সায়ান – দ্বিতীয় অধ্যায় – কিছু জানা/অজানা হাসিকান্নার গপ্পো

সায়ান – দ্বিতীয় অধ্যায় – কিছু জানা/অজানা হাসিকান্নার গপ্পো

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন / নিজস্ব সংবাদদাতা

(বাকি আট শহরের সাথে সায়ানের আলোচনায় কোলকাতা / ছবিসূত্রঃ বাপ্পাদিত্য মুখার্জী)

১লা মার্চে প্রথম জন্ম নেওয়ার পর, ২০শে জুন ২০১৮, সায়ান (সাউথ এশিয়ান ইয়ং অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক) -এর দ্বিতীয় অধ্যায়, আগের চেয়ে অনেকটাই বড়ো, অনেকটাই শক্তিশালী। এবারে আর ৪টি নয়, যুক্ত হলো ৯খানি শহর, ভাগ করে নিলো নিজেদের হাসিকান্নার কথা। আমেরিকান কনসুলেটের তরফে অনুরোধ রাখা হয়েছে এই পর্বের গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যে, অতএব বন্ধুদের কাছে আপাতত পৌঁছে দিচ্ছি, দ্বিতীয় পর্বের বিশদ, এক আলোচনা সভা, যার বিষয়বস্তু ছিলো প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌন-পরিচয়ের তরুণদের উপরে ঘটে চলা বৈষম্য। যাতে যুক্ত হলো আরো অনেক গল্প, আরো অনেক আনন্দ/ক্ষোভ/বঞ্চনা।

সমর্পণ মাইতি, শুভাগতা ঘোষ, নমিত বাজোরিয়া, রঞ্জিতা সিনহা এবং বাপ্পাদিত্য মুখার্জি, পাঁচ ধরণের মানুষ, পাঁচমিশালী অভিজ্ঞতা। সকলের সাথে তাদের এই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ রাখেন জে ট্রিলার। এর সাথেই বেড়িয়ে আসতে থাকে একের পরে আরেক বঞ্চনার খবর।

মিঃ গে ইন্ডিয়া এবং মিঃ গে ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানাধিকারী সমর্পণ জানায়, কিভাবে স্কুলে তাকে বিভিন্ন ঠাট্টা তামাশার সম্মুখীন হতে হয়েছে তার নরম মেয়েলী ব্যবহারের জন্যে। সন্তস্ত্র শিশু সমর্পণের ভয় হতো স্কুলে যেতে, অসহ্য লাগতো সবকটা ক্লাস করতে। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষকেরাও অসম্মানসূচক মন্তব্য ছুড়ে দিতো অনায়াসে।

“আগে গ্রামে ছিলাম, সেখান থেকে এলাম কোলকাতায়, আর মিঃ গে ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার সুবাদে পাড়ি দিলাম বিদেশেও। বৈষম্য সব জায়গায় আছে। ধরণটা খালি আলাদা। কলেজে পড়ার সময় মফঃস্বলে এক হোস্টেলে আমায় সমকামী, শুধু এই সন্দেহেই বের করে দেওয়া হয়েছিলো। ভেবেছিলাম কোলকাতা শহরের অবস্থা হয়তো আলাদা। কিন্তু কোথায়? যেই গবেষণাগারে আমি কাজ করতে শুরু করলাম, সেখানেও দেখলাম মেয়েলী ছেলেদের কিভাবে হ্যাটা করা হয়। ভাবলাম, নাহ! আত্মপ্রকাশ করাটা জরুরী, উদাহরণ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরাটা জরুরী। কিন্তু মিঃ গে ইন্ডিয়া হওয়ার সাথে সাথে আমাকেও ওখানে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করা হয়। আমি নাকি সহকর্মীদের উপরে খারাপ প্রভাব বিস্তার করতে পারি। আর এখন অন্য কোন গবেষণাগারে গেলেও আমার উপস্থিতি নিয়ে তারা সচ্ছন্দ নয়। আমার যোগ্যতার চেয়ে আমার যৌনতাটাই বেশী বড়ো হলো?”

“স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি”-র সাথে যুক্ত শুভাগতাদি জানালেন কিভাবে সমকামী মেয়েরাও প্রায় একইভাবে বঞ্চনার শিকার হয়।

“যতক্ষণ মেয়ে চুপচাপ আছে, সব ভালো, যেই মুখ ফুটে বলে ফেললো যে সে আরেকটা মেয়েকে ভালোবাসে, ব্যাস, তখন থেকেই সব শেষ। সবার আগে তো মেয়ের পড়াশোনাটা বন্ধ করো, যাতে জোড় করে বিয়ে দেওয়াটা সুবিধে হয়। যদি কোনভাবে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে বাবা-মা রাই আপিস বয়ে গিয়ে বলে আসেন, দেখবেন, আমার মেয়ে কিন্তু সমকামী, আপনাদের আপিসে বাকি যে মেয়েরা কাজ করেন, তাদের সাবধানে রাখবেন। এরপর আর কার চাকরী থাকে? মফঃস্বলের অবস্থা আরো ভয়ানক। এই গত ২৫শে মেই দুইজন একই কলেজে পড়া মেয়ে আত্মহত্যা করলো। আমাদের হাতে এমন কিছু প্রমাণ এসেছে, যাতে মনে হচ্ছে নিজেদের ভালোবাসাকে পূর্ণতা না দিতে পারার হতাশাই এই আত্মহত্যার কারণ।”

একদিকে সমকামী তরুণীরা যেমন শোষণ হয়ে চলেছে এভাবে, রুপান্তরকামী পুরুষদের অসুবিধে আবার অন্য জায়গায়। শুভাগতাদির ভাষায় স্কুল-কলেজে নিজেদের ইচ্ছে মতো পোশাক না পড়তে পারা, আর অন্যদিকে সঠিক বাথরুম না থাকায় তাদের দৈনন্দিন সাঙ্ঘাতিক সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয়।

কুচিনা সংস্থার কর্ণধার নমিত বাজোরিয়া তুলে ধরলেন সংস্থাদের ভিতরে এলজিবিটি / লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের কাজ দেওয়াটাও কতোটা জরুরি।

“আমি সেভাবে কখনো এই এলজিবিটি কি জিনিষ জানতামই না, বুঝতাম কম বিষয়টা নিয়ে, কিন্তু গত এক সভায় মালদা জেলার রুপান্তরকামী প্রিয়াঙ্কার কথা জানলাম, আমি ঠিক করলাম, নাহ, ৩/৪ বছর ধরে কাজ করে চলা কুচিনা ফাউন্ডেশান, এবার থেকে রুপান্তরকামীদেরও পাশে দাঁড়াবে। আজ আমাদের সহযোগিতায়, প্রিয়াঙ্কা, নিজের জেলায় খুব ভালো কাজ করছে। অন্যদিকে রুপান্তরকামী জিয়াকেও আমি যোগাযোগ করিয়ে দি, মেডিকা হাসপাতালের সাথে। আর আজ সে ভারতের প্রথম ট্রান্স ও.টি. টেকনিশিয়ান। আসলে নিজের লিঙ্গচেতনা অথবা যৌনপরিচয় যাই হোকনা কেন, এক সফল মানুষের সাফল্যটাই পারে সমস্ত বঞ্চনার জবাব হয়ে দাঁড়াতে।”

রূপান্তরকামীদের কথা প্রসঙ্গে রঞ্জিতা সিনহা জানান এলজিবিটি গোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভবত রূপান্তরকামীদেরই বঞ্চনার স্বীকার হতে হয় বেশী, কারণ তাদের নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই।

“ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের কাজ নিয়েও আমি হতাশ। ১৫ই এপ্রিল শ্রেয়া আর জো-এর উপর শ্লীলতাহানির ঘটনায় ট্রান্স বোর্ডের নীরবতা আমায় দুঃখিত করে। আসলে আমাদের জনসমীক্ষায় আরো বেশী করে নথিভুক্ত হতে হবে। ট্রান্সবোর্ড নারী এবং শিশুকল্যান দপ্তরের অধীনে কেন থাকবে? আমরা তো আলাদা। শিক্ষা/স্বাস্থ্য/অন্ন/বস্ত্র এই সামান্যতম প্রয়োজনটুকুও মেটেনা আমাদের। তাই রূপান্তরকামী মানুষদের মানবাধিকারের স্বার্থে আপনারা সবাই এগিয়ে আসুন”।

প্রান্তকথার পুরোধা বাপ্পাদিত্য মুখার্জি জানালেন অভিযোগ না করে, অন্যের জন্যে অপেক্ষা না করে, নিজেদেরই কিছু করে দেখানোর সময় এসেছে। “সতরঙ্গী” উদ্যোগের সাফল্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জানান

“আমাদের নিজেদের সমাধানসূত্র আমাদের নিজেদেরকেই খুঁজে নিতে হবে, কি করবো, কিভাবে করবো, এসব না ভেবে আমরা এগিয়ে যাই বরং। আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। সংবিধানের চোখে আর পাঁচজন নাগরিকের যে অধিকার, আমারও সেই সবকটা অধিকার আছে”।

দর্শকদের কাছে এবার প্রশ্নের জন্যে যাওয়া হলে সেখান থেকেও উঠে আসতে থাকে একের পরে আরেক ঘটনার গাঁথা। অপর্ণা ব্যানার্জি শ্রী নমিত বাজোরিয়ার উদ্দেশ্যে জানান, কিভাবে এলিট ট্রান্স মানুষদের সাথে নিয়ে চলার থেকেও, যাদের সুযোগ সুবিধে কম সেইসব ট্রান্সদের নিয়ে চলা আরো কঠিন।

“নিজের সাফল্যের পরিচয়ে সব বঞ্চনা মুছে দেওয়ার আগে তো চাই শিক্ষা, সেই শিক্ষাটাই তো অধিকাংশ ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের নেই। তাদের আপনি কিভাবে কাজে নিযুক্ত করবেন? তার চেয়ে আপনি কি কোনভাবে আমাদেরকে সুযোগ করে দিতে পারেন, যাতে আমরা বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সের সামনে আমাদের পিছিয়ে পড়া ভাইবোনেদের কথাগুলো তুলে ধরতে পারি? তাদের বোঝাতে পারি কিভাবে সি-এস-আর প্রকল্পগুলিতে আমাদের আরো সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়? আসুননা, আমরা পিছিয়ে পড়ার মধ্যেও আরো বেশী পিছিয়ে পড়া ট্রান্স মানুষদের নিয়ে কথা বলি।”

অন্যদিকে শিক্ষিকা সুচিত্রা জানান কিভাবে একজন সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার তাকে আলাদা করে নিজের চেম্বারে আসার কু-আমন্ত্রণ জানান।

“সব জায়গায় এখনও নাজেহাল হতে হয়। অন্য স্কুলে চাকরি খুঁজবো? ট্রান্সজেন্ডার শুনেই, প্রিন্সিপালরা ফোন নামিয়ে রাখেন। কেউ বলেন ছোট থেকে যতো সার্টিফিকেট, সবগুলিতে নাম পাল্টে আনুন। ইন্টারভিউতে তো একজন পুরুষ অধ্যক্ষ জিজ্ঞেসই করে বসলেন, আমার স্তন থেকে তরল দুধ বেড়ানো সম্ভব কি না, অথবা সঙ্গমের পরে আমি গর্ভধারণ করতে পারবো কি না, ছি!!”।

গল্পের সাথে উঠে এলো কিছু তথ্যও। তিস্তা দাস আর রঞ্জিতা সিনহার কথাসূত্রে জানা গেলো ট্রান্সবোর্ডের অপ্রাসঙ্গিক লিটারারি মিট নিয়ে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের কথা। অন্যদিকে এক দর্শকের প্রশ্নের উত্তরে হিউম্যান রাইটস ল’ নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি জানালেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের শিকার হলে তার জন্যে সুনির্দিষ্ট আইন আছে, কিন্তু লিঙ্গ-যৌণ-প্রান্তিক মানুষদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের জন্যে সেরকম কোন আইন ভারতের দন্ডবিধিতে নেই।

বাংলা থিয়েটারে কর্মরত সুজয় এবং অনুরাগ মৈত্রেয়ী জানালেন। কিভাবে মানবাধিকার এবং মুক্তমনা এই ক্ষেত্রটিতেও বঞ্চনার ঘটনা লুকিয়ে আছে। ট্রান্সজেন্ডার বলে সবরকম পাত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়না ট্রান্স অভিনেতা/অভিনেত্রীদের, কিভাবে অনেক কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অভিনেতা/অভিনেত্রীদের থেকেও তাদের কম টাকা দেওয়া হয়।

“কাজ দিয়েছি, তাতেই তুমি ধন্য হয়ে যাও, ভাবখানা এমনই। আমাদের সাথে কাজ করে নাকি অভিনেতারা সুখ পাননা। তা তারা অভিনয় করতে আসেন? না সুখ নিতে?”

এক হাতে পেয়ে যাওয়া নালসা রায়, অন্য হাতে ৩৭৭ ধারার সংবিধান-বিরোধী অণুচ্ছেদের সরে যাওয়ার স্বপ্ন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই গল্পগুলো জানান দিয়ে গেলো, সত্যিই পথ চলা অনেকটাই বাকি। আগে ছিলোনা পরিচয়ের কোন ভাষা। এখন আস্তে আস্তে নিজেদের পরিচয়ে বাঁচার তাগিদে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচুর মানুষ। রূপান্তরকামী হোক অথবা সমকামী। পড়াশোনা জানা উচ্চশিক্ষিত থেকে শুরু করে নাম না জানা সেইসব আধন্যাংটা পেট ভরে খেতে না পাওয়া হিজড়েরা। শহর হোক বা মফঃস্বল। নাটকে ১৫ বছর ধরে কাজ করা অভিনেত্রী অথবা সদ্য কলেজ পড়ুয়া, বঞ্চনার ভাষারা খালি আলাদা। বৈষম্যের সুরটুকুই অন্যরকম। পুরুষতন্ত্রের বিষবীজ, তা থেকে তৈরি হওয়া অমানবিক মহীরুহ। এই মহীরুহ আমাদেরই উপড়ে ফেলতে হবে। একসাথে। একজোট হয়ে। আমরা পথ চেয়ে রইলাম সায়ানের তৃতীয় পরিচ্ছেদের দিকে।

— o — o — o —