো দিনের পর দিন কষ্ট দিয়েছি। দেখি না, তাকে এভাবে সকলের সামনে নিয়ে আসতে পারলে যদি সেটুকু কোথাও একটু কম হয়। দ্বিতীয়ত, এই বিশ্বের খেতাবগুলোর জন্যে তো বরাবর মুখিয়ে থাকে পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষেরা, তাদের বেশীরভাগ উচ্চবিত্ত। অন্যদিকে আমি মেদিনীপুরের নাম-না-জানা গ্রাম থেকে উঠে আসা এক মানুষ। জীবিকাসূত্রে গ্রাম, মফঃস্বল, শহরাঞ্চল ঘুরেছি। খুব কাছ থেকে দেখেছি মানুষের জীবনযাত্রা, আর জায়গাবিশেষে তার ভিন্নতা। গ্রামের এলজিবিটি+ অথবা লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষ আর শহরের লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের জীবনযাত্রা কিন্তু অনেকটাই আলাদা। অনেকেই আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, তাদের নিয়ে কাজ করার কেউ নেই। আমি একবার বিশ্বের দরবারে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়াতে চাই, চেঁচিয়ে বলতে চাই তাদের কথা। জানান দিতে চাই তাদের অস্তিত্ব। কারণ সবাই তো মানুষ, সবাইই যে গুরুত্বপূর্ণ। সবারই নিজের মানবাধিকার নিয়ে বাঁচার অধিকার আছে।

কাঁচালঙ্কাঃ এই খেতাব জিতলে কি করবে?
সমর্পণঃ এখানে একটা জিনিশ কিন্তু আগে ভেবে দেখার আছে। আমি এমন একটা দেশের বাশিন্দা, যেখানে এখনও ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া ৩৭৭ ধারার মতো মানবাধিকার-বিরোধী আইন আছে। আমার রাষ্ট্র আমায় বলে দেয় আমি কাকে ভালোবাসতে পারবো, আর কাকে পারবোনা। নিজের ভালোবাসাকে শরীরি প্রেমে নিজের ভালোবাসার মানুষটার কাছে প্রকাশ করলে, আমি হয়ে যাই আইনের চোখে একজন অপরাধী। এই ধারাকে পাল্টাতেই হবে। আমার মনে হয় একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে যদি আমি মিঃ গে ওয়ার্ল্ডের খেতাব পাই, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট একটা ইঙ্গিত যাবেই। হয়তো এতে ভারত তথা বাকি যেসকল দেশ ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তাদের কিছুটা সুবিধে হলেও হতে পারে। আর যেমন আগেও বললাম, আমি মূলত গ্রামবাংলার আর কিছুটা মফঃস্বলেও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্যে কাজ করতে চাই। তুমি জানোনা ওখানের অবস্থা, শহরের অনেক এলজিবিটি নামকরা বাঘাবাঘা লোকেও হয়তো জানেনা। ওখানে মানুষ এখনও সমকামিতা কি তাই জানেনা। এটা যে একটা সেক্স্যুয়াল ওরিয়েন্টেশণ, বা যৌন-অভিমুখতা, সেটা নিয়ে তাদের কোন ধারণাই নেই। ওরা ভাবে এটা পাপ, ভাবে বিয়ে করলে বোধহয় সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই তাদের নিয়ে কাজ করাটা সাংঘাতিক দরকার। এবার মুশকিল হচ্ছে, দুঃখজনকভাবে, নামের পাশে কোন তকমা সাঁটা না থাকলে কিছু করতে গেলেই হাজারো সমস্যা। একটা তকমা যদি থাকে, বিশেষত মিঃ গে ওয়ার্ল্ডের মতো কোন কিছু, তাহলে হয়তো আরো সহজে এই কাজগুলো করতে পারবো। লোকে শুনবে আমার কথা, ডাকলে অনেকে সাড়া দেবেন, পাশে এসে দাঁড়াবেন। বুঝতেই পারছো কাজটা অনেক বড়ো, আমার একার পক্ষে করা অসম্ভব।

কাঁচালঙ্কাঃ ভারতবর্ষ তথা বাকি দক্ষিণ এশিয় দেশগুলিতে, যেখানে ৩৭৭ এখনো বলবৎ, সেরকম জায়গা থেকে উঠে এসে মিঃ গে ওয়ার্ল্ডের খেতাবের জন্যে লড়াই!! ঠিক কিরকম ছিলো এই পথ চলা?
সমর্পণঃ লড়াই অনেকটাই ছিলো। আর এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে ভাবতেও হয়েছিলো বেশ কিছুটা। দেখো, আমি সমকামী সেটা তোমরা আমার কিছু বন্ধুরা জানো, আর আমার পরিবার জানে, এটুকুই। তার বাইরে এসে গোটা বিশ্বের সামনে এসে এটা বলা, ভাবছিলাম, এর জন্যে ঠিক কি কি হতে পারে? আমার উপরে আঘাত আসলে শুধু একটা কথা ছিলো, একজন মানুষ হিসেবে নিজের অধিকার নিয়ে লড়াই করছি, করবো। কিন্তু আঘাতটা আমার বাড়ির লোকেদের উপরেও আসবে না তো? আমার মা, আমার বোন। কিন্তু ভাবলাম, নাহ! এগিয়ে তো আসতেই হবে। কাউকে না কাউকে। আজ যদি একজন গ্রাম্য মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আমি বেড়িয়ে এসে এভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারি, হয়তো সেটা দেখে আরেকজন, তারপরে আরেকজন, এভাবেই সবাই ধীরে ধীরে তারা-যেটা-নয় সেই জীবনটা ছেড়ে নিজের আসল জীবনটাকে বাঁচতে পারবে। আর লড়াই তো সবাইকেই করতে হয়, তাই না? মেয়েরা আজ নিজেদের অধিকার নিয়ে লড়ছে, দলিতেরা নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। এমনকি একজন যোগ্য মানুষ পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার জন্যেও তো সেই লড়াইটাই চালিয়ে যাচ্ছে। কি? তাই তো?

কাঁচালঙ্কাঃ তোমার বোনের বিয়েতে এলজিবিটি+ গোষ্ঠীর অনেকেই নিমন্ত্রিত ছিলো, কেমন ছিলো সেই অভিজ্ঞতা? বাড়িকে কি করে রাজি করালে?
সমর্পণঃ এতে ঠিক কোন সমস্যা হয়নি, কিন্তু একটা ভয় ছিলো। ভয়টা কিরকম জানো? মানে এই ধর, সমকামীরা দেখতে শুনতে আর পাঁচজন মানুষের মতো, তাদের দেখে অতোটা বোঝা যায়না, কিন্তু আমি আমার অনেক রুপান্তরকামী বন্ধুদেরও নিমন্ত্রণ করেছিলাম। ভয় ছিলো তারা যাতে কোনভাবে অপমানিত না হয়। এর জন্যে বাড়িতে বোঝালাম, ট্রান্সজেন্ডার কি, কেন তারা ট্রান্সজেন্ডার। তাদের যাতে কোনভাবে অসম্মান না করা হয় সেই অনুরোধ রাখলাম। মা-কে আর বোন-কে অনেক জ্ঞান দিলাম। ওমা! পরদিন দেখি, মা-ই আবার কাকিমা, মাসী এদের সাথে এই নিয়ে কথা বলছে। তাদের বলছে, দেখো ওরা আসবে, ওরা কিন্তু বাকিদের মতোই আমাদের অতিথি। ওদের কোন অসম্মান হলে কিন্তু আমাদের অসম্মান। তো যাই হোক। তারপরে আর কোন সমস্যা হয়নি। আমার ট্রান্সজেন্ডার বন্ধুরা এসেছে, থেকেছে, গায়ে হলুদ থেকে সব আচার অনুষ্ঠানে তারা ছিলো। মাকে সাজিয়ে দিয়েছে, বোনকে সাজিয়ে দিয়েছে। আর শুধু রুপান্তরকামী বন্ধুরাই কেন, অনেক এলজিবিটি বন্ধুরাই এসেছিলো। সবাই একসাথে আমরা খুব মজা করেছি বিয়ের দিনগুলো। আর আমার বাড়িতে এটা বিস্বাস করে যে আমি এমন কিছু কক্ষনো করবোনা, যাতে পরিবার বা সমাজের ক্ষতি হয়। তাই তাদের বোঝাতে আমার তেমন কোন সমস্যাই হয়নি।

কাঁচালঙ্কাঃ ক্যান্সার নামক মারণরোগ নিয়ে রিসার্চ করার প্রেরণা পেলে কোত্থেকে?
সমর্পণঃ আমার বাবা। আসলে ছোট থেকেই দেখেছি যখনই কেউ নোবেল পুরষ্কার পেতো বাপি আমায় দেখাতো, পেপার কাটিং করে রেখে দিতো। তাই এই রিসার্চের ব্যাপারে আগ্রহ বরাবরই ছিলো। ছোটবেলায় দুটো প্রিয় বিশয় ছিলো। বায়োলজি (জীববিদ্যা) আর অ্যাস্ট্রোনমি (জ্যোতির্বিদ্যা)। আর এটা দেখেছি জীবনে কোন না কোন ভাবে ঠিক যেটা করতে চেয়েছি, সেটাই করেছি। ইচ্ছা ছিলো রিসার্চ করবো আর ক্যানসার নিয়েই রিসার্চ করবো। আসলে আগেও মনে হতো, এখনও মনে হয়, একটা অসুখ, যাকে আমরা কেউ কাবু করতে পারছিনা। চোখের সামনে শিশুরা অবধি মারা যাচ্ছে। কিচ্ছু কি সত্যিই করার নেই? তাই হয়তো এই পথ বেঁছে নেওয়া। এটা ঠিক আমার প্রফেশান নয়, প্রফেশান হিসেবে আমি এটাকে দেখিওনা।

কাঁচালঙ্কাঃ দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত ভারত এবং বাংলাদেশের এলজিবিটি+ মানুষদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কি তুমি আশাবাদী?
সমর্পণঃ হ্যাঁ, আমি বরাবরই খুব আশাবাদী মানুষ। তবে ভারত আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি একটু আলাদা। বাংলাদেশে যেভাবে ধর্মীয় মৌলবাদ ঘাঁটি গেড়েছে, সেটা সাংঘাতিক। ভারতেও যদিও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বেশকিছু ঘটনা বেশ খানিক চিন্তায় ফেলে, তবুও এখানে কিন্তু অনেকটাই পাল্টেছে সমাজ। গত ৫ বছরই ধরে নাও। চোখের সামনে অনেক কিছু পাল্টেছে। শশী থারুর ইত্যাদি রাজনৈতিক নেতারাও আমাদের হয়ে কথা বলছে। তাই আমি আশাবাদী যে এক/দু বছর না হলেও খুব জলদিই কিছু বড়সড় পরিবর্তন ভারতের নিরিখে আমরা দেখতে পারবো। উল্টোদিকে বাংলাদেশ নিয়ে আমার বেশ ভয় আর চিন্তাই হয়। ভাবোনা, এখানে আমি যদি বলি আমি গে, কি করবে? পেছনে লাগবে? টোন-টিটকিরি দেবে? খুন তো করবেনা? আমার বাংলাদেশের বন্ধুদের সাথে কথা বললে তো শিউরে উঠি। নিজেকে সমকামী জানান দিলে হয়তো কাল কেউ এসে কল্লা ফেলে দিয়ে গেলো। তবে ঐ যে বললাম, বরাবরই আমি খুব আশাবাদী মানুষ।

কাঁচালঙ্কাঃ গয়নাবড়ি, গান, লেখালেখি + বডি বিল্ডিং, খেলাধুলা, লড়াই — সব মিলিয়ে একজন মানুষ — নিজেকে ঠিক কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবে?
সমর্পণঃ ধুশ! আমি ওভাবে ভাবিইনা। আসলে আমি শুধু নিজের মতো থাকতে চাই। ১০টা-৫টা চাকরী করবো, টাকা কামিয়ে জীবন সুরক্ষিত করবো, আসলে ওভাবে ভাবিইনি কখনো। যখন যা ইচ্ছে হয় করি। এইত্তো, লোকে পত্রিকার জন্যে লেখা চায় আমি দিতে পারিনা, লেখার ইচ্ছে না হলে কিকরে লিখবো বলো তো? গান শিখতাম ছোটবেলায়, ভালো লাগতো তাই। বডি বিল্ডিং , এটাও খেয়াল, দেখি কিরকম লাগে, সেখান থেকে শুরু। আসলে নিজেকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে বেশ মজা লাগে। কোন বাক্সে না থেকে। লেখক হলে এরকম হও, মডেল হলে এরকম, এভাবে ভাবিইনা কক্ষনো। নিজের মতো থাকি। কোন বাক্সে নয়। ব্যাস।

** সমস্ত ছবি সমর্পণের কাছ থেকেই পাওয়া, এবং ওর অনুমতি সহকারে প্রকাশিত।



এবার তাহলে সেই কথা, যার জন্যে এই পোস্ট। কি বন্ধুরা, মন চাইছে এই সমর্পণ নামের মানুষটাকে জেতাতে? মিঃ গে ওয়ার্ল্ডের খেতাব। তোমার আমার মতোই একজন মানুষ সমকামী বিশ্বসুন্দর প্রতিযোগিতায় প্রথম, একজন বাঙ্গালী। তাহলে কিন্তু একটু কষ্ট নিখরচায় আমাদের সবাইকেই করতে হবে। বিশেষ কিছু না, ভোট দিতে হবে। কি করে ভোট দেবে? খুব সহজ।

প্রথমে তো এই সাইটে গিয়ে রেজিস্টার করো নিজেকে, যেভাবে ফেসবুকে একাউন্ট খোলে ঠিক সেভাবে। এই লিঙ্কে ক্লিক করলেই পোঁছে যাবে সেই পাতায়। রেজিস্টার করো।

নিজের পছন্দশই নাম, ই-মেইল, আর পাসওয়ার্ড দিয়ে, নীল চাকার পাশে থাকা বাক্সে ক্লিক করো, আর সবশেষে নিচের রেজিস্টার (Register) লেখাটায়।

একটি মেইল আসবে তোমার দেওয়া মেইল আই-ডি তে।

সেখানে “click here to confirm your email adress” লেখাটায় ক্লিক করতে হবে। ব্যাস পৌঁছে যাবে ওদের ওয়েবসাইটে। এবারে “Vote” অপশানে ক্লিক করতে হবে। লালকালি দিয়ে দাগিয়ে দিলাম।

এবারে সমর্পণের ছবি খুঁজে তার নিচের হলুদ বাটনে ক্লিক করো। ব্যাস! হয়ে গেলো। সোজা।

আর হ্যাঁ প্রত্যেক ২৪ ঘন্টায় একবার ভোট দেওয়া যাবে। অতএব। সেক্ষেত্রে এই লিংকে (ক্লিক করো এখানে) গিয়ে নিচের মতো একটা পেজ আসবে।সেখানে লগ ইন করে (ফেসবুকে যেমন করো আর কি) আবারো ভোট দিতে পারবে ২৪ ঘন্টা পার হলেই।

তাহলে বন্ধুরা, ভোট দিতে থাকো, আর আমাদের বাঙ্গালী বন্ধুটিকে এবারের মিঃ গে ওয়ার্ল্ড বানাও।

বিঃ দ্রঃ mrgayworld ওয়েবসাইটের সমস্ত স্ক্রিনশটের স্বত্ব সাইটটিরই। কাঁচালঙ্কা কোনভাবেই এই স্বত্বে অধিকার দাবী করেনা।