ধারা ৩৭৭ – খবর এখন (চোখ রাখুন কখন কি হচ্ছে জানতে)

ধারা ৩৭৭ – খবর এখন (চোখ রাখুন কখন কি হচ্ছে জানতে)

** আইনি হিসেব নিকেশ বুঝিনা, যেটুকু বুঝি সেটুকুই বন্ধুদের জন্যে সংক্ষেপে

১৭ই জুলাই ২০১৮

১০. যেসকল পক্ষ ৩৭৭এর এই মামলায় পক্ষে/বিপক্ষে সওয়াল করেছেন, তাদের সবাইকে সুপ্রিমকোর্ট এই শুক্রবার (২০শে জুলাই) এর মধ্যে তাদের বক্তব্য লিখিতভাবে জমা দিতে বলেছে। এবার শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।

৯. এর পরে আরো দুই উকিল ৩৭৭ ধারার পক্ষে সওয়াল করেন এবং এর সাথেই শেষ হলো ৩৭৭ ধারার শুনানি।

৮. দুপুরের খাওয়ারের পরে আরেক আইনজীবী রাধাকৃষ্ণণ আবারো এইডসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে বিচারক ইন্দু মালহোত্রা জানান, এইডস কিন্তু শুধু সমকামী নয় বিসমকামীদের মধ্যেও ছড়ায়। বিচারক চন্দ্রচূড় জানান গ্রামের কোন বিসমকামী পুরুষ বাইরে গিয়ে মারণরোগ বহণ করে গ্রামে নিজের পরিবারের মধ্যে ছড়ায়। অসুবিধেটা যৌনক্রীয়ার নয়, বরং অসুরক্ষিত যৌনক্রীয়ার।

৭. শ্রী জর্জ অনুরোধ করেন যাতে ৩৭৭কে জামিনযোগ্য করা হয়, আর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছায়ারা যাতে এই ধারার আওতায় কাউকে গ্রেপ্তার না করা যায়, শুধু এইটুকুই যেন পরিবর্তন আনা হয়, এই বলে তিনি রণে ভঙ্গ দেন, থুড়ি, ক্ষান্ত হন।

৬. শ্রী জর্জ জানান অবাধ সমকামিতা এইডস প্রভৃতি ছোঁয়াচে রোগের কারন, যার উত্তরে বিচারক চন্দ্রচূড় বলেন সঠিক তথ্য আর রোগীদের গ্রহণযোগ্যতাই ছোঁয়াচে রোগের প্রসারে রাশ টানোট সাহায্য করে। এ বিশয়ে জাসটিস নারিমান খুব সুন্দর একটি বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন যৌনকর্মীদের নিয়েও এভাবে ভাবা যায়। যদি যৌনকর্মীদের কাজকে আইনি বৈধতা দেওয়া যায়, আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে তাদেরো স্বাস্থ্য আর অধিকারকে সুনিশ্চিত করা যাবে৷ আজ ৩৭৭ ধারার শুনানি যৌনকর্মীদের লড়াইকেও আরো এক ধাপ এগিয়ে দিলো।

৫. শ্রী জর্জের কথার উত্তরে বিচারক শ্রী নারিমান আরো একটি সুন্দর মন্তব্য করেন। তিনি জানান যে মৌলিক অধিকারের মূল লক্ষ্যই হলো, বস্তাপচা সেইসব আইন যেগুলিকে সংখ্যাগুরু তোষণের সরকার সরাতে চায়না সেগুলিকে বাতিল করা। আর সুপ্রিমকোর্ট এই ব্যাপারে সরকারের জন্যে অপেক্ষা করবেনা। কোন আইন যদি সংবিধানের পরিপন্থী হয়, কোর্টই তা বাতিল করে দেবে।

৪. শ্রী জর্জ ৩৭৭ ধারা সরে গেলে অন্যান্য আরো অসুবিধে হতে পারে বলে জানান। বিচারক নারিমান জানান তাতে সমস্যা নেই, সে শিশুকামিতা, পশুকামিতা ইত্যাদিকে ৩৭৭এর আওতায় একইভাবে রেখে দেওয়া যাবে না হয়।

৩. শ্রী জর্জ যে লিখিত বয়ান কোর্টের সামনে পেশ করেন, তাতেও এই বিদ্বেষের ছোয়াঁচ যথেষ্ট। মূখ্য বিচারক শ্রী মিশ্রা ওনাকে দোন কিখোতে-র কবিতা পড়ার পরামর্শ দেন৷ যাতে উনি ভালোবাসা সম্পর্কে নিজের ধারণাকে আরো প্রসারিত করতে পারেন।

২. দুটি খ্রিস্টান সংগঠনের হয়ে আইনজীবি মনোজ জর্জ সওয়াল করছেন। এবং এই নিরিখে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের কিছু মন্তব্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। শ্রী জর্জ একটি সমীক্ষা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করে বলেন বয়ঃসন্ধিতে সমলিঙ্গে আকর্ষণ পরিণত বয়সে আর থাকেনা। এত উত্তরে বিচারক চন্দ্রচূড় বলেন, যে ওয়েবসাইটে এই সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে তাতে লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের প্রতি প্রভূত বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে।

১. শুনানি শুরুর অপেক্ষায়।

১৬ই জুলাই ২০১৮

১. আজ সুপ্রিমকোর্টে ৩৭৭ ধারার শুনানি নেই, তবে জানা যাচ্ছে এ বিষয়ে সর্বভারতীয় মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড আবার পালটি খেয়েছে। তারা আজ জানিয়েছে যে তারা ৩৭৭ ধারাকে সমর্থন করেন। বোর্ডের তরফে শ্রী জাফরইয়াব জিলানি জানান যে “সমকামিতা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক”। ভারতের সরকার ৩৭৭ ধারার বিষয়ে কোর্টে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ায় বোর্ড আপসোস জ্ঞাপন করে। শ্রী জিলানি বলেন “কেন্দ্রীয় সরকারের উচিৎ ছিলো ৩৭৭এর পক্ষে সুপ্রিমকোর্টে আইনি ভাবে সওয়াল করা”। তাহলে সর্বভারতীয় মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড কি আইনিভাবে আমাদের পথের কাঁটা হতে চলেছে সুপ্রিমকোর্টে? এর উত্তর সময়ই দেবে।

১৩ই জুলাই ২০১৮

১. আজ সুপ্রিমকোর্টে ধারা ৩৭৭এর কোন শুনানি নেই। তবে জানা যাচ্ছে যে সর্বভারতীয় মুসল পারসোনাল ল বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছে যে তারা ৩৭৭এর ভবিষ্যৎ সুপ্রিম কোর্টের হাতেই ছেড়ে দেবে। অর্থাৎ শুনানি চলাকালীন তারা কোনভাবে আইনী পদ্ধতি অবলম্বন করে এর পক্ষে বা বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করবেনা।

১২ই জুলাই ২০১৮

৭. শুনানি আবার মঙ্গলবার ১৭ তারিখ। আজকের মতো শেষ।

৬. মূখ্য বিচারক দীপক মিশ্রা মন্তব্য করেছেন কোর্ট কখনোই সংখ্যাগুরু মানসিকতার উপরে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করবেনা। করবে সাংবিধানিক ভিত্তির উপরে।

৫. রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ জানিয়েছে যদিও ৩৭৭ ধারায় কাউকে আইনের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত করার পক্ষে তারা নন, কিন্তু সমকামিতা কখনোই ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।

৪. সর্বভারতীয় মুসলিম পার্সোনাম ল বোর্ডের সদস্য সৈয়দ কাসিম রসুল জানিয়েছেন যে তারাও ৩৭৭ এর পক্ষে সওয়াল করবেন। তিনি জানান সমকামিতা সমস্ত ধর্মেই নিন্দিত।

৩. এপস্টলিক চার্চের তরফে আইনজীবি শ্রী মনোজ ভি জর্জ ৩৭৭ এর পক্ষে পিটিশন জমা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন বাইবেলের মতে সোডমি বা পায়ুমেহণ গর্হিত অপরাধ।

২. অপেক্ষা শেষ । শুনানি আবার শুরু

১. সকাল সাড়ে এগারোটার অপেক্ষা

১১ই জুলাই ২০১৮

৯. শুনানি আবার কাল চালু হবে।

৮. বিভিন্ন আবেদনকারীর পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবীরা যে সকল বিষয় উত্থাপন করেছেন, তার মধ্যে লিঙ্গ-যৌন-সংখ্যালঘুদের একসাথে মিলত হয়ে সংগঠন তৈরির পক্ষে বাঁধা এবং নালসা জাজমেন্টের পরেও রূপান্তরকামীদের পুলিশি নিগ্রহ গুরুত্বপূর্ন ।

৭. জানা যাচ্ছে যে মূখ্য বিচারক দীপক মিশ্রা মন্তব্য করেছেন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরা নিজেদের ইচ্ছেয় নিজেদের ঘরে বিছানায় কি করবেন তা কখনোই বেয়াইনি হতে পারেনা। আশার আলো দেখছেন লিঙ্গ-যৌন-মানবাধিকারকর্মীরা।

৬. বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে যে কোর্টের তরফে মন্তব্য করা হয়েছে যে যৌনতা মানুষ নিজে পছন্দ করে বেছে নেয়না।

৫. সুপ্রিমকোর্টের রায় যেন কোনভাবে “বিকৃতরুচি” প্রদর্শনের রাস্তা খুলে না দেয় সে বিষয়ে নজর রাখারও অনুরোধ রাখা হয়েছে সরকারের হলফনামায়।

৪. কেন্দ্রীয় সরকারের হলফনামায় এও বলা আছে যে যদি এই শুনানি ৩৭৭ ধারার সাংবিধানিকত্ব অথবা দুজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক সম্মতিতে যৌনতার বাইরে গিয়ে বিয়ে বা দত্তক ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রসর হয়, তাহলে সরকার আরো সুনির্দিষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করবে।

৩. বিচারক শ্রী চন্দ্রচূড় মন্তব্য করেছেন যে কোর্ট কখনোই চাইবেনা যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হাতধরাধরি করে সমুদ্রসৈকতে হাঁটাচলা করলে পুলিশ তাদের ৩৭৭এর অছিলায় বন্দি করবে।

২. কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিমকোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছে যে ৩৭৭ ধারা নিয়ে তারা কোন অবস্থান নেবেননা। উল্লেখ্য গতকাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যম/সূত্র থেকে পাওয়া খবরে এ বিশয়ে বিভিন্ন জল্পনা তৈরি হয়েছিলো, সে সবের অবসান ঘটলো। ২০১৩ সালে সুপ্রিমকোর্ট সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছিলো ধারা ৩৭৭ ধারায় প্রয়োজনীয় রদবদল আনতে। এখন আবার সেটি বুমেরাং হয়ে ফিরে এলো কোর্টেরই কাছে। আবার এই সরকারই গতকাল শুনানি শুরুর আগে আরো একমাস সময় চেয়েছিলো নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে।

১. ১১ই জুলাই শুনানি শুরু হওয়ার অপেক্ষা।
১০ই জুলাই ২০১৮

১৭. কে কে ভেনুগোপালন, এটর্নি জেনারেল, জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ৩৭৭ ধারার পক্ষে সওয়াল করবে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় সরকার চায়, ৩৭৭ ধারা যেমন আছে, সেভাবেই বহাল তবিয়তে টিকে থাকুক।

১৬. আজকের মতো শুনানি শেষ। শুনানি কাল আবার শুরু হবে।
১৫. বিচারক শ্রীমতী ইন্দু মালহোতরা মন্তব্য করেছেন, সমকামিতা শুধু মানুষের মধ্যেই নয় প্রাণীজগতে বিভিন্ন প্রজাতিতেও এর অস্তিত্ব রয়েছে।
১৪. ৩৭৭ ধারার যৌক্তিকতাকে প্রশ্ন করে আবেদনকারী কেশব সূরির পক্ষে সওয়াল করছেন আইনজীবী অরবিন্দ দাতার।
১৩. সুব্রমনিয়ম স্বামী ৩৭৭ ধারার রয়ে যাওয়ার পক্ষে সওয়াল করার পড়ে রামদেব বাবা জানিয়েছেন ৩৭৭ ধারা সরে গেলে সারা দেশে এই নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচী নেওয়া হবে।
১২. কেন্দ্রীয় সরকার সম্ভবত আজই এ বিশয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবে।
১১. শুনানি আবার চালু হয়েছে।
১০. সুপ্রিমকোর্টে এখন দুপুরের খাওয়ার বিরতি চলছে, এবং আজকে আর কি সামনে আসে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
৯. কেন্দ্রীয় সরকার এলজিবিটি (লিঙ্গ-যৌণ-সমান্তরাল) মানুষদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
৮. শ্রী দীপক মিশ্রা জানিয়েছেন বিয়ে বা সন্তান দত্তক নেওয়ার বিষয়গুলি নির্দিষ্টভাবে ৩৭৭ ধারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পড়ে আলোচনা হবে।
৭. শ্রী ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় সিং মন্তব্য করেছেন যৌনতার অধিকার মানুষের বৃহত্তর অধিকারের মধ্যে পড়ে।
৬. আইনজীবী মুকুল রোহাতগি, লিঙ্গ-যৌন-সমান্তরাল (এলজিবিটি+) মানুষদের সপক্ষে কোর্টে সওয়াল করছেন।
৫. সুপ্রিমকোর্টের তরফে জানানো হয়েছে যে শুধুমাত্র আইনজীবীরাই নন, অন্যান্য অনেকেই এ ব্যাপারে কোর্টে নিজেদের বক্তব্য রাখতে পারে।
৪. শ্রী রোহিনতন এফ নারিমান মন্তব্য করেছেন যে যৌন অভিমুখিতা কখনই অপ্রাকৃতিক নয়।
৩. সরকারী আইনজীবী শ্রী তুষার মেহতার তরফে জানানো হয়েছে, শুনানি চলাকালীন সরকার নিজের অবস্থান কোর্টকে জানাবে। এবং সরকারকে আরো সময় দেওয়া উচিৎ ছিলো বলে জানিয়েছেন।
২. পাঁচজন বিচারক এই শুনানি শুনছেন। আছেন মুখ্য বিচারক শ্রী দীপক মিশ্রা, বাকি চারজন হলেন শ্রীমতী ইন্দু মালহোতরা, শ্রী এ কে খানউইলকার, শ্রী ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় সিং এবং শ্রী রোহিনতন এফ নারিমান।
১. ৩৭৭ ধারার শুনানি শুরু হয়েছে সুপ্রিমকোর্টে আজ বেলা সাড়ে এগারোটায়।
[ছবিঃ অরূপ দাস]

কাল সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারার শুনানি – অপেক্ষায় আমরা সবাই

কাল সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারার শুনানি – অপেক্ষায় আমরা সবাই

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন / নিজস্ব সংবাদদাতা

কাল ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সেই মহা লগ্ন, যার অপেক্ষায় ছিলো ভারতবর্ষের আপামর লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক বা এলজিবিটি নাগরিক। হ্যাঁ, কাল সুপ্রিমকোর্টের পাঁচজন বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় ধারা ৩৭৭, যা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদন্ডের অভিশাপ বয়ে আনতে পারে তাদের জীবনে যারা পুরুষ-লিঙ্গ-দন্ড আর নারী-যোণীর সংগমব্যাতিত অন্য কোনভাবে সংগমসুখে আনন্দলাভ করেন। স্বভাবতই শুধুমাত্র বিছানায় নয়, বিছানার বাইরেও এই ধারা বারবার প্রযুক্ত হয়েছে এলজিবিটি+ মানুষদের হেয় করার জন্যে,বা কখনো ব্ল্যাকমেল করার জন্যেও। ৩৭৭ না সরলে সম-দৈহিক-লিঙ্গে বিবাহের ক্ষেত্রেও রয়ে যাবে এক বড়ো বাধা। বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ন মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার স্পষ্ট করেছে যে সমকামী যৌনাচার সম্পূর্ন স্বাভাবিক । তবুও ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন হিসেবে ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধানেও জায়গা করে নেয় এই বস্তাপচা আইন। শুধু ভারত নয়, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ আরো অনেক দেশই এখনো এই আইনের আওতায় বাঁধা, তারা তাদের লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক নাগরিকদের সমানাধিকার সুনিশ্চিত করতে অক্ষম। তবে কি কাল অন্তত ভারতের ইতিহাস থেকে অবসান হতে চলেছে এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের?

২০০৯ সালে দিল্লী হাইকোর্টের কলমের খোঁচায় অসাংবিধানিক তকমা পায় ৩৭৭, কিন্তু ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে, সুপ্রিমকোর্ট সেই রায়কে নস্যাৎ করে ভারতের সরকারের হাতে দায়িত্ব চাপায় ৩৭৭ ধারা নিয়ে আলোচনা করে তাতে প্রয়োজনীয় রদবদল আনার। কিছু মন্ত্রী আমলা লোকসভা/রাজ্যসভার ভিতরে বা বাইরে এই নিয়ে মাঝেমধ্যে মন্তব্য করেছেন, বা বিল আনারও চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অন্যদিকে সুপ্রিমকোর্টের সামনে এই নিরিখে দাখিল হয়েছে একের পরে আরেক পিটিশন, কখনো মুখচেনা মানবাধিকারকর্মীদের তরফে, কখনো বা সাংস্কৃতিক মহল থেক।

সম্প্রতি আইআইটির ২০জন প্রাক্তনী এবং ছাত্রেরা মিলে আবারো সুবিচার চেয়ে দারস্থ হন সুপ্রিমকোর্টের কাছে, এর নিরিখে মে মাসে কোর্ট বয়ান জারি করে এ বিষয়ে সরকারকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে নির্দেশ দেয়। গড়িমসি করে সরকার সে ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত না দেওয়ায়, সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় ১০ই জুলাই শুনানির তারিখ হিসেবে ধার্য করেন৷ এর পরেই তড়িঘড়ি সরকারের তরফে আর্জি জানানো হয় শুনানির তারিখ আরো এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে। কোর্টের তরফে জানানো হয়েছে, যেহেতু এই বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার জন্যে সরকার প্রায় সাড়ে চার বছর সময় পেয়েছেন, তবুও কিছুই করেনি, তাই আর সময় দেওয়া সম্ভব না। অতএব কাল শুনানি হচ্ছে সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

প্রসংগত উল্লেখ্য, ৩৭৭ ধারার বন্দুকের ডগায়, শুধুমাত্র সমকামী পুরুষেরা নয়, সমকামী নারী, উভকামীরা, এবং সম্পুর্ণরূপে দৈহিক-লিঙ্গ পরিবর্তন না করে ওঠা অথবা করতে না চাওয়া রূপান্তরকামীরাও এর আওতায় আসেন৷ এ ছাড়া প্যান্সেক্স্যুয়াল প্রভৃতি অন্যান্য যৌন-সমান্তরাল মানুষেরাও বাদ যাননা। বিছানায় “পাপ-কাজ” করেছো কি মরেছো।

তবে আর নয়। সম্প্রতি গোপণীয়তার অধিকার, নিজের ইচ্ছে মতো সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার, ইত্যাদি কালজয়ী রায়গুলি অনেকাংশে সুপ্রিমকোর্টকে খানিক বাধ্যই করবে, হয় ৩৭৭ ধারাকে কলমের খোঁচায় বাতিল করতে, অথবা প্রয়োজনীয় রদবদল আনতে। ঐতিহাসিক নালসা রায়ও কাল কোর্টে লিঙ্গ-সমান্তরাল মানুষদের যৌনতার সমানাধিকারকে আবার করে ভাবতে বাধ্য করবে। তবুও না আঁচালে বিশ্বাস নেই বাবা।

সবার পাখির চোখ অতএব কালকের সুপ্রিমকোর্ট। শুনানি কতোদিন ধরে চলবে জানিনা। রায় কি আসতে চলেছে সে ব্যাপারেও আমরা অনিশ্চিত। ধর্মীয় এবং সামাজিক গোঁড়া সংগঠনগুলি এর বিরুদ্ধাচরণ করবে তাও মোটামুটি সুনিশ্চিত । সরকার কি অবস্থান নেবে তাও জানা যাবে হয়তো, যদি আদৌ তারা কোন অবস্থান নেয়। তবে যাই হোকনা কেন, লড়াই এখনো যে অনেকটা বাকি সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই৷ হয় আবার করে লড়াই, নয়তো বৃহত্তর আইনি/সামাজিক পদক্ষেপ, কালকের রায় আমাদের দেখাবে, এরপরের পথচলার রাস্টাটুকু। আপাতত আমাদের শ্লোগান হয়ে উঠুক “৩৭৭ ভারত ছাড়ো”। রামধনু আওয়াজে মুখরিত হোক দেশের আকাশ-বাতাশ-মাটি। ব্রিটিশদের নিজের দেশে ৫০ বছরেরও আগে লুপ্ত আইন, সরে যাক, তাদের এক সময়ের উপনিবেশগুলির থেকেও। ভারতবর্ষ, আবারো পথ দেখাক, সত্যিকার স্বাধীনতার মানে পৌঁছে দিক, ৩৭৭ এর অভিশাপ বয়ে চলা বাকি দেশগুলিকেও।

ছবিসূত্রঃ উইকিপিডিয়া (ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স)


‘রিচ আউট’ উদ্যোগ নিল লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটি অসামান্য অনলাইন লোকেটারের

‘রিচ আউট’ উদ্যোগ নিল লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটি অসামান্য অনলাইন লোকেটারের

 

-অভিষেক (নিজস্ব সংবাদদাতা)

 

যৌন প্রান্তিক মানুষদের শারীরিক ও মানসিক হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয় জীবনের প্রতি পদে পদে। নানাবিধ হেনস্থার প্রমান গোটা দেশে কম নেই , কখনও কর্ম ক্ষেত্রে তো কখনও আপনজনেরাই স্বাভাবিক সম্পর্কের মাঝে দেওয়াল তুলে করে দেয় ব্রাত্য। তাছাড়া অনেকেই জটিল আইনি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অসুবিধাতেও প্রতিনিয়ত জেরবার হচ্ছেন। আর এই ধরনের সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেতে তারা অনেকেই বেছে নেন আত্মহত্যার মত ভয়ানক কোনো রাস্তা। সমস্যাগুলোর সমাধান কোথায় পাওয়া যায় বিশেষ করে কোনো প্রফেশনাল হেল্প কিভাবে পাওয়া যাবে তা খুঁজতেই চলে যায় অনেকটা সময়। এইসব সমস্যার সুরাহার স্বার্থেই বার্তা ট্রাস্ট(কলকাতা) , গ্রাইন্ডার ফর ইকুয়ালিটি (লস এঞ্জেলস) এবং সাথী(চেন্নাই) এক সাথে একটি অনলাইন লোকেটার তৈরি করেছেন যাতে ক্লিক করলেই ভারতের নানা প্রান্তে অবস্থিত যৌন স্বাস্থ্য , মানসিক স্বাস্থ্য ও আইনি বিষয়ক সমমনস্ক ও সহানুভূতিশীল ক্যুয়ের বান্ধব সাহায্যের খোঁজ পাওয়া যাবে সহজেই।

জুন মাস প্রাইড মান্থ হওয়ার সুবাদে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে আয়োজিত হয় নানা অনুষ্ঠান সেখানেই  ২৮শে জুন এই লোকেটারের উদ্বোধন করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি রিচ আউট বলে এক মাল্টিমিডিয়া ক্যাম্পেইনের অন্তর্গত আয়োজিত হয়। বার্তাকে সেই শুরুর দিন থেকেই যৌন প্রান্তিক মানুষেরা স্বাস্থ্য ও আইনি বিষয়ক নানা প্রশ্ন করে থাকেন , সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই এই প্রচেষ্টা।

 

বার্তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পবন ঢাল জানান – “কিছু এলজিবিটি মানুষ স্থানীয় স্তরে স্বাস্থের পরিষেবা গ্রহণ করে থাকেন। অনেকেই নির্ভর করেন অন্যের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের উপর। যদিও বা তথ্যের আদান প্রদান ,আলাপ আলোচনা অনেকটাই আজ অনলাইন হয়ে থাকে, ক্যুয়ের মানুষদের কাছে আজও আইন ও স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্যের অভাব লক্ষ করা যায়। তথ্য প্রযুক্তির দৌলতে আজ নিজের পছন্দ মত যৌনসাথী বা সম্পর্ক তৈরি করা অনেকটাই সহজ। কিন্তু যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয়? যদি স্বাস্থ্য বা আইন সংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হয় বা আপনার সাথী যদি আপনার যৌনতা নিয়ে ব্ল্যাকমইল করে? আমাদের লোকেটার তখন আপনার ভারতে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সাহায্যকারীদের যোগাযোগ করার তথ্য দিয়ে দেবে। সাহায্যকারীদের জন্যেও এই ব্যবস্থা খুব জরুরী কারণ তারা যত ক্যুয়ের মানুষ দেখবেন, তাদের বিকল্প যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচিতি সম্বন্ধে চিন্তাধারাও পালটাবে।”

 

এই মুহূর্তে ভারতের ১৬টি রাজ্য ও ৩০টি বড় ও ছোট শহর সম্বন্ধে তথ্য প্রদান করছে লোকেটরটি। সব থেকে বেশি তথ্য এসেছে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও অসম থেকে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা , বারাসাত, বারুইপুর, বহরমপুর ও ইটাহারের মত ছোট জেলা বা শহর থেকেও তথ্য এসেছে। আরও তথ্য আসলে বোঝা যাবে পরিষেবা কেমন লাগছে সবার এবং এই পরিষেবাকে আরও কিভাবে উন্নততর করে তোলা যায় সেই বিষয়ে একটি সম্যক ধারনাও পাওয়া যাবে।  লোকেটারটি আরও আপডেট করতে সকলের মতামতও গ্রহন করা হবে। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে বিকল্প যৌনতা এবং লিঙ্গ পরিচিতি নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন ফলে তারা এই দুটি রাজ্যের নাগরিক সমাজে কিছু সচেতনতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, তাছাড়া সরকারী সাহায্যও পাওয়া গেছে কিছুটা তাই এই দুটি রাজ্য থেকেই সবচেয়ে বেশি তথ্য এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে বছরখানেক আগে কাঁচালঙ্কাও পশ্চিমবঙ্গ , বাংলাদেশ তথা বিভিন্ন বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলে লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের স্বার্থে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাদের তালিকা তৈরির প্রয়াস নেয়। তাই আমাদের তরফেও আশা থাকল যে রিচ আউট এর এই অভিনব উদ্যোগ আমাদের সেই তালিকাকেও আরও সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করবে।

 

এই লোকেটারটি পাওয়া যাবে বার্তার নিজস্ব ওয়েবপেজে (http://www.vartagensex.org/reachout.php)

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবন ঢাল লোকেটারটি কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা দেখালেন। ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি নিতান্তই সহজ , চারটি বক্স একটিতে বেছে নিতে হবে নির্দিষ্ট শহরের নাম অপরটিতে রয়েছে রাজ্যের নাম, বাদ বাকি দুটো বক্সে ক্লিক করে বেছে নিতে হবে কি ধরনের সাহায্য চাই আপনার, ব্যাস তারপরেই পাওয়া যাবে সাহয্যকারীদের নাম ও অন্যান্য তথ্যের একটি লিস্ট। এই সব পরিষেবা প্রদানকারীরা অত্যন্ত কুয়ের বান্ধব এবং যৌন প্রান্তিক সমস্যা সম্পর্কেও যথেষ্ট সচেতন। পবন ঢাল আরও জানান যে এই লোকেটারের সাহায্য নিতে কোনরকমের লগ ইন করতে হবেনা আর এই লোকেটারটিও কোনও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করবেনা।

 

তবে এই লোকেটার  ক্যুয়ের বা যৌন প্রান্তিক মানুষ ছাড়াও মহিলা , যুব সমাজ , প্রতিবন্ধী ব্যক্তি , এইচ আইভি পজিটিভ ব্যাক্তি প্রভৃতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখেই বানানো হয়েছে। ফলে যারা ক্যুয়ের নন তারাও এর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবেন না।

 

সুপ্রিম কোর্টে আসন্ন ৩৭৭ধারার শুনানি এবং লোকসভায় ট্রান্সজেন্ডার বিল পেশ করার পর এই আইনিপ্রক্রিয়াগুলো নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন আসবেই, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কাজে আসবে এই লোকেটার। গ্রাইন্ডার ফর ইকুয়ালিটির অধিকর্তা জ্যাক হ্যারিসন কুইন্টানা জানালেন যে তাঁরা এই লোকেটারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্যান্য দেশেও লোকেটার তৈরি করার কথা ভাবছেন। তিনি আরও বলেন যে গ্রাইন্ডার এর আগে এর চেয়ে বড় কোনো তথ্য ও পরিষেবা সংক্রান্ত লোকেটারের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।

 

এই উদ্বোধনের পরে এলজিবিটি মানুষদের স্বাস্থ্যের ও আইনি অধিকার নিয়ে একটি আলোচনাসভা বসে। বক্তারা ছিলেন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী ও সমিক্ষনি সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ এন্ড থেরাপির প্রতিষ্ঠাতা জলি লাহা, কলকাতা হাই কোর্টের অ্যাডভোকেট ও যৌনতার অধিকার কর্মী কৌশিক গুপ্ত, এইচ আইভি কাউন্সেলর এবং ন্যাশনাল ইনস্টিউট অফ কলেরা এন্ড এন্টেরিক ডিসিসের যৌন স্বাস্থ্য কর্মী পিয়ালী ঘোষ এবং রুপান্তরকামী অধিকার কর্মী সুদেব সাধু। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন রিচ আউট ক্যাম্পেন ম্যানেজার বৃন্দালক্ষী।

 

এই আলোচনায় উঠে আসে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন সুদেব সাধু বলেন সাম্প্রতিক কালে এলজিবিটি সংক্রান্ত সমস্যা বলতে শুধুই এইচ আইভি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়েই কথা হয়, মানসিক স্বাস্থ্যের কথাকে প্রায় অবজ্ঞাই করা হয়। জলি লাহা সুদেব সাধুর কথায় একমত হয়ে আরোও জানান যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করছেন তাঁরা যৌন প্রান্তিক মানুষদের মানসিক সমস্যার ব্যাপারে একেবারেই অবগত নন আর এর কারণ যথাযথ ট্রেনিং এর অভাব। পিয়ালী ঘোষ এর মতে এই বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছ থেকেও জোটে, অনেক ডাক্তারই যৌন স্বাস্থের ক্ষেত্রে বিষমকামীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাকেই প্রাধান্য দেন সমকামিদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার চেয়ে।

 

তবে আলোচনা শেষে প্রত্যেকেই একমত হন যে আগামীদিনের যাবতীয় পরিবর্তনের জন্য বিকল্প যৌনতার মানুষদের তৈরি থাকতে হবে।

(ছবি সৌজন্যে – বার্তা ট্রাষ্ট)


সায়ান – দ্বিতীয় অধ্যায় – কিছু জানা/অজানা হাসিকান্নার গপ্পো

সায়ান – দ্বিতীয় অধ্যায় – কিছু জানা/অজানা হাসিকান্নার গপ্পো

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন / নিজস্ব সংবাদদাতা

(বাকি আট শহরের সাথে সায়ানের আলোচনায় কোলকাতা / ছবিসূত্রঃ বাপ্পাদিত্য মুখার্জী)

১লা মার্চে প্রথম জন্ম নেওয়ার পর, ২০শে জুন ২০১৮, সায়ান (সাউথ এশিয়ান ইয়ং অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক) -এর দ্বিতীয় অধ্যায়, আগের চেয়ে অনেকটাই বড়ো, অনেকটাই শক্তিশালী। এবারে আর ৪টি নয়, যুক্ত হলো ৯খানি শহর, ভাগ করে নিলো নিজেদের হাসিকান্নার কথা। আমেরিকান কনসুলেটের তরফে অনুরোধ রাখা হয়েছে এই পর্বের গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যে, অতএব বন্ধুদের কাছে আপাতত পৌঁছে দিচ্ছি, দ্বিতীয় পর্বের বিশদ, এক আলোচনা সভা, যার বিষয়বস্তু ছিলো প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌন-পরিচয়ের তরুণদের উপরে ঘটে চলা বৈষম্য। যাতে যুক্ত হলো আরো অনেক গল্প, আরো অনেক আনন্দ/ক্ষোভ/বঞ্চনা।

সমর্পণ মাইতি, শুভাগতা ঘোষ, নমিত বাজোরিয়া, রঞ্জিতা সিনহা এবং বাপ্পাদিত্য মুখার্জি, পাঁচ ধরণের মানুষ, পাঁচমিশালী অভিজ্ঞতা। সকলের সাথে তাদের এই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ রাখেন জে ট্রিলার। এর সাথেই বেড়িয়ে আসতে থাকে একের পরে আরেক বঞ্চনার খবর।

মিঃ গে ইন্ডিয়া এবং মিঃ গে ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানাধিকারী সমর্পণ জানায়, কিভাবে স্কুলে তাকে বিভিন্ন ঠাট্টা তামাশার সম্মুখীন হতে হয়েছে তার নরম মেয়েলী ব্যবহারের জন্যে। সন্তস্ত্র শিশু সমর্পণের ভয় হতো স্কুলে যেতে, অসহ্য লাগতো সবকটা ক্লাস করতে। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষকেরাও অসম্মানসূচক মন্তব্য ছুড়ে দিতো অনায়াসে।

“আগে গ্রামে ছিলাম, সেখান থেকে এলাম কোলকাতায়, আর মিঃ গে ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার সুবাদে পাড়ি দিলাম বিদেশেও। বৈষম্য সব জায়গায় আছে। ধরণটা খালি আলাদা। কলেজে পড়ার সময় মফঃস্বলে এক হোস্টেলে আমায় সমকামী, শুধু এই সন্দেহেই বের করে দেওয়া হয়েছিলো। ভেবেছিলাম কোলকাতা শহরের অবস্থা হয়তো আলাদা। কিন্তু কোথায়? যেই গবেষণাগারে আমি কাজ করতে শুরু করলাম, সেখানেও দেখলাম মেয়েলী ছেলেদের কিভাবে হ্যাটা করা হয়। ভাবলাম, নাহ! আত্মপ্রকাশ করাটা জরুরী, উদাহরণ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরাটা জরুরী। কিন্তু মিঃ গে ইন্ডিয়া হওয়ার সাথে সাথে আমাকেও ওখানে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করা হয়। আমি নাকি সহকর্মীদের উপরে খারাপ প্রভাব বিস্তার করতে পারি। আর এখন অন্য কোন গবেষণাগারে গেলেও আমার উপস্থিতি নিয়ে তারা সচ্ছন্দ নয়। আমার যোগ্যতার চেয়ে আমার যৌনতাটাই বেশী বড়ো হলো?”

“স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি”-র সাথে যুক্ত শুভাগতাদি জানালেন কিভাবে সমকামী মেয়েরাও প্রায় একইভাবে বঞ্চনার শিকার হয়।

“যতক্ষণ মেয়ে চুপচাপ আছে, সব ভালো, যেই মুখ ফুটে বলে ফেললো যে সে আরেকটা মেয়েকে ভালোবাসে, ব্যাস, তখন থেকেই সব শেষ। সবার আগে তো মেয়ের পড়াশোনাটা বন্ধ করো, যাতে জোড় করে বিয়ে দেওয়াটা সুবিধে হয়। যদি কোনভাবে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে বাবা-মা রাই আপিস বয়ে গিয়ে বলে আসেন, দেখবেন, আমার মেয়ে কিন্তু সমকামী, আপনাদের আপিসে বাকি যে মেয়েরা কাজ করেন, তাদের সাবধানে রাখবেন। এরপর আর কার চাকরী থাকে? মফঃস্বলের অবস্থা আরো ভয়ানক। এই গত ২৫শে মেই দুইজন একই কলেজে পড়া মেয়ে আত্মহত্যা করলো। আমাদের হাতে এমন কিছু প্রমাণ এসেছে, যাতে মনে হচ্ছে নিজেদের ভালোবাসাকে পূর্ণতা না দিতে পারার হতাশাই এই আত্মহত্যার কারণ।”

একদিকে সমকামী তরুণীরা যেমন শোষণ হয়ে চলেছে এভাবে, রুপান্তরকামী পুরুষদের অসুবিধে আবার অন্য জায়গায়। শুভাগতাদির ভাষায় স্কুল-কলেজে নিজেদের ইচ্ছে মতো পোশাক না পড়তে পারা, আর অন্যদিকে সঠিক বাথরুম না থাকায় তাদের দৈনন্দিন সাঙ্ঘাতিক সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয়।

কুচিনা সংস্থার কর্ণধার নমিত বাজোরিয়া তুলে ধরলেন সংস্থাদের ভিতরে এলজিবিটি / লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের কাজ দেওয়াটাও কতোটা জরুরি।

“আমি সেভাবে কখনো এই এলজিবিটি কি জিনিষ জানতামই না, বুঝতাম কম বিষয়টা নিয়ে, কিন্তু গত এক সভায় মালদা জেলার রুপান্তরকামী প্রিয়াঙ্কার কথা জানলাম, আমি ঠিক করলাম, নাহ, ৩/৪ বছর ধরে কাজ করে চলা কুচিনা ফাউন্ডেশান, এবার থেকে রুপান্তরকামীদেরও পাশে দাঁড়াবে। আজ আমাদের সহযোগিতায়, প্রিয়াঙ্কা, নিজের জেলায় খুব ভালো কাজ করছে। অন্যদিকে রুপান্তরকামী জিয়াকেও আমি যোগাযোগ করিয়ে দি, মেডিকা হাসপাতালের সাথে। আর আজ সে ভারতের প্রথম ট্রান্স ও.টি. টেকনিশিয়ান। আসলে নিজের লিঙ্গচেতনা অথবা যৌনপরিচয় যাই হোকনা কেন, এক সফল মানুষের সাফল্যটাই পারে সমস্ত বঞ্চনার জবাব হয়ে দাঁড়াতে।”

রূপান্তরকামীদের কথা প্রসঙ্গে রঞ্জিতা সিনহা জানান এলজিবিটি গোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভবত রূপান্তরকামীদেরই বঞ্চনার স্বীকার হতে হয় বেশী, কারণ তাদের নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই।

“ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের কাজ নিয়েও আমি হতাশ। ১৫ই এপ্রিল শ্রেয়া আর জো-এর উপর শ্লীলতাহানির ঘটনায় ট্রান্স বোর্ডের নীরবতা আমায় দুঃখিত করে। আসলে আমাদের জনসমীক্ষায় আরো বেশী করে নথিভুক্ত হতে হবে। ট্রান্সবোর্ড নারী এবং শিশুকল্যান দপ্তরের অধীনে কেন থাকবে? আমরা তো আলাদা। শিক্ষা/স্বাস্থ্য/অন্ন/বস্ত্র এই সামান্যতম প্রয়োজনটুকুও মেটেনা আমাদের। তাই রূপান্তরকামী মানুষদের মানবাধিকারের স্বার্থে আপনারা সবাই এগিয়ে আসুন”।

প্রান্তকথার পুরোধা বাপ্পাদিত্য মুখার্জি জানালেন অভিযোগ না করে, অন্যের জন্যে অপেক্ষা না করে, নিজেদেরই কিছু করে দেখানোর সময় এসেছে। “সতরঙ্গী” উদ্যোগের সাফল্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জানান

“আমাদের নিজেদের সমাধানসূত্র আমাদের নিজেদেরকেই খুঁজে নিতে হবে, কি করবো, কিভাবে করবো, এসব না ভেবে আমরা এগিয়ে যাই বরং। আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। সংবিধানের চোখে আর পাঁচজন নাগরিকের যে অধিকার, আমারও সেই সবকটা অধিকার আছে”।

দর্শকদের কাছে এবার প্রশ্নের জন্যে যাওয়া হলে সেখান থেকেও উঠে আসতে থাকে একের পরে আরেক ঘটনার গাঁথা। অপর্ণা ব্যানার্জি শ্রী নমিত বাজোরিয়ার উদ্দেশ্যে জানান, কিভাবে এলিট ট্রান্স মানুষদের সাথে নিয়ে চলার থেকেও, যাদের সুযোগ সুবিধে কম সেইসব ট্রান্সদের নিয়ে চলা আরো কঠিন।

“নিজের সাফল্যের পরিচয়ে সব বঞ্চনা মুছে দেওয়ার আগে তো চাই শিক্ষা, সেই শিক্ষাটাই তো অধিকাংশ ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের নেই। তাদের আপনি কিভাবে কাজে নিযুক্ত করবেন? তার চেয়ে আপনি কি কোনভাবে আমাদেরকে সুযোগ করে দিতে পারেন, যাতে আমরা বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সের সামনে আমাদের পিছিয়ে পড়া ভাইবোনেদের কথাগুলো তুলে ধরতে পারি? তাদের বোঝাতে পারি কিভাবে সি-এস-আর প্রকল্পগুলিতে আমাদের আরো সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়? আসুননা, আমরা পিছিয়ে পড়ার মধ্যেও আরো বেশী পিছিয়ে পড়া ট্রান্স মানুষদের নিয়ে কথা বলি।”

অন্যদিকে শিক্ষিকা সুচিত্রা জানান কিভাবে একজন সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার তাকে আলাদা করে নিজের চেম্বারে আসার কু-আমন্ত্রণ জানান।

“সব জায়গায় এখনও নাজেহাল হতে হয়। অন্য স্কুলে চাকরি খুঁজবো? ট্রান্সজেন্ডার শুনেই, প্রিন্সিপালরা ফোন নামিয়ে রাখেন। কেউ বলেন ছোট থেকে যতো সার্টিফিকেট, সবগুলিতে নাম পাল্টে আনুন। ইন্টারভিউতে তো একজন পুরুষ অধ্যক্ষ জিজ্ঞেসই করে বসলেন, আমার স্তন থেকে তরল দুধ বেড়ানো সম্ভব কি না, অথবা সঙ্গমের পরে আমি গর্ভধারণ করতে পারবো কি না, ছি!!”।

গল্পের সাথে উঠে এলো কিছু তথ্যও। তিস্তা দাস আর রঞ্জিতা সিনহার কথাসূত্রে জানা গেলো ট্রান্সবোর্ডের অপ্রাসঙ্গিক লিটারারি মিট নিয়ে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের কথা। অন্যদিকে এক দর্শকের প্রশ্নের উত্তরে হিউম্যান রাইটস ল’ নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি জানালেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের শিকার হলে তার জন্যে সুনির্দিষ্ট আইন আছে, কিন্তু লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের জন্যে সেরকম কোন আইন ভারতের দন্ডবিধিতে নেই।

বাংলা থিয়েটারে কর্মরত সুজয় এবং অনুরাগ মৈত্রেয়ী জানালেন। কিভাবে মানবাধিকার এবং মুক্তমনা এই ক্ষেত্রটিতেও বঞ্চনার ঘটনা লুকিয়ে আছে। ট্রান্সজেন্ডার বলে সবরকম পাত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়না ট্রান্স অভিনেতা/অভিনেত্রীদের, কিভাবে অনেক কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অভিনেতা/অভিনেত্রীদের থেকেও তাদের কম টাকা দেওয়া হয়।

“কাজ দিয়েছি, তাতেই তুমি ধন্য হয়ে যাও, ভাবখানা এমনই। আমাদের সাথে কাজ করে নাকি অভিনেতারা সুখ পাননা। তা তারা অভিনয় করতে আসেন? না সুখ নিতে?”

এক হাতে পেয়ে যাওয়া নালসা রায়, অন্য হাতে ৩৭৭ ধারার সংবিধান-বিরোধী অণুচ্ছেদের সরে যাওয়ার স্বপ্ন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই গল্পগুলো জানান দিয়ে গেলো, সত্যিই পথ চলা অনেকটাই বাকি। আগে ছিলোনা পরিচয়ের কোন ভাষা। এখন আস্তে আস্তে নিজেদের পরিচয়ে বাঁচার তাগিদে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচুর মানুষ। রূপান্তরকামী হোক অথবা সমকামী। পড়াশোনা জানা উচ্চশিক্ষিত থেকে শুরু করে নাম না জানা সেইসব আধন্যাংটা পেট ভরে খেতে না পাওয়া হিজড়েরা। শহর হোক বা মফঃস্বল। নাটকে ১৫ বছর ধরে কাজ করা অভিনেত্রী অথবা সদ্য কলেজ পড়ুয়া, বঞ্চনার ভাষারা খালি আলাদা। বৈষম্যের সুরটুকুই অন্যরকম। পুরুষতন্ত্রের বিষবীজ, তা থেকে তৈরি হওয়া অমানবিক মহীরুহ। এই মহীরুহ আমাদেরই উপড়ে ফেলতে হবে। একসাথে। একজোট হয়ে। আমরা পথ চেয়ে রইলাম সায়ানের তৃতীয় পরিচ্ছেদের দিকে।

— o — o — o —


দুটো শব্দ “ছাত্রীদের সমকামিতা”,ব্যাস, বেড়িয়ে এলো সমাজের সর্বস্তরের জুজুর ভয়

দুটো শব্দ “ছাত্রীদের সমকামিতা”,ব্যাস, বেড়িয়ে এলো সমাজের সর্বস্তরের জুজুর ভয়

অনিরুদ্ধ (অনির) সেন

(কোলকাতা) ঘটনা ১ঃ

মনে আছে তখন কলেজে। অফ পিরিয়ড কি টিফিন, মনে নেই। ক্লাস প্রায় খালি। আমরা কয়েকজন ডেস্ক বাজিয়ে গান করছিম আর আমাদের ক্লাসের অন্যতম জুটির একজন আরেকজনের কাঁধে মাথা রেখে, আংগুলের ফাঁকে আংগুল গুঁজে ফিসফিসিয়ে প্রেমালাপে মগ্ন। একটি অবাঙ্গালী ছেলে, একটি বাঙ্গালী মেয়ে। তাতেই সেদিন আমার বেশ কিছু বন্ধুর আড়চোখ আর চাপাঠোঁটে ধিক্কার দেখেছিলাম।

(কোলকাতা) ঘটনা ২ঃ

স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ করছিলো মেয়েলি ছেলেটি, সামনের সারীতে বসে ছিলেন শিক্ষিকা, যিনি নিজের সমকামী সত্বা নিয়ে যথেষ্ট সোচ্চার। নাচের শেষে হাতজোড় করে লুটিয়ে পড়লো দর্শকদের সামনে নাচেরই অংশ হিসেবে। কিন্তু পড়বি তো পড় একেবারে সেই শিক্ষিকার সামনেই, এবং না জেনেই। শিক্ষক মহল থেকে মন্তব্য উড়ে এলো “মওগায় মওগা চিনেছে”।

এবং গতকালঃ

কমলা গার্লস, কোলকাতার নামী স্কুলগুলির মধ্যে অন্যতম। ক’দিন আগে যৌন-নিগ্রহের ঘটনায় তোলপাড়, আর গতকাল আরেক ঘটনায় হঠাৎ নতুন করে নজর কাড়লো তারা। অভিযোগ ১০জন ছাত্রীর নামে সমকামীতার। ব্যাপারটা সম্পর্কে সত্যি এর থেকে বেশী কিছু বলা মুশকিল। কামের প্রকাশ বিচিত্র। অনেক মনস্তত্ববিদেরা মনে করেন, ভালো পোশাক পড়া থেকে, গান গাওয়া, সবেতেই কোথাও পছন্দের যৌনসঙ্গীকে লালায়িত করার ফল্গু ইচ্ছে বয়ে চলে। তাই “আমি স্কুলে সমকামিতা করেছি” এর মানে যে ঠিক কি দাঁড়ায় তা বলা বেশ মুশকিল। তবে ঘটনাটা যে “আমি স্কুলে চুরি করেছি”, অথবা “আমি স্কুলে ফেল করেছি” এর থেকেও সাংঘাতিক গুরুতর এক বস্তু, অন্তত সমাজের কাছে, তা অন্তত বেশ স্পষ্টই বোঝা গেলো। নাহ শুধু সমাজ কেন? সংবাদমাধ্যমই বা বাদ যায় কিসে? কোলকাতা২৪x৭ এই বিশয়ে যে খবরটি অনলাইনে প্রকাশ করেছে তার ইউ-আর-এল -টি বেশ চমৎকার। “ভয়াবহ ঘটনা”। বিশ্বাস হলোনা? এই যেঃ

https://kolkata24x7.com/ভয়াবহ-ঘটনা-কলকাতায়-নামী-স.html

জঙ্গিহানার চেয়েও ভয়াবহ হয়তো, ছবিতে দুই নারীর রগরগে (কি তাই তো মামা?) চুমু খাওয়ার দৃশ্য।

খবরটা এক বন্ধু কাল ওয়্যাটসাপে পাঠাতেই চমকে উঠি। ছাত্রীদের যৌনতাসংক্রান্ত স্বীকারোক্তি দিতে হয়েছে লিখিতভাবে, সেই স্বীকারোক্তি নিয়ে ধুন্ধুমার, অভিভাবকদের জোড় গলায় কাম এবং বন্ধুত্বের মধ্যেকার ব্যবধান চিহ্নিত করা, আর সব শেষে সংবাদমাধ্যমের ঝাঁপিয়ে পড়া এই “ভয়াবহ” “নোংরামো” -এর হালহকিকত জানার এবং জানানোর জন্য।

সমকামীতার অভিযোগের কি অর্থ? আমি সমকামী তাই কি অভিযোগের ভিত্তি? সেটুকু নিশ্চয়ই হতে পারেনা। আমার মেয়ে সমকামী হলে আমারই বা এতো রাগ কিসের? যৌনতা যেখানে চরিত্রের এক প্রধান অঙ্গ, সেখানে স্কুলের গন্ডির মধ্যে একজন সমকামী ছাত্রী ঠিক কি কি ভাবে নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা রাখে, আর কি কি পারেনা, তাও কিন্তু বেশ তর্কের দাবী রাখে। একজন ছেলে আর একজন মেয়ের মধ্যে স্কুললাইফের প্রেম তো বাঙালীর রোম্যান্টিকতা আর রোম্যান্ঠিকতার পরাকাষ্ঠা, তখনো কি এভাবেই চোখ গোল্লা গোল্লা করে তাকাতাম আমরা? স্কুল লিখিয়ে নিতো? বাবা-মায়েরা ছেলে এবং মেয়েটির হাতে হাত ধরাকে “বন্ধুত্ব বন্ধুত্ব” চিল্লিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাতো?

ঠিক কি ঘটেছে জানা নেই। ১০জন ষোড়শবর্ষীয়া শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহও নেই, নেই এই ঘটনাকে মই বানিয়ে হাততালি জোগাড়ের ইচ্ছে। তবুও লিখছি। কারণ ঘোর আপত্তি। আপত্তি “সমকামীতা” শব্দটিকে মুছে দেওয়ার চেষ্টায়। স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে কিছু নিয়ম থাকবে অবশ্যই। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়ও, তাহলে এটি স্বাভাবিকভাবে অশালীন আচরণের অভিযোগ হিসেবেই চিহ্নিত হওয়ার কথা। কৈ? তা তো হলোনা? নাকি ছাত্রীদের একটু অন্যরকম আচরণ অভিযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো দ্বিগুণ!! “বালক বিদ্যালয়” বা “বয়েজ স্কুল” -এ এরকম ঘটনা ঘটলেও কি একই গাম্ভীর্যে আহত হতো এই সমাজ আর মিডিয়া?

বিসনেস স্ট্যান্ডার্ড নামক একটি ওয়েবসাইটে কর্তব্যরতা প্রধান শিক্ষিকার বয়ান খানিক এভাবে উল্লিখিত হয়েছে….. (লক্ষ্য করার বিশয়, প্রধান শিক্ষিকা এখানে ছাত্রীদেরকে সঠিক পথে চালিত করার প্রসংগ উল্লেখ করেছেন, যা অত্যন্ত আপত্তিকর একটি মন্তব্য।)

“কিছু ছাত্রী এই ১০জন ছাত্রীর বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছিলো আমাদের যে তারা নাকি এরকম করে। তখন আমরা এই ১০জনকে ডেকে পাঠাই আর তারা সেই কথা স্বীকারও করে। বিশয়টি সংবেদনশীল, তাই আমরা তাদের কাছ থেকে এ’মর্মে লিখিত স্বীকারোক্তি নিই। এরা সবাই সেই লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বিশয়টি তাদের অভিবাবকদের জানানোর জন্যে আজ আমরা তাদের ডেকে পাঠাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো, যাতে বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ে যুগপৎ চেষ্টার মাধ্যমে আমরা ছাত্রীদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারি।” (সূত্রঃ http://wap.business-standard.com/article/news-ians/pandemonium-in-kolkata-school-over-allegation-of-lesbianism-against-students-118031201386_1.html)

সঠিক পথ মানে? কোনটি সঠিক কোনটি বেঠিক সেটা আপনি ঠিক করে দেবেন? আপনি? যিনি কয়েকদিন আগে স্কুলের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে ছাত্রীর যৌন-নিগ্রহের অভিযোগ ওঠা সত্বেও চুপ করে ছিলেন।

কি ঠিক করবেন? কিভাবে?

আর অভিভাবকেরা? হাতে হাত কাঁধে কাঁধ শুধু বন্ধুরাই রাখেনা কিন্তু। হতেই পারে আপনার মেয়ে সমকামী নয়। কিন্তু বন্ধুত্ব/প্রেম/কাম এই সমস্তের মধ্যে চুলচেড়া পার্থক্য করতে হঠাৎ আপনারা উঠেপড়ে লাগলেন যে? সমকামীরা কোথায় কি কি রাখে সে বিশয়ে আপনাদের এতো সম্যক জ্ঞান আসে কোত্থেকে? সমকামী শব্দটা ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচেন? ঘা ঠিক কোথায় লেগেছে? মেয়ে পরিক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছে এরকম অভিযোগে এতোটাই আক্রোশ জন্মাতো আপনার ভিতরে?

নাহ! কিছুতেই মানতে পারছিনা। সমাজের সব মানুষেরা মিলে যেন মুছতে চাইছে এই পাঁচটা অক্ষর। স-ম-কা-মি-তা। কখনো চোখ রাঙিয়ে, কখনো গলা ফাটিয়ে, কখনো ভয়াবহ শিরোনামে খবর ছাপিয়ে। আর হয়তো সারাদিন ঝামেলার শেষে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে প্রশ্নবাণে নাজেহাল করে।

“বাঁচাও সমকামীতা এসেছে”… ভাবখানা এমনই।

হঠাৎ সবাই মিলে আকাশ থেকে পড়লেন যে? কেন? হোমোদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে অসুবিধে? বয়ঃসন্ধিতে অনেকেই নিজের যৌনতা আবিষ্কার করে সেটা মেনে নিতে অসুবিধে? যৌন-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে, ছাত্রীদের স্বাভাবিক মানসিক/শারীরিক ইচ্ছেগুলোকে অস্বীকার করে, তাদের শুধু লেখাপড়া করার মেশিন ভাবার আপনার স্বাচ্ছন্দ্য ভেঙে পড়ছে, তাতে? নাকি সবগুলোই?

কমলা গার্লসে “সমকামীতার অভিযোগ” -এর সত্যাসত্য আমি জানিনা। কিন্তু শুনুন মশাই, আপনি যদি মনে করে থাকেন, কোলকাতার স্কুলে আজ অবধি দুজন ছাত্র অথবা দুজন ছাত্রীর মধ্যে কখনো বন্ধুত্বের বেশী কিছু শারীরিক/মানসিক ভাবে ঘটেনি, আর ঘটবেনা, দেন আই এম সরি টু সে হানি, আপনার ঠুলি পড়া মগজ না জানলেও পৃথিবীতে অনেক কিছুই হয়।

সমর্থন করা না করা অবশ্যই তর্কের উর্ধে নয়, আপনার ব্যক্তিগত মতামত রাখতেই পারেন, কিন্তু ভবিষ্যতের অনেক গলাফাটানো সমকামী পুরুষ এবং সমকামী নারীরা, তাদের মনের কারখানায়, নিজেদের যৌনতাকে স্কুল লাইফে খুঁজে পেয়েছে, এবং অনেক সময় তাকে আটকে রাখেনি শুধুমাত্র নিজের একার মন/শরীরের মধ্যে , এটা একেবারে নাকে ঝাঁঝ আনা সর্ষের তেলের মতো সত্যি, আর মাইরি বলছি, বিশ্বাস করুন, এই সর্ষের মধ্যে কোন ভুত নেই। যদি থেকে থাকে সেটা আপনার মগজে।


সায়ন – সন্ধ্যে? নাকি এক নতুন ভোরের সূচনা

সায়ন – সন্ধ্যে? নাকি এক নতুন ভোরের সূচনা

অনিরুদ্ধ (নিজস্ব সংবাদদাতা)

(ছবিঃ কোলকাতার বিভিন্ন তরুণ আন্দোলনকারীদের পাশে নিয়ে আমেরিকান দূতাবাসে বক্তব্য রাখছেন বাপ্পাদিত্য মুখার্জী)

২০১৭ এর জুন মাসে যখন চন্দ্রা (নাম পরিবর্তিত) আমায় “এশিয়ান ক্যুয়ের নেটওয়ার্ক” নামক ওয়্যাটসাপ গ্রুপে যুক্ত করলো তখনো বুঝতে পারিনি এর পরবর্তীতে ঠিক কি আসতে চলেছে। “আমরা একটা গে সার্ক বানানোর চেষ্টায় আছি”, শুনে মনে হয়েছিলো এও কি সম্ভব? কিন্তু উদ্যোগ থাকলে যে যেকোন কাজই সম্ভব তার প্রমাণ মিললো ১লা মার্চ, জন্ম নিলো “সায়ন”/”সায়ান” যার পুরো নাম “সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ ক্যুয়ার অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক”।

(ছবিঃ পর্দার ওপারে দিল্লীর হয়ে বক্তব্য রাখছেন কৌশিক হোড়)

সতরঙ্গির কৌশিক হোড়, আর আমেরিকান দূতাবাসের ক্রেগ হল -এর বিশেষ সহযোগিতায় প্রান্তকথার বাপ্পাদিত্য মুখার্জীর চেষ্টায় ভারতের বিভিন্ন শহর (কোলকাতা, দিল্লী, মুম্বাই) এর পাশাপাশি আলোচনায় বসলো ঢাকা। বিষয় সমান্তরাল লিঙ্গ-যৌন পরিচয়ের মানুষের অবস্থা, তাদের অসুবিধে, যা দেশ সীমানার গণ্ডি পেড়িয়ে কোথাও গিয়ে একইরকম। পাকিস্তানের করাচীর বন্ধুদেরও যোগ দেওয়ার কথা ছিলো, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরেই সেখানকার আমেরিকান দূতাবাসের পক্ষে জানানো হলো সেই বন্ধুরা উপস্থিত নেই। কারন এখনও অজানা।

(ছবিঃ কোলকাতার মার্কিন দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের সাথে আলাপচারিতায় বাপ্পাদিত্য মুখার্জী)

হ্যাঁ, সমস্ত দূতাবাসের পারস্পরিক মেলবন্ধন, সেখান থেকেই সবাই একসাথে যুক্ত হয়ে আলোচনা, আর অবশেষে আবারও দেখা হওয়ার প্রতিস্তুতি। “এটাই আমাদের সরকারের নীতি, বিশ্বের যেকোন জায়গায় সমান্তরাল লিঙ্গ-যৌন পরিচয়ের মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। আজ আমাদের প্রথম দেখা। এর পরবর্তীতে আমরা আরো বিভিন্ন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়েও আলোচনায় বসতে পারি।” জানালেন আমেরিকান দূতাবাসের কনসাল জেনারেল ক্রেগ হল। “কবে থেকে ভেবেছিলাম বল? এই এতোদিনে হলো তাহলে” বাপ্পাদিত্য মুখার্জীর গলাতেও এক অনাবিল আনন্দ আর ফেটে পড়া উৎসাহ।

(ছবিঃ পর্দার ওপাড়ে অভিনা নিজের ভাষায় তুলে ধরছেন দিল্লীর ট্রান্সজেন্ডারদের কথা)

সত্যিই এই উদ্যোগকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। “আর কয়েকবছরের মধ্যে ভারতবর্ষের নাগরিকদের মধ্যে সংখ্যাগুরু হতে চলেছে তরুণ প্রজন্ম। ভারতের নাগরিকদের গড় বয়স হবে ৩০এরও নিচে। সেদিক দিয়ে এরকম একটা উদ্যোগ কিন্তু খুবই প্রাসঙ্গিক” জানালেন মুম্বাইয়ের অশোক রো কবি। সাংস্কৃতিক স্তরে একে অন্যের সাথে যুক্ত বিভিন্ন মানুষের মধ্যে দেশের ভিন্নতার চেয়েও বড়ো হয়তো তাদের আন্দোলনের রাস্তা, তাদের মানবাধিকার স্খলনের গাঁথা।

(ছবিঃ মুম্বাইয়ে আমেরিকান দূতাবাস থেকে সায়নের আলোচনায় বিশিষ্ট আন্দোলনকারীরা)

“আমরা ভিন্ন ভিন্ন দেশের মাটিতে বড়ো হয়ে উঠেছি, কিন্তু যুঝে চলেছি একই অসুবিধেগুলো নিয়ে। ভারত হোক, পাকিস্তান, অথবা বাংলাদেশ, আমরা সবাই বয়ে চলেছি সাহেবদের ফেলে যাওয়া ৩৭৭ ধারা।” বাংলাদেশ থেকে জানালো চন্দ্রা। জুলহাজ পরবর্তী বাংলাদেশের গল্প, দুই সমকামী মেয়ের একসাথে কাছেও নতুন থাকতে পারা যেন দিল্লীর কাছেও নতুন না। সেখানেও যে দুজন ছেলের একসাথে থাকা সহজ নয় যখন কেউ বাড়িই ভাড়া দিতে চায়না। কোলকাতার তিস্তা দাসের প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের জয়স্মিতা (নাম পরিবর্তিত) জানালেন তাদের লিঙ্গ পরিচয় প্রমাণ করতে হয় ডাক্তারি পরিক্ষার মাধ্যমে, তাই অনেকেই সরকারের দেওয়া তৃতীয় লিঙ্গের সুযোগ সুবিধা পায়না। ঠিক একই গল্প কোলকাতার রঞ্জিতা সিনহার। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের ট্রান্সজেন্ডার বোর্ড মাসোহারা দেওয়ার জন্যেও যখন দাবী করে এস-আর-এস সার্টিফিকেটের।

(ছবিঃ করাচীর মার্কিন দুতাবাসে অনুপস্থিত বন্ধুরা)

কোলকাতার অভিজিৎ কুণ্ডু নিজের ডায়েরী বই আকারে ছাপার পরের দিন ছাটাই হন কোলকাতার নামী স্কুলের শিক্ষকতা থেকে। অন্যদিকে অঙ্কন বিস্বাস নিজে আইনজ্ঞ হয়েও কীভাবে ওকালতি করার সময় নিজের উর্দ্ধতন সহকর্মীদের থেকে শুনেছেন আপত্তিকর মন্তব্য তারও গল্প উঠে আসে আলোচনায়। সব গল্প ছাপিয়ে উঠে আসে কিছু প্রশ্ন, একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা, নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে নেওয়া শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ।

(ছবিঃ শুরুর আগে বাপ্পাদিত্য মুখার্জী আর ক্রেগ হল কথা বলছেন সায়নের আলোচ্য বিষয় নিয়ে)

দিল্লী থেকে কৌশিক হোড় প্রস্তাব রাখলেন এই আলোচনা সভার বাইরে গিয়ে এক বৃহত্তর ফোরাম তৈরি করার, বিনীত আবেদন রাখলেন মার্কিন দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে সমস্তরকম সহযোগিতার। কথাটা নিশ্চয়ই চন্দ্রার অন্তত খুব মনে ধরেছিলো। বাড়ি এসে পরেরদিনই দেখি নতুন এক ওয়্যাটসাপ গ্রুপে আমায় অ্যাড করেছে সে। আর এবার শুধু ভারত পাকিস্তান আর বাংলাদেশ নয়, তাতে রয়েছেন শ্রীলঙ্কা আর নেপালেরও বেশ কিছু বন্ধু। অতএব… পরবর্তী আলোচনার পথ আরো প্রশস্ত হলো, তৈরি হলো আরো অনেক নতুন বন্ধুদের পাশে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলন।

(ছবিঃ অনুষ্ঠানের শেষে করতালিমুখর কোলকাতার বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মীরা)

নাহ! এই সায়ন হয়তো রাত কাটিয়ে সত্যিই নিয়ে আসবে নতুন ভোরের সূচনা। এই সায়ন মনখারাপের নয়। হাতে মশাল নিয়ে নিজেদের অধিকারে নিজেদের বাড়ি ফেরার। এই সায়ন, ধ্রুবতারার অপেক্ষায়, তারাভরা আকাশের নিচে এবার পথ চলা শুরু, কিন্তু একা নয়, একসাথে।

“এর মাঝেই

বহুজনেরা সাঁতরে এপার ওপার ।

ওপারে

নাকি পোনা মাছের চাষ আছে

আছে মৎস্যকুমারীরাও

দাবী দু’একজনের “

—— জুলহাজ মান্নান

[ছবিসূত্রঃ বাপ্পাদিত্য মুখার্জী]


মিঃ গে ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া ২০১৮-এর খেতাব জিতে নিলেন বাংলার সমর্পণ মাইতি

বন্ধু সমর্পণ, মেদিনীপুর থেকে সটান কোলকেতা হয়ে মুম্বাই, আর তারপর? মিঃ গে ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া ২০১৮।।

লেখাটা লিখছি অনেক জায়গা ছুঁয়ে যাওয়ার জন্যে। সমর্পণ একজন “টুম্পা”, কথাটা শুনেছো আগে? টুম্পা মানে “টিপিকাল আনসোশ্যাল মেদিনীপুরিয়ান পাবলিক এসোসিয়েশন”… হ্যাঁ, সমর্পণের অনেকগুলো পরিচয়ের মধ্যে এটাও একটা পরিচয় বটে। ওর বাকি পরিচয়গুলো দেওয়ার আগে আরো কিছু টুম্পার নাম করা যাক? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যিনি বিধবাবিবাহ নিয়ে বিশেষ সক্রিয় ছিলেন, তিনি একজন টুম্পা ছিলেন। ক্ষুদিরাম বসু কে মনে আছে? অথবা বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরার কথা? এরা কিন্তু সবাই টুম্পা। “টুম্পা”-দের নিয়ে খাস কোলকাতার লোকেদের কতো না হাসাহাসি। রেসিস্মের চুরান্ত। সমর্পণ কিন্তু সেই মেদিনীপুরেরই ছেলে। হাসিখুশী, সবার সাথে মিশে যাওয়া, সরল সাধাসিধে একজন মানুষ। আর অবশ্যই আরেকজন টুম্পা। কি? এবার থেকে এই শব্দটা ব্যবহার করতে একটু হলেও লজ্জা পাবো তো আমরা? মানুষের জাত/বর্ণ/ধর্ম/উৎস, এগুলোর চেয়ে বেশী করে তার “মানুষ” পরিচয়টুকুকে বেশী প্রাধান্য দেবো তো? নাকি প্রান্তিকতায় থেকেও, অন্য প্রান্তিকতাগুলোকে উস্কে দিয়ে যাবো আজীবন, যেমন দিয়ে চলেছি।

সমর্পণ মানে গয়নাবড়ী থেকে পেশীসঞ্চালণ। সমর্পণ মানে হার্মোনিয়াম বাজিয়ে টপ্পা, আর সাথে ঝাঁ চকচকে মডেলিং। সমর্পণ মানে, সবার সামনে লাজুক, কিন্তু ন্যুড ফোটোগ্রাফি, বা সিনেমার বেডসিনে সচ্ছল। এই বন্ধুকে ভালো লাগার খুব বড়ো কারণ হয়তো, এর এই খোপে না ঢুকে নিজের স্বত্বার তারল্যকে আঁকড়ে ধরে ভেসে চলা।

অনেক অনেক শুভেচ্ছা তোমার এই নতুন খেতাবের জন্যে বন্ধু। কিছুদিন হলো, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের সাথে সরাসরি কথা বলছো তুমি লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিকতায় থেকেও সাবলীল থাকা নিয়ে। নিজের বোনের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে মিশিয়ে দিয়েছো সমলিঙ্গে প্রেম/বিবাহের বার্তাও। ক্যান্সারের মতো মারণরোগের পাশাপাশি কাজ করছো ক্রুসিং বা আনাচেকানাচে যৌনভিক্ষু মানুষদের নিয়েও। আমাদের কাছে অনেকদিন থেকেই, আরো অনেক মানুষদের মতো তুমিও পথিকৃৎ। আমাদের অনেকের কাছেই তুমি অনেক আগে থেকেই সেই মানুষ, ভালোমন্দ মিশিয়ে যাকে শ্রদ্ধা করা যায়, আপন করা যায়।

ভালো থেকো সমর্পণ, বিশ্বের দরবারে তুমি ভারতের লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করবে। অনেক শুভকামনা রইলো তোমার জন্যে, কাঁচালঙ্কার তরফে।

কোলকাতা/মেদিনীপুর/মালদা/খুলনা/ঢাকা/আগরতলা — এ’সবের উর্দ্ধে উঠে আজ আমরা সবাই, বাঙ্গালি হিসেবে, তোমায় নিয়ে গর্বিত।

[ছবি প্রতিযোগীর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে গৃহীত। তুলেছেন অনিন্দ্য কর।]