যৌনতায় যখন পরিচয়/সমাপ্তি পর্ব

যৌনতায় যখন পরিচয়/সমাপ্তি পর্ব

— অবকাশে সঞ্জয়

– মহাশয়ের পরিচয়?

– কোন্‌ পরিচয় জানতে চান?

– এ আবার কেমন প্রশ্ন? আপনার পরিচয় জানতে চায়।

– একজন মানুষের তো অনেক রকম পরিচয় হয়। আপনি কোন্‌ টা জানতে চান?

– তাই নাকি!

– হ্যাঁ। আপনার এ নিয়ে কোন সন্দেহ আছে নাকি?

– না, ঠিক সন্দেহ নয়। কিন্তু কেমন একটা ধন্দ লাগছে।

– আমি সেই ধন্দ কাটিয়ে দিচ্ছি। আপনি বলুন তো ঋতুপর্ণ ঘোষ কে ছিলেন?

– কে আবার! একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। আচ্ছা উনি কি সত্যিই ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলের সঙ্গে…

– সত্যজিৎ রায় কে ছিলেন?

– ওরে বাবা, উনিও বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। একমাত্র বাঙালী যিনি অস্কার পেয়েছেন। – ঋতুপর্ণ ঘোষও প্রচুর আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। আপনি কিন্তু সেই আলোচনায় গেলেন না।

– না মানে…

– মানে আবার কি? আপনি ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্য আরেকটা পরিচয় জানতে চাইছিলেন। আর সেটা হল, ওনার যৌন পরিচয়। তাই তো?

– না, হ্যাঁ। আসলে…

– আসলে একজন মানুষের কর্ম পরিচয় বা অন্য কোন পরিচয় তা সে যতই খ্যাতি দিক না তাকে, তিনি যদি যৌনতায় সংখ্যালঘু হন, তাহলে সংখ্যাগুরুরা তার সব পরিচয় বাদ দিয়ে কেবল যৌন পরিচয় নিয়েই কথা বলেন।

– হুম। আসলে…

– আসলে মানুষ যৌনজীবী। যৌনতা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলে আর অন্য কিছু নিয়ে কথাই বলতে চাই না।

– কিন্তু…

– কোন কিন্তু নেই এর মধ্যে। যে যৌনতা একজন মানুষের ব্যক্তিগত, গোপনীয় অধিকার। যা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা নিষিদ্ধ করা দরকার, তা কিনা মানুষের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

– সত্যি। ঠিক বলেছেন তো। যৌনতা কখনও মানুষের পরিচয় হতে পারে না।

– কিন্তু এমন দুর্ভাগ্য, যৌনতায় পরিচয় হয়ে দেখা দেয়। দেখা দিলে ক্ষতি ছিল না। ক্ষতি তখন হয়, যখন মানুষের কর্মক্ষমতা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এই যৌনতার দাঁড়িপাল্লায় তুলে মাপা হয়।

– ঠিক। আচ্ছা এসব কি কোনদিনও বন্ধ হবে না?

– জানি না। তবু আশায় তো থাকি। একদিন নিশ্চয় মানুষ বুঝবে যৌনতা নয়, কর্মই আমাদের একমাত্র পরিচয়।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

(সমাপ্ত)


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৯

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৯

অবকাশে সঞ্জয়

–      আপনার নাম?

–      অনিমেষ দত্ত।

–      পিতার নাম?

–      অরবিন্দ দত্ত।

–      বয়স?

–      বত্রিশ।

–      লিঙ্গ?

–      পুং

–      লেখাপড়া?

–      ইতিহাসে এম.এ.

–      জীবিকা?

–      প্রাইভেট টিউশন।

–      অবসরে কি কি করেন?

–      গান শুনি। একটু আধটু বই পড়ি।

–      ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ।

–      ব্যাস? আর কোন জিজ্ঞাসা নেই?

–      না! কোন মানুষের পরিচয় হিসাবে এটুকু তো যথেষ্ট।

–      তাই?

–      হুম।

–      আমার মনে হয় এগুলো কোন মানুষের পরিচয়ই নয়।

–      তাহলে আপনিই বলুন কোন মানুষের পরিচয় পেতে কি কি জানা উচিৎ?

–      কেন বাসের গায়ে লেখা থাকে তো কি জানে উচিৎ?

–      মানে!

–      বা রে, বাসে উঠলে দেখেন তো বড়বড় করে লেখা থাকে আপনার ব্যবহার আপনার পরিচয়।

–      বুঝলাম। তা আপনার ব্যবহার কেমন তা কিছু প্রশ্ন করে জানার উপায় আছে বলে তো কখনো শুনি নি। আপনিই বলুন কি প্রশ্ন করব।

–      নাম ধাম জিজ্ঞেস করার পরেই আপনি জানতে চাইতে পারতেন যে রাস্তাঘাটে কাদের দেখতে ভালো লাগে?

–      গুড কোশ্চেন। বেশ বলুন কাদের দেখেন?

–      ছেলেদের।

–      সে কি! আপনি ছেলে হয়ে মেয়েদের না দেখে ছেলেদের দেখেন কেন?

–      ভালো লাগে তাই।

–      হুম। কিন্তু…

–      অনুচ্চারিত প্রশ্ন করবেন না। সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন।

–      ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হন। তার মানে আপনি কি…

–      আবার অসম্পূর্ন জিজ্ঞাসা। স্পষ্ট বলুন।

–      আপনি কি সমকামী?

–      হ্যাঁ। বিছানায় ভালোবাসার সময় পাশে কোন পুরুষই পছন্দ।

–      আপনাকে দেখে তো…

–      আবার কথার কথায় থেমে যাওয়া। যাইহোক আপনাকে তো বললাম,  দেখে বা নাম ধাম জেনে কারও পরিচয় জানা যায় না। জানতে চেষ্টাও করবেন না। পরিচয় জানা যায় ব্যবহারে। আর ব্যবহার জানা যায়…

–      কাছাকাছি হলে। তাই না।

–      হুম। কিন্তু বেশিরভাগ যতটা কাছে আসা উচিৎ ততটা না এসেই মনগড়া কিছু বিশ্বাস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। সেটা আরও মুশকিল।

–      আমি তেমন সিদ্ধান্ত নেব না। কাছে এসে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নেব। আজ আসি। পরিচয়পর্বে এর বেশি কাছাকাছি হওয়াটা ভালো দেখায় না।

–      আসুন।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৮

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৮

অবকাশে সঞ্জয়

–      কালকের কোর্টের রায় শুনেছো?

–      কোর্টে তো রোজই রায় বেরোয়। তুমি কোন্‌ কোর্টের রায়ের কথা বলছ?

–      আরে এক বৃহন্নলাকে গ্রেফতার করে কাল আলিপুর কোর্টে তোলা হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে বিচারকের রায়।

–      ও তাই? না গো শুনিনি।

–      আরে পেপারে দিয়েছে। পড়ে নাও।

–      তুমি তো পড়েছো। তুমিই বলো না।

–      বিচারক বৃহন্নলার জামিন না দিয়ে লক আপে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

–      এই কথা। তা তো দিতেই পারে। তা নিয়ে আবার হৈ চৈ এর কি আছে।

–      আগে পুরো টা শোন।

–      বেশ বলো।

–      বিচারক লক আপে রাখার নির্দেশ দেওয়ার পরই ওই বৃহন্নলার উকিল বলেন, কোন্‌ লক আপে রাখা হবে হুজুর, আমার মক্কেল তো নারীও নন, পুরুষও নন। ইনি তৃতীয়লিঙ্গ।

–      তা ঠিক। তা বিচারক কি করলেন তখন?

–      বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, ওই বৃহন্নলাকে পৃথক বিশেষ সেলে রাখতে হবে।

–      বাহঃ। এই নির্দেশ সত্যি এক যুগান্তকারী রায়। তৃতীয়লিঙ্গের নিজস্ব সত্তার জয়।

–      হুম। সেজন্যই তো বললাম।

–      কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে।

–      কি?

–      ওই বৃহন্নলা কে যে পুলিশ অফিসার গ্রেফতার করেছিলেন তিনি কে?

–      মানে?

–      তিনি নিশ্চয় পুরুষ কিংবা নারী পুলিশ অফিসার?

–      হ্যাঁ, তা তো হবেই।

–      লক আপে যদি পৃথক সেল হয়, তাহলে গ্রেফতার করার সময় নারী বা পুরুষ কেন? কেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দিয়ে গ্রেফতার করা হবে না?

–      তাই তো… তার মানে তুমি বলতে চাইছো…

–      আমি বলতে চাইছি লিঙ্গ ভিত্তিক নারী ও পুরুষ যখন সকল কর্মক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে তৃতীয়লিঙ্গরা কেন পাবে না?

–      ঠিক। পাওয়া উচিৎ। পেলেই তবে তৃতীয় লিঙ্গের যৌন পরিচয় সার্থকতা লাভ করবে।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৭

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৭

অবকাশে সঞ্জয়

আচ্ছা জীবনের জয় পরাজয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব কতখানি?

বিশাল গুরুত্ব।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। সেজন্যই তো কেউ পরিচয় গোপন করে। কেউ আবার গোপন পরিচয় ফাঁস করে দেয়।

যেমন?

যেমন কর্ণ অস্ত্রশিক্ষায় জয়লাভ করতে গুরুদেব পরশুরামের কাছে নিজ পরিচয় গোপন করেছিলেন। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবদের জয় নিশ্চিত করতে কুন্তি নিজে গিয়ে কর্ণের জন্মপরিচয়ের গোপনীয়তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন।

হুম বুঝলাম। তাহলে তোমার মত কি? নিজ পরিচয় গোপন করা ভালো, নাকি সঠিক পরিচয় দিয়ে দেওয়া উচিৎ?

ভালো প্রশ্ন করেছো। কিন্তু গোপন করলেও বিপদ। আবার পরিচয় দিলেও সর্বনাশ।

তাহলে তো মহাসমস্যা।

সমস্যা বলে সমস্যা। তুমি নিশ্চয় জানো সম্প্রতি এক স্কুলশিক্ষক নিজ যৌন পরিচয় প্রকাশ করায় তার চাকরী গিয়েছে।

হুম জানি। এবং তার বিরুদ্ধে এও অভিযোগ তিনি তার যৌন পরিচয় গোপন করে এই চাকরীতে ঢুকেছিলেন।

ঠিক সেদিনের কর্ণের মতো তাই না?

হ্যাঁ। তাহলে এখন উপায়। জীবনযুদ্ধে কর্ণের মতো ইনিও কি পরাজিত হবেন?

কর্ণ কি শেষ পর্যন্ত পরাজিত নাকি বিজয়ীবীর হয়ে বেঁচে আছেন?

বিজয়ী হয়ে।

তবে?

তাহলে তুমি বলতে চাইছো প্রয়োজনে নিজ পরিচয় গোপন করায় কোন দোষ নেই?

একদম। তবে তা ঠিক সময়ে প্রকাশও কোরো। তাহলেই বিজয় তিলক পরিয়ে দেবে তোমার ললাটে মহাকাল।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

[সম্পাদকীয় পুনশ্চঃ সাম্প্রতিক বাস্তব ঘটনার উল্লেখ থাকলেও, এই লেখা ১০০% তথ্যগতভাবে সঠিক নাও হতে পারে। সাহিত্যের স্বার্থে কিছু কল্পনার মিশ্রণের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। লেখক, সম্পাদক, এবং কাঁচালঙ্কার দল, বরাবরই লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের উপরে হয়ে চলা অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করে চলেছে, এবং আমাদের তরফে এই লড়াই চলতেই থাকবে যতদিন না তাদের মানবাধিকার এবং সমানাধিকার সুপ্রতিষ্ঠা পাচ্ছে]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৬

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৬

অবকাশে সঞ্জয়

 

–আচ্ছা কাম বিষয়ক গ্রন্থ কখনও শাস্ত্রগ্রন্থ হতে পারে?

— ঠিক জানি না গো। কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন করছ কেন?

— না এমনি মনে হল। শাস্ত্র মানেই তো ধর্ম ধর্ম ব্যাপার।

— হুম। তা কাম কোন ধর্মীয় ব্যাপার নয় বলছ?

— কি যে বলো। কাম থেকে মুক্তির পথ খোঁজাই তো ধর্মের উদ্দেশ্য।

— তাই নাকি!

— হ্যাঁ। কোন সন্দেহ নেই।

— কিন্তু কাম যদি কারও ধর্ম হয়?

— দূর। তা কক্ষনো হয় না। হতে পারে না।

— তোমার মনে হয় না যে কাম জীবনের ধর্ম।

— কিভাবে?

— কিভাবে মানে! কাম যদি না থাকতো, তাহলে জীবন প্রবাহ থাকতো?

— না থাকতো না। তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। তারপরেও বলছি, সেটা মানুষের জৈবিক ক্রিয়া। ধর্ম নয়।

— বেশ। তা ধর্ম বলতে তুমি কি বোঝ?

— কেন মুক্তির পথ খোঁজা।

— কিসের থেকে মুক্তি?

— মনুষ্যজীবন থেকে মুক্তি।

— কিন্তু মানুষ কি সত্যি তার মনুষ্য জীবন থেকে মুক্তি চায়?

— চায় না বলছ?

— না চায় না। মানুষ বাঁচতে ভালোবাসে। বেঁচে থাকার জন্য কত কষ্ট করে বলো তো।

— কিন্তু…

— কোন কিন্তু নেই এরমধ্যে। মানুষ ভালোবাসে আনন্দ। শান্তি।

— আর…

— আর সেই শান্তি ও আনন্দ যে যার মতো করে পথ হেঁটে খুঁজে পেতে চায়।

—  বেশ। ধর্মে আনন্দ ও শান্তি পাওয়া যায় তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু কামে…

— কামও তো জীবনকে আনন্দদানের জন্য। আর সেই আনন্দ কত উপায়ে দেওয়া যায় তারই জন্য ঋষি বাৎসায়ন লিখেছেন নানা কামকলা যা জীবনের কাছে কামশাস্ত্র।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৫

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৫

অবকাশে সঞ্জয়

 

–বেশ তুমিই বলো কি দেখে যৌন পরিচয় ঠিক করা উচিৎ?

–সত্যি কি দেখে করা উচিৎ বলো তো?

–কি আবার! যৌনাঙ্গ দেখে।

— ঠিক। কিন্তু শরীরের কোন্‌ যৌনাঙ্গ দেখে?

— কোন্‌ যৌনাঙ্গ মানে! শরীরে আবার কটা যৌনাঙ্গ থাকে?

— অনেক থাকে। আমার মতে তো প্রতিটা অঙ্গ যৌনাঙ্গ।

— কি যা তা বকছ!

— কেন, ভুল কি বললাম?

— শরীরের প্রতিটা অঙ্গ যৌনাঙ্গ হয় কখনও? যৌনাঙ্গ তো একটি।

— তুমি ভুল বলছ এবার। তুমি যাকে যৌনাঙ্গ বলছ সেটা প্রকৃত অর্থে জননাঙ্গ। তবে হ্যাঁ, জননাঙ্গও যৌনাঙ্গ।

— বুঝলাম। তা অন্য আর কোন অঙ্গকে তুমি যৌনাঙ্গ বলছ?

— কেন? শরীরের যেসব অঙ্গ যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয়।

— মানে!

— মানে তো জলের মতো সোজা। যৌনাঙ্গ মানে কি? যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয় এমন অঙ্গ। তা ঠোঁট,জিভ, স্তন, হাত এগুলি কি যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয় না?

— তা নেয়। কিন্তু…

–কোন কিন্তু নেই। আসলে মানুষ জননক্রিয়া আর যৌনক্রিয়া কে গুলিয়ে ফেলে।

— হুম। তা ঠিক বলেছো। তা তোমার মতে কোন অঙ্গ দেখে যৌন পরিচয় ঠিক করা উচিৎ?

— কোন অঙ্গ দেখে নয়।

— তাহলে?

— যৌন পরিচয় যৌনক্রিয়া জেনে ঠিক করা উচিৎ। আর তা একমাত্র নিজস্ব ঘোষণা থেকে।

— অর্থাৎ…

— প্রতিটা মানুষ নিজস্ব যে যৌন পরিচয় দিতে ইচ্ছুক হবে তার যৌনপরিচয় সেটাই হবে।

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৪

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৪

অবকাশে সঞ্জয়

ক’দিন আগে একটি দৈনিক সংবাদপত্রে সংবাদটা বেরিয়েছিল। ছেলে সেজে দশ বছর পার আফগান কন্যার। এই ছিল সংবাদটির শিরোনাম। মূল ঘটনা হল আফগানিস্তানের এক বিশেষ প্রথা অনুসারে যেসব পরিবারে কোন ছেলে জন্মায় না, শুধু মেয়ে জন্মায় সেই পরিবার কোন এক মেয়েকে ছেলে সাজিয়ে মানুষ করে। এই প্রথা স্থানীয় ভাষায় বাচা পোশি নামে পরিচিত। সংবাদটির শেষে সাংবাদিক মেয়েটির লিঙ্গ পরিচয় জনিত সংকট সংক্রান্ত প্রশ্নও তুলেছেন এবং জনৈক অধ্যাপক ফেতরাত-কে কোড করে লিখেছেন, এই মেয়েরা বাধ্য মেয়েদের ভূমিকায়  মানিয়ে নিতে পারে না। অবসাদের শিকার হয়। যাইহোক নিউজটি পড়ে জানতে পারি নি যে পরিবারে জন্ম নেওয়া একাধিক মেয়েদের মধ্যে কোন্‌ মেয়েকে ছেলে সাজানো হয়। যে কোন মেয়েকে কি? নাকি যে মেয়েটি শৈশবে বেশ দূরন্ত অর্থাৎ ছেলেলি আচরণ করে তাকে? নিউজটি এও জানিয়েছে, মেয়েটি ছদ্মবেশে অর্থাৎ ছেলে সেজে ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছেলেদের মতো ইঁটভাটায় কাজ করে রোজ। কিন্তু অন্য ছেলেরা বুঝতেই পারে না যে সে ছেলে নয়, মেয়ে। যত খটকা এইখানে। যতই ছেলে সেজে থাক। অন্যরা বুঝতে পারবে না? তা কি সম্ভব? সম্ভব হতে পারে যদি ছেলেটি রূপান্তরকামী পুরুষ হয়। কে বলতে পারে, ‘বাচা পোশি’ প্রথা হয়তো এক ধরনের রূপান্তরকামী প্রথার স্বীকৃতি। নইলে ছেলেদের ভিড়ে কোন মেয়ে যতই পরিবারের চাপ থাক কাজ করতে পারতো না। যৌনতা যে বড় বালাই। এ কেবল পরিচিতির সংকট তৈরি করে না, অন্যদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতেও দরকার হয়।

[ছবিঃ অরূপ দাস]

 


যৌনতায় যখন পরিচয়/১৩

যৌনতায় যখন পরিচয়/১৩

অবকাশে সঞ্জয়

পরিচয়, পরিচয় আর পরিচয়। পরিচয়হীন হয়ে এ জীবনে বাঁচা যায় না। তাই তো আলাপের শুরুতেই আমরা একে অপরের পরিচয় জানতে চায়। যেমন একদিন জানতে চেয়েছিলেন গুরু দ্রোনাচার্য্য। গভীর জঙ্গলে এক অজ্ঞাতকুলশীল যুবককে দেখে শুধিয়েছিলেন কি তার পরিচয়। সেই যুবক নিজ নামটুকু বলতে পারলেও আর কোন সম্মানসূচক পরিচয় দিতে পারে নি। তবে হ্যাঁ, সে এটুকু বলেছিল যে, সে গুরু দ্রোনাচার্য্যের শিষ্য। সেই কথা শুনে গুরু দ্রোণ অবাক হয়ে বলেছিলেন, আমি তো তোমাকে অস্ত্রশিক্ষা দিই নি। তাহলে তুমি কেমন করে আমার শিষ্য হলে? এরপর সেই অজ্ঞাতকূলশীল যুবক অর্থাৎ একলব্য কি বলেছিল এবং তারপর গুরুদক্ষিনা হিসাবে গুরু দ্রোণ কি চেয়েছিলেন তা আমাদের সবার জানা। সেদিন একলব্য শুধুমাত্র  এক মহান  গুরুর শিষ্যত্বের পরিচয়টুকু পাওয়ার জন্য নিজ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ অঞ্জলি দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি একটি সংবাদের প্রেক্ষিতে উঠে এল আবার সেই একলব্য প্রসঙ্গ। লোক আদালতে দুই রূপান্তরকামী নারীর বিচারক হওয়া প্রসঙ্গে দেশের প্রথম রূপান্তরিত নারী হিসাবে কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হয়েছেন যিনি সেই মানবীদি বলেন, রূপান্তরকামীদের একলব্যের মতো নিজের যোগ্যতা দেখাতে হবে। সেদিন একলব্য নিজের যোগ্যতা দেখাতে গিয়ে গুরু দ্রোণের  নির্দেশে নিজ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে গুরুদেবের চরণে অঞ্জলি দিয়েছিলেন। এই সমাজ বা রাষ্ট্রকে যদি গুরু দ্রোণ ব’লে ধরে নিই তাহলে সেই গুরু কি নিজের গুরুগিরি দেখিয়ে বলছেন, ওহে রূপান্তরকামী তুমি যদি নিজেকে রূপান্তরকামী নারী বলতে চাও তাহলে প্রথমেই নিজ লিঙ্গচ্ছেদ করে সমাজের চরণে তা অর্পন করো। জানি এটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত। উনি এসআরএস নামক লিঙ্গান্তরকরণের সার্জারীর পক্ষে নিজ মতামত দিতেই পারেন। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট যেখানে সেলফ আইডেনটিফিকেশানের কথা স্পষ্ট বলেছেন, সেখানে ‘একলব্য’-এর মতো নিজ যোগ্যতা দেখাতে হবে একথা বলা কেন? তবু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই রূপান্তরকামীরা একলব্য হয়ে নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন। কিন্তু তারপর? সমস্ত যশ খ্যাতি প্রতিপত্তি নিয়ে রাজাধিরাজ হয়ে রাজত্ব করবে অর্জুন। আর একলব্যরা চিরকাল হারিয়ে যাবে গহীন বনে? তাহলে কি লাভ একলব্য হয়ে? শুধুই পরিচয় প্রাপ্তি? রূপান্তরকামীরা নিজ পরিচয়সংকটে ভোগেন ঠিকই। কিন্তু সেই সংকট দূরীকরণের জন্য সমাজের কাছে এইভাবে একলব্য হতে হবে? জানি না। সত্যি জানি না। তবে এটুকু জানি, পরিচয়, পরিচয় আর পরিচয়। পরিচয়হীন হয়ে এ জীবনে বাঁচা যায় না। আর সেই পরিচয় যদি হয়, যৌন পরিচয় তখন এ সমাজ বোধহয় এভাবেই গুরুদক্ষিণা চায়!

[ছবিঃ অরূপ দাস]


যৌনতায় যখন পরিচয়/১২

যৌনতায় যখন পরিচয়/১২

অবকাশে সঞ্জয়

–       সেক্স কোথায় থাকে?

–       সত্যি কোথায় থাকে বলো তো?

–       তুমিই বলো।

–       না, তুমি বলো। প্রশ্নটা তুমি তুলেছো। তোমাকেই বলতেই হবে।

–       আমি তো বলবই। কিন্তু প্রশ্নটা যখন আমি তোয়াকে করেছি, তখন তোমার আগে উত্তর দেওয়া উচিৎ।

–       ধ্যাৎ, আমি জানি না।

–       জানি না আবার কি? তোমার যা মনে হয় তাই বলো।

–       আমার কিছু মনে হয় না।

–       বেশ আমি ক্লু দিচ্ছি। আমাদের সবার পরিচয়পত্রে তো সেক্স লেখা থাকে।

–       হ্যাঁ, তা থাকে।

–       তো সেটা কি দেখে লেখে?

–       কি আবার! সেক্সুয়াল অরগ্যান দেখে।

–       তাহলে এবার বলো সেক্স কোথায় থাকে?

–       তোমার কথা অনুসারে সেক্স সেক্সুয়াল অরগ্যানে থাকে।

–       এটা আমার কথা নয়, যারা সেক্স কলামে আমাদের সেক্স কি লেখে তারা বলে।

–       বেশ তা নয় বুঝলাম। এবার তোমার মত শুনি।

–       হুম আমার মত তো জানাবোই। তার আগে আর একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি।

–       করে ফেলো।

–       তোমার যদি খুব মন খারাপ থাকে, তখন সেক্সুয়াল অরগ্যান কাজ করে?

–       ধ্যুৎ, এমন আজে বাজে ব্যাখ্যা দাও তুমি ভাল্লাগে না।

–       হোক আজেবাজে। তুমি উত্তরটা দাও।

–       মন খারাপ থাকলে শরীরের কোন অরগ্যানই কাজ করে না।

–       হ্যাঁ, তোমার এইকথাটা কিছুটা ঠিক। মন খারাপ থাকলে খিদে-ঘুম যদিও বা পায়, সেক্স একেবারেই কাজ করে না।

–       বেশ মেনে নিলাম।

–       তাহলে এবার বলো সেক্স কোথায় থাকে?

–       কোথায় আবার! তোমার যুক্তি মেনে নিলে বলতে হয় সেক্স মনে থাকে।

–       মেনে নিলে নয়, এটাই সত্যি। সেক্স মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

 [ছবিঃ অরূপ দাস]

যৌনতায় যখন পরিচয়/ ১১

যৌনতায় যখন পরিচয়/ ১১

অবকাশে সঞ্জয়

ও মশাই, আপনি কি লিঙ্গ?

আমি?

হ্যাঁ। হ্যাঁ। আপনি।

কেন বলুন তো ?

আবার জিজ্ঞেস করছেন কেন ?

হ্যাঁ, হঠাৎ আমার লিঙ্গ পরিচয় জানতে চাইছেন। কিন্তু কেন বুঝতে পারছি না। তাই…

কিছুদিন ধরেই দেখছি আপনি পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ- এর বাইরে যারা তাদের নিয়ে খুব লেখালিখি করছেন।

তো ?

তাই সন্দেহ হল, আপনি নিশ্চয় পুং নন। কি ঠিক ধরেছি তো ?

কি করে ধরলেন বলুন তো ?

আমি সব ধরতে পারি।

খুব ভালো। অনেকেই অনেককিছু ধরতে পারেন।

ওসব ধরাধরির কথা বাদ দিন। আপনি পুংলিঙ্গ নন সেটা তো জানলাম। কিন্তু…

কিন্তু কি…

কিন্তু কি লিঙ্গ তা তো বললেন না…

বলতেই হবে?

হ্যাঁ। কেন মশাই অসুবিধে আছে নাকি?

না, না অসুবিধে থাকবে কেন?

তাহলে বলুন। শুনি।

আমি আসলে…

আমি আসলে কি…?

আমি হলাম গিয়ে স্ফুলিঙ্গ।

[ছবিঃ অরূপ দাস]