মুখোশ তুমি কার?

মুখোশ তুমি কার?

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন

১০ই ডিসেম্বর ২০১৭ কোলকাতায় অনুষ্ঠিত হলো ১৬তম রামধনু গৌরব যাত্রা। দিনের বদল, রাতের বদল, আর বদল রাষ্ট্রের শোষণের পদ্ধতিতে। বদল এসেছে পুরুষতন্ত্র আর নারীবাদের মধ্যেকার বাদ-বিসম্বাদ-সংঘাতে। তার সাথে তাল মিলিয়ে বদল এসেছে চলার ছন্দে, পোশাকের ধৃষ্টতায়, আর প্রতিবাদ প্রকাশের ভঙ্গিমায়। ব্রিটিশ যুগের ভারতীয় দণ্ডবিধি ৩৭৭, ২০০৯ সালের ১০রা জুলাই অনৈতিক বাতিলের দলে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সাথে সাথে, উৎসবে ফেটে পড়লো ভারতের লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের এতদিনের ক্ষোভ-জ্বালা-যন্ত্রণা, আনন্দের ঝলকানিতে, এক নতুন স্বাধীন জীবনের রূপ নিয়ে। ২০১২এর ২৭শে মার্চ, সেই নতুন স্ফুলিঙ্গরা নিভে গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া কলঙ্কিত রায়ে। ৩৭৭ ধারা ফিরে এলো ভারতের সংবিধানে, বহাল তবীয়তে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মাঝেসাঝে — ৩৭৭ ধারা খারাপ, ৩৭৭ এই, ৩৭৭ ঐ — ইত্যাদি ট্যাঁফোঁ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা হয়তো নগণ্য।

অন্যদিকে, তার দু’বছর বাদে ২০১৪ সালের ১৫ই এপ্রিল, সেই সর্বোচ্চ আদালতের নালসা রায় সম্মান দিলো তৃতীয় লিঙ্গস্বত্বার। আমি কি, তা ঠিক করবো আমি — আর রাষ্ট্র তাকে সম্মান দিতে বাধ্য থাকবে, রক্ষা করতে, লালন করতে প্রতিশ্রুত থাকবে সর্বোতভাবে। ২০১৭ সালের শীতকালীন অধিবেশনে কেন্দ্রের সরকার আবার নিয়ে আসতে চাইলো নতুন এক বিল। নালসার উপরে ভিত্তি থাকলেও এই বিল কেড়ে নিতে চাইলো স্ব-লিঙ্গ-নির্ধারণের অধিকার। দেশের লিঙ্গ-সংখ্যালঘু মানুষকে দাঁড় করাতে চাইলো এক উদ্ভট স্ক্রিনিং কমিটির সামনে। তাদের উপর আক্রমণ/শোষণের জন্যে দোষীদের উপর ধার্য করতে চাইলো লঘুদণ্ড। আর শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকুরীক্ষেত্রে সংরক্ষণের বালাই ছাড়াই কাঁচি চালানোর জন্যে উঠে এলো কিছু হাত, তাদের স্বাভাবিক জীবিকার ক্ষেত্রকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে। স্বাধীন ভারতের বয়স ৬০ পেরিয়েছে, ইতিহাসও অনেকটা রাস্তা পেরিয়েছে রামধনু ধুলো গায়ে মেখে। তার সবকিছু বলতে গেলে নিজেই গুলিয়ে যাবো। তাই, সে’সমস্ত থাক। বরং যে রাস্তা দিয়ে হাটলাম ১০ই ডিসেম্বর ২০১৭তে, সেই রাস্তাতেই হেঁটে আসি আবারো।

১৯৯৯ সালের ২রা জুলাই, কোলকাতা শহরের ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক, খাতায় কলমে শুধু ভারতবর্ষ না, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভবত প্রথম প্রাইড ওয়াক। তারই স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে পবনদা (পবন ঢাল) তুলে আনলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

“আমি জানিনা এর আগে এরকম গুরুত্বপূর্ণ কোন ইভেন্ট হয়েছিলো কি না, অন্তত আমাদের বা কোন সংবাদমাধ্যমের নজরে সেটা আসেনি। এই ইভেন্টে দেশের অন্যান্য জায়গার ভূমিকা/অংশগ্রহণ থাকলেও, সেই সময় কোলকাতাতেই এটা করা গেছিলো বোধহয় বাংলার এই মাটিতে প্রোথিত সামাজিক আর রাজনৈতিক ঔদার্যের জন্যেই। তখন ব্যাঙ্গালোরে অতোটাও কমিউনিটি মোবিলাইজেশন নেই, মুম্বইতে দক্ষিণপন্থি উগ্র পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির রমরমা। দিল্লীতে সেভাবে কোন সংগঠন দানা বাঁধেনি, যারা এরকম একটা প্রাইড ওয়াকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। চেন্নাই/হায়দ্রাবাদে প্রায় কিছুই ছিলোনা। উল্টোদিকে আমরা কোলকাতার লোকেরা কিন্তু লড়াইয়ের জন্যে বেশ কিছু সংগঠন তৈরি করে ফেলেছিলাম ততোদিনে। এবং তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাতেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই মাটি ভারতের অন্যান্য সব জায়গা থেকে অনেক বেশী করে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, আপন করার ক্ষমতা রাখে, এখনও অবধি এটাই আমার নিজস্ব মতামত।”

… তবু প্রাইড ওয়াকের এই ধরণ পাল্টেছে অনেকটা …

“সংখ্যায় এখন অনেক মানুষ আসেন। আগে ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা বেশী আসতেন। এখন গে লেসবিয়ানরা বেশী আসছেন। আর তাছাড়া অনেক বন্ধু-সংগঠনও এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পাশে। এবারে আমরা বধিরদের জন্যে সাইন ল্যাংগুয়েজের ব্যাবস্থা করতে পেরেছি, হুইলচেয়ার নিয়ে যাতে মানুষ স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারেন তার ব্যবস্থা করেছি, দৃষ্টিহীনদের স্বাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছি। — হ্যাঁ, সবাইকে নিয়ে চলা জানিনা কবে হবে, কিন্তু, চেষ্টা থামালে কি চলে?”

মানুষের ইতিহাসে উদ্যমতা আর স্বাধীনতা এক অজেয় অধ্যায়। তাকে চাপা দেওয়া যায়না কোনভাবে। পবনদা জানালেন কীভাবে ২০০৫ সালে হাইকোর্টের এক জাজ বলেছিলেন

“আমি যৌনতার বিরুদ্ধে নয়, সমকামিতার বিরুদ্ধেও নয়, আজ যখন কোলকাতার রাস্তায় প্রাইড ওয়াক হচ্ছে সেটাই কিন্তু একটা বড়ো ব্যাপার।”

… কখনো পাড়ার মুদীর দোকানীর সাধুবাদ, টিভিতে প্রাইড দেখে তার ভালো লেগেছে, তার সাথে সেই মিছিলের বক্তব্যগুলোও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে সেই মানুষটির, কখনো আবার “অতি-উচ্চশিক্ষিত” পরিচিত মানুষের কথা বন্ধ করে দেওয়া, এই দুই নিয়ে পবনদা কিন্তু উৎসাহী সমাজে প্রাইড ওয়াকের ইতিবাচক প্রভাব নিয়েই।

“এতোগুলো মানুষ এরকম অদ্ভুতভাবে সেজে নিজের বাড়ি থেকে আজ রাস্তায় বেড়িয়ে ঠিক কি বলার চেষ্টা করছে — এই প্রশ্নের মুখে তো আজ আমরা শহরের লোকেদের দাঁড় করাতে পেরেছি, তাই বা কম কিসের?”

তাই হাঁটা বন্ধ করার প্রশ্ন নেই, এবং হেঁটে চলেছি সেই একই রাস্তায়,কদিন আগেই যেখান দিয়ে হেঁটে এলাম সেখান দিয়েই, মিলিয়ে নিচ্ছি, উলের মতো বুনে নিচ্ছি, কিছু স্মৃতিপট। আগের বছর, মনে আছে, প্রাইডে চলার সময়, রাস্তার দু’ধারের বাচ্চাদের বেলুন বিলি করেছিলাম। সংগঠকদের বিলি করা লিফলেট, যাতে আমাদের নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার দাবী, আর সঙ্গে কিছু বেলুনরঙ্গা একসাথে চলার আহ্বান। আমাদের স্লোগান, আমাদের উল্লাস, আমাদের অহংকার, এই একটা দিনে মুছে দিয়ে যায় “আমরা/ওরা”-এর ব্যবধান। আজ সমাজ পাল্টাচ্ছে, আমার বন্ধুরা শুধু আলাদা বলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়না আমায়। আমার চেয়ে ছোট যারা, তারা তো কলেজে স্কুলে নিজেদের পরিচয়/অধিকার নিয়েই সোচ্চারভাবে টিকে আছে। প্রশ্ন, উত্তর, কথা, আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব, আলোচনা — আর অবশ্যই তর্কও — সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে আমরা মিশে যাচ্ছি বাকিদের সাথে — মিশছি, কিন্তু আমাদের নিজের “আমি”টাকে নিয়েই।

“এটা অবশ্যই একটা স্বাধীনতার জায়গা” —

২০১১ সালে তৈরি হওয়া কে-আর-পি-এফ সদস্য সৌভিকের কাছে এটাই ছিলো কোলকাতা প্রাইড ওয়াকের মানে। কথায় কথায় ফুটে উঠলো তার কাছে প্রাইড ওয়াকের এক বৃহত্তর সংজ্ঞা।

“আসলে সবকিছুই তো একসাথে যুক্ত — সমকামবিদ্বেষ, রুপান্তরকামবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ, বর্ণপ্রথা, দলিত-অবদমন। আজ এই হাঁটার ছন্দে শুধু যৌনতার অধিকার আর লিঙ্গস্বাধীনতাই থাকেনা, কিছু মানুষ হয়তো কাশ্মীর মাংগে আজাদি স্লোগান তোলেন, অন্যদিকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা বলার জন্যেও কি কেউ থাকেনা? নিশ্চয়ই থাকে। দলিতদের নিয়ে কথা হয়। নারী স্বাধীনতা নিয়ে শ্লোগান ওঠে।”

কোলকাতা রেইনবো প্রাইড “কে-আর-পি-এফ” -এর হাত ধরে পথচলা শুরু করে ২০১১ সালে। সেইবছর ৫০০জন মানুষ হেঁটেছিলেন নিজেদের অধিকার রক্ষায়। ২০১২তে ১০০০, ২০১৩তে ১৫০০।

“আগের বছর পুলিশ/প্রশাসনের কাছ থেকে জেনেছিলাম যে প্রায় ২৫০০ লোক প্রাইডে হেঁটেছিলেন, এবার ভেবেছিলাম হয়তো ৩০০০ জন আসবেন, কিন্তু সংখ্যাটা দাঁড়ায় গিয়ে ৫০০০এ!!”

এই জনসমুদ্র হওয়ার কারন? পবনদা বলছে…

“ট্রান্সজেন্ডার বিলের প্রতিবাদ এবারের প্রাইডওয়াকের সাথে মিশে যাওয়ার জন্যে অনেক ট্রান্স মানুষেরাই এবারে অংশগ্রহণ করেছেন।”

আর সৌভিকের কথায়…

“তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি। সেই শকতি-ই আজ বাড়ছে। কেউ আছেন নিজের স্বত্বা প্রদর্শনে ব্যস্ত, কেউ হয়তো রামধনু পতাকাটাকে ছুঁয়ে দেখতে চায় একবার, কেউ শ্লোগানে ব্যস্ত — আসলে এই একটা দিনে তুমি জানো যে কেউ তোমাকে টিটকিরি দেওয়ার সুযোগ পাবেনা। কারন ওখানে তোমার মতো আরও হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে। এই উৎসবটাই আমাদের প্রতিবাদ প্রকাশের সেরা মাধ্যম।”

কোলকাতা রেইনবো প্রাইড ওয়াক, যাকে ছোট ভাষায় “কে-আর-পি-ডব্ল্যু” নামেই আমরা অনেকে চিনি, তার নিয়ম কিছু? সৌভিক বললো…

“নিয়ম একটাই, কোন তকমা নিয়ে এসোনা। ওখানে আমরা সবাই এক। নইলে আমাদের সাথে অ্যাক্সেঞ্চারের মতো সংস্থাও হেঁটেছে, হেঁটেছে রাজনৈতিক গোষ্ঠীরাও।”

পবনদা বললো…

“প্রত্যেকবারেই মানুষেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। ভলেন্টিয়াররা তাল রাখতে হিমশিম খান। কিন্তু তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র থেকেই যায়, কোন এক অদৃশ্য সুতোয় যেন সবাই বাঁধা। ট্রাফিক থেকে বেঁচে হাঁটো, এ’টুকুই, নইলে এটা তো আর মিলিটারি মার্চ নয়, নিয়মের সেরকম কোন বালাই নেই।”

নাহ! সত্যিই একটা ছন্দ থাকে। ৫০০০ জোড়া পা, তাদের অনুরণন থাকতেও বাধ্য। তারই আবেশে যেন মানুষের মাঝে মিশে যাচ্ছে এই স্রোত। রাষ্ট্র, ধর্মীয় গোঁড়ামো, পুরুষতন্ত্র নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে এই জনস্রোতের বিরুদ্ধে। ট্রান্স বিলের নাম করে, তাদের ভালো করার হুজুক তুলে সর্বনাশ ডেকে আনছে তাদের জীবনে। ৩৭৭ নিয়ে মাঝে মাঝে কথা বললেও কেউই কিস্যু করছেনা। বরং একের পরে আরেক পরোক্ষ নিয়ম চালু করে লিঙ্গ-যৌন-প্রান্তিক মানুষদের অবদমনের নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে তারা। সন্তান দত্তক নেওয়ার পথে তৈরি করছে বাধা, রাষ্ট্রসংঘে ভোট দিচ্ছে সমকামীতার জন্যে মৃত্যুদন্ডের সপক্ষে। নারীকে পণ্য করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে নারীদিবসের এক নতুন মানে।

সৌভিকের কথায় খানিক প্রতিবেশী আরেক বঙ্গভূমির যন্ত্রণাও উঠে এলো।

“আমার শোভাযাত্রার অংশ হিসেবে যদি একদল মানুষ অংশগ্রহণ করে, তাহলে তারা তো আমার শোভাযাত্রাকেই বলীয়ান করছে। এসব নিয়ে আমায় বলতেই বোলোনা কিছু, কান্না চলে আসে আমার। তাদের লিঙ্গ-যৌন-পরিচয় ভিন্ন — শুধু এই কারণে তাদেরকে বাতিল করে দেবো এই অধিকার আমায় কে দিয়েছে? মাঝে মাঝে মনে হয় এই সভ্যতার দরকারই নেই। অভিজিৎ রায়, জুলহাস মান্নান, গৌরী লঙ্কেশ, আফ্রাজুল, তনয় –এই সব হত্যাই তো আমার কাছে একইরকম লাগে। যদি এই সভ্যতা একজন মানুষকে জীবন্ত জ্বালিয়ে মেরে ফেলতে পারে রাজস্থানে, তাহলে এই সভ্যতাটাই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাক।”

তবু জীবন চলে নিজের মতো করে। সুপ্রিমকোর্টের পরিসংখ্যানে ভারতের মাটিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের দায়ভার দেশের আইন স্বীকার করেনি, যাদের জন্যে রাষ্ট্র ভাবেনি, ধর্মের বর্তমান হোতারা যাদের নিয়ে মাথা ঘামায়না, পুঁজিবাদ শুধু নিজেদের কাজে ব্যবহার করে ছেড়ে দেয়, তারা নিজেদের গান খুঁজে নিয়েছে নিজেদের ভাষায়। নিজেদের প্রতিবাদ কুড়িয়ে পেয়েছে রাশভাঙ্গা উৎসবে।

হাঁটতে হাঁটতে প্রায় শেষ, দেখা হলো প্রতুলানন্দদার সাথে। দেখে একটাই প্রশ্ন করলো আমায়।

“ক’জন কে দেখলি রে মুখোশ পড়েছে আজ?”

উত্তর তৈরিই ছিলো, আমিও লক্ষ্য করেছিলাম। পাঁচ হাজার জন মানুষের ভিড়ে

“খুব বেশী না গো প্রতুলদা, ৩ থেকে ৪ জন”।

… মনে মনে বললাম, আমাদের মুখোশ পড়ার দিন শেষ হচ্ছে প্রতুলদা, আমরা আর লুকোবোনা, লুকাবে এবার রাষ্ট্র, ধর্ম, লুকাবে পুরুষতন্ত্র নিজের ধুতির আঁচলের পিছনে। দেখা যাক তাদের নতুন মুখোশ পরা ফন্দিগুলোর জবাব আমাদের প্রকাশ্য প্রতিবাদে আমরা ধুয়ে মুছে ফেলতে পারি কি না। পারবো তো? পারতে যে হবেই।

কৃতজ্ঞতাঃ পবন ঢাল এবং সৌভিক

ছবিঃ কৌশিক গুপ্ত এবং লীনা মহাল

প্রুফ রিডিংঃ অভিষেক মুখার্জী


সেবারের পহেলাবৈশাখ! (কালবৈশাখী ২য় বর্ষ – পর্ব ১)

সেবারের পহেলাবৈশাখ!

সামীউল হাসান সামী

১৪২৩ বঙ্গাব্দ পহেলাবৈশাখের দিনে আমরাও এসেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এরিয়া মধুর ক্যান্টিনের সামনে। এসে দেখি আরও অনেকেই এসেছে আমাদের মতো মঙ্গল শুভাযাত্রায় অংশ নিতে। গত কয়েক বছর যাবত দেশের একমাত্র ভিন্ন যৌনতার মানুষদের অধিকার নিয়ে কথা বলা রূপবাণ, বন্ধুত্ব ও বৈচিত্রার মাধ্যমে একটি শুভাযাত্রা আয়োজন করে আছে। বিভিন্ন রঙে সেজে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নরনারী সতস্ফুর্ত ভাবে এই আয়োজনে শামিল হতে আসতো। জুলহাজ ভাইয়ের আমন্ত্রণে আমিও আসি নিয়মিত। তবে ২০১৬ ঈসায়ী বা ১৪২৩ বঙ্গাব্দের পহেলাবৈশাখটা ছিলো আমাদের জন্য একটু অন্যরকম। প্রথমে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা এলো সুকৌশলে আমাদের সরিয়ে দিতে। জঙ্গি আতঙ্কে মুখোশ নিষিদ্ধ করা হলো আমরা মুখোশ ছাড়াই অংশগ্রহণ করবার সিদ্ধান্ত পেলাম। কিন্তু রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের পর কট্টরপন্থী ধর্মবিশ্বাসীরা আমাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আমাদের শুভাযাত্রার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রচার শুরু করেছিলো। তাদের প্রচার এমন ছিলো যে, শেষ পযর্ন্ত তারা আমাদের হামলার হুমকি ও সাধারণ জনগণকে আমাদের উপর হামলার আহবান করতে থাকে আমাদের ছবি দিয়ে দিয়ে। এটা ছিলো পহেলাবৈশাখের আগের কথা।

এতো কিছু উপেক্ষা করেই আমরা একত্রিত হয়েছিলাম সেবার পহেলাবৈশাখে। আমি একটু দেরি করে এলেও সবাইকে দেখতে পাচ্ছিলাম, এবং আমি আরও সাহস পাচ্ছিলাম। আমাদের সকলের প্রস্তুতি শেষে হঠাৎ জুলহাজ ভাই এসে আমাকে জানালো, আমরা এবার শুভাযাত্রা করতে পারছিনা। শেষ পযর্ন্ত আমাদের অনুমতি মেলেনি। পহেলাবৈশাখ উৎযাপন কমিটির আপত্তি না থাকলেও আপত্তি ছিলো প্রশাসনের। তবুও আমরা পিছপা হইনি। আলাদা শুভাযাত্রা না করে আমরা মঙ্গল শুভাযাত্রায় ঢুকে পরেছিলাম। পরামর্শটা জুলহাজ ভাই দিয়েছিলো। সেদিন তনয় ভাইকে একটু চুপচাপই মনে হচ্ছিল। আমরা আমাদের তৈরি বিভিন্ন রঙবেরঙের ঝাজরা গুলো রেখে মঙ্গল শুভাযাত্রায় ঢুকে পরি যাতে উগ্রপন্হীরা আমাদের আলাদা করতে না পারে। মঙ্গল শুভাযাত্রা শেষ হলো, জুলহাজ ভাই দ্রুত প্রস্থান করতে বললো সে এলাকা থেকে। দ্রুত চলেও এলাম। বাসায় এসে শুনলাম বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলকে সমকামীদের অধিকার বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে উগ্রপন্হীদের সহায়তায় পুলিশ আমাদের ৪ জন সহযোদ্ধাদের আটক করেছে।
সঙ্গে সঙ্গে জুলহাজ ভাইকে ফোন দিলে সে আমাকে বলল, চিন্তার কিছু নেই, তাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। চাকরির সুবাদে আমি ঢাকার বাইরে চলে গিয়েছিলাম। তাই জুলহাজ ভাইয়ের সঙ্গে ওটাই শেষ কথা ছিলো। ফেসবুকে টুকটাক কথা হলেও আর কথা হয়নি ফোনে।

২৫ এপ্রিল ২০১৬ ঈসায়ী, রাত ৯ টার দিকে ঢাকার এক বন্ধুর ফোন কলে জানতে পারলাম উগ্রপন্হী জঙ্গিদের হামলায় নিজ বাসায় জুলহাজ- তনয় ভাই নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। সেই রাতেই ছুটে এসেছিল ধানমন্ডির সেই চেনা লেকসার্কাসের বাসায়। প্রতিবারের মতো সেবার শান্ত বাসা মনে হয়নি। জুলহাজ ভাইয়ের প্রিয় সেই বিড়ালটির মিউ মিউ ডাকও শুনতে পাইনি। অনেক গুলো অচেনা আতঙ্কিত মুখ দেখেছিলাম। আমি ফিরে এলাম। সেদিন আর কথা হয়নি জুলহাজ তনয় ভাইদের সঙ্গে। আর কখনো কথা হবেনা সেই বিশ্বাস নিয়েই সেদিন আমাকে ফিরতে হয়েছিলো।
সেই বেদনাদায়ক দিনগুলো ছিলো আতঙ্কেরও, বিভিন্ন হুমকি, ধামকি। তবুও কথা বলে গিয়েছি যতোটা সম্ভব। ভয় ছিলো এই বুঝি চাপাতির এক কোপে আলাদা হয়ে যাবে মাথা। অফিসের গেইটে, বাসার গেইটে দারোয়ান সাহেবদের বলে রাখতে হয়েছে, অপরিচিত কেউ দেখা করতে এলে বলবেন আমি বাসায় নিই।

আজও পহেলাবৈশাখ আসে, তবে আমি আসিনা ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের চারুকলায়, আসিনা মঙ্গল শুভাযাত্রায়। কারণ এখন আর ফোন করে জুলহাজ ভাই জিজ্ঞেস করেনা কি রঙের পাঞ্জাবি / শার্ট পরবো।

ভালো থেকো জুলহাজ ভাই, ভালো থেকো তনয় ভাই। পহেলাবৈশাখ নিয়ে আসুক প্রতিটি মানুষের অনাবিল সুখ শান্তি ও ভালোবাসার অধিকার।

জয় হোক বন্ধুত্ব ও বৈচিত্রতার।

[ছবিস্বত্বঃ রূপবান]


 


চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

— সামীউল হাসান সামী

 

এক ইট ভঙ্গুর ক্ষণস্থায়ী
অসংখ্য ইটে দালান দীর্ঘস্থায়ী
একহাত এক লোক খুবই দুর্বল
অসংখ্য হাত অসংখ্য লোক, শক্তিতে মহাবল।
এক লাঠি মচকানো সহজেই হয়,
এক সাথে দশ লাটি ভাঙ্গা সহজতো নয়।
তাই একতাই শক্তি একতাই বল,
অনৈক্যে দুর্বল, নয় কর্মে সফল।

ছোটবেলায় আমরা সকলেই পড়েছি একতাই বল। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থা, পরিবার ও সমাজে এমন কোন প্রকার কার্যক্রম থাকেনা যার দ্বারা একজন শিশু, ছোটবেলা থেকেই হারে হারে বুঝতে পারবে যে আসলেই একতাই বল। বরং বর্তমান সমাজে আমরা শিশুদের এমন প্রতিযোগীতার মাধ্যমে বড় করাই যে, ওরা মনে করে প্রতিযোগীতাই বল। আর তাই, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম নিজ বন্ধুদের সাথেও করে প্রতিযোগীতা, সহজে করেনা সহোযোগীতা।

পিপড়া, মৌমাছি এমনিভাবে প্রানী জগতে একতার নমুনা আমরা দেখতে পাই। একক প্রচেষ্টায় যা অর্জনে বহু কন্টকময় পথ অতিক্রান্ত করতে হয়, একতায় তা অনেকাংশেই সহজ হয়। সবচেয়ে বড়কথা হলো, ঐক্যবদ্ধ চেষ্টার ফলগুলোই সফলতায় রূপ নেয়।

বাংলাদেশের বা আশেপাশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুলোতে সংখ্যালঘু জনগণ নির্যাতিন নিপিড়নের শিকার। যুগে যুগে এটিই হয়ে এসেছে। সাম্রাজ্যবাদের রোগে আক্রান্ত এই সমাজ ব্যাবস্থাপনাপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের তাবেদার হয়ে বেচেঁ থাকতে হয়েছে সংখ্যালঘুদের যুগে যুগে। এই নির্জাতনের শিকলভাঙার গান গাইতে হবে সমস্বরে, বজ্রকন্ঠে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান রাষ্ট্রের যৌন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার শূন্যের কোঠায়। এরা আত্মপরিচয়ে এখনো মানবাধিকার নিয়ে বাচতে পারেনা আপন আপন সমাজে, রাষ্ট্রে ও ধর্মে। যারাই নিজের মতো বাঁচতে চায় সসম্মানে, তাদেরকেই বিতাড়িত হতে হয় পরিবার, পরিজন, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র ও সর্বশেষ পৃথিবী থেকে। উগ্রপন্হীদের গুপ্তহত্যা যেন সহজ হয়ে দাড়িয়েছে এই সম্প্রদায়ের জন্য। এ বিষয়ে রাষ্ট্র নির্বিকার।

এমনিই একটি সময়ে এই সম্প্রদায়ের কতটা ঐক্য দরকার, কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে তা এরা এখনো অনুধাবন করতে পারছেনা। অনৈক্যের কারনে পৃথিবীর অনেক বড় বড় জাতীকে বিলিন হয়ে যেতে হয়েছে। তাই এই সম্প্রদায়কে এখনো ভাবতে হবে, এরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হবে।

ঐক্যের চর্চা না থাকায় এবং প্রতিযোগিতার চর্চা চালু থাকায় এই সম্প্রদায়ের মাধ্যে একধরনের নোংরা প্রতিযোগিতা প্রচলিত আছে যা এরা পরস্পরের প্রতি হিংসাত্মকভাবে হয়ে প্রয়োগ করে থাকে। যা এদেরকেই ক্রমেই দুর্বল করছে।

মাঝেমধ্যেই আমি খেয়াল করে থাকি যে, এরা অপরের প্রতি এতোটাই সমালোচনায় লিপ্ত হয় যে যা ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য। এরা কখনোই বুঝতে চায়না যে এগুলো মূলত নিজের হিংস্র রুপের বহিঃপ্রকাশ।

“কাউকে নেটে নিচে নামানোর মধ্যে গর্বিত হবার কিছু নেই, বরং তা লজ্বার নিজের এমন হিংসাত্মক আচরণের জন্য।

এই কঠিন বাস্তবতার সময়ে এই সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের অধিকার, নিজেদের মানবাধিকার, মানুষের মতো মানুষ হয়ে মাথা তুলে দাড়াবার অধিকার আদায়ে। হাতে হাত রেখে, কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে স্বাধীনতার গান গাইবার সময় এখন।

আমাদের ততদিন পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে, যতদিন পর্যন্ত সমতার নতুন সূর্য উদয় না হবে। আমাদের ততদিন পর্যন্ত লড়তে হবে যতদিন পর্যন্ত, মানুষে মানুষে বৈশম্যে থাকবে।
আমরা একটা পৃথিবী চাই যেখানে সবাই নিরাপদ, সবাই মানুষ।

[ছবিঃভুটান]


দুটো শব্দ “ছাত্রীদের সমকামিতা”,ব্যাস, বেড়িয়ে এলো সমাজের সর্বস্তরের জুজুর ভয়

দুটো শব্দ “ছাত্রীদের সমকামিতা”,ব্যাস, বেড়িয়ে এলো সমাজের সর্বস্তরের জুজুর ভয়

অনিরুদ্ধ (অনির) সেন

(কোলকাতা) ঘটনা ১ঃ

মনে আছে তখন কলেজে। অফ পিরিয়ড কি টিফিন, মনে নেই। ক্লাস প্রায় খালি। আমরা কয়েকজন ডেস্ক বাজিয়ে গান করছিম আর আমাদের ক্লাসের অন্যতম জুটির একজন আরেকজনের কাঁধে মাথা রেখে, আংগুলের ফাঁকে আংগুল গুঁজে ফিসফিসিয়ে প্রেমালাপে মগ্ন। একটি অবাঙ্গালী ছেলে, একটি বাঙ্গালী মেয়ে। তাতেই সেদিন আমার বেশ কিছু বন্ধুর আড়চোখ আর চাপাঠোঁটে ধিক্কার দেখেছিলাম।

(কোলকাতা) ঘটনা ২ঃ

স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ করছিলো মেয়েলি ছেলেটি, সামনের সারীতে বসে ছিলেন শিক্ষিকা, যিনি নিজের সমকামী সত্বা নিয়ে যথেষ্ট সোচ্চার। নাচের শেষে হাতজোড় করে লুটিয়ে পড়লো দর্শকদের সামনে নাচেরই অংশ হিসেবে। কিন্তু পড়বি তো পড় একেবারে সেই শিক্ষিকার সামনেই, এবং না জেনেই। শিক্ষক মহল থেকে মন্তব্য উড়ে এলো “মওগায় মওগা চিনেছে”।

এবং গতকালঃ

কমলা গার্লস, কোলকাতার নামী স্কুলগুলির মধ্যে অন্যতম। ক’দিন আগে যৌন-নিগ্রহের ঘটনায় তোলপাড়, আর গতকাল আরেক ঘটনায় হঠাৎ নতুন করে নজর কাড়লো তারা। অভিযোগ ১০জন ছাত্রীর নামে সমকামীতার। ব্যাপারটা সম্পর্কে সত্যি এর থেকে বেশী কিছু বলা মুশকিল। কামের প্রকাশ বিচিত্র। অনেক মনস্তত্ববিদেরা মনে করেন, ভালো পোশাক পড়া থেকে, গান গাওয়া, সবেতেই কোথাও পছন্দের যৌনসঙ্গীকে লালায়িত করার ফল্গু ইচ্ছে বয়ে চলে। তাই “আমি স্কুলে সমকামিতা করেছি” এর মানে যে ঠিক কি দাঁড়ায় তা বলা বেশ মুশকিল। তবে ঘটনাটা যে “আমি স্কুলে চুরি করেছি”, অথবা “আমি স্কুলে ফেল করেছি” এর থেকেও সাংঘাতিক গুরুতর এক বস্তু, অন্তত সমাজের কাছে, তা অন্তত বেশ স্পষ্টই বোঝা গেলো। নাহ শুধু সমাজ কেন? সংবাদমাধ্যমই বা বাদ যায় কিসে? কোলকাতা২৪x৭ এই বিশয়ে যে খবরটি অনলাইনে প্রকাশ করেছে তার ইউ-আর-এল -টি বেশ চমৎকার। “ভয়াবহ ঘটনা”। বিশ্বাস হলোনা? এই যেঃ

https://kolkata24x7.com/ভয়াবহ-ঘটনা-কলকাতায়-নামী-স.html

জঙ্গিহানার চেয়েও ভয়াবহ হয়তো, ছবিতে দুই নারীর রগরগে (কি তাই তো মামা?) চুমু খাওয়ার দৃশ্য।

খবরটা এক বন্ধু কাল ওয়্যাটসাপে পাঠাতেই চমকে উঠি। ছাত্রীদের যৌনতাসংক্রান্ত স্বীকারোক্তি দিতে হয়েছে লিখিতভাবে, সেই স্বীকারোক্তি নিয়ে ধুন্ধুমার, অভিভাবকদের জোড় গলায় কাম এবং বন্ধুত্বের মধ্যেকার ব্যবধান চিহ্নিত করা, আর সব শেষে সংবাদমাধ্যমের ঝাঁপিয়ে পড়া এই “ভয়াবহ” “নোংরামো” -এর হালহকিকত জানার এবং জানানোর জন্য।

সমকামীতার অভিযোগের কি অর্থ? আমি সমকামী তাই কি অভিযোগের ভিত্তি? সেটুকু নিশ্চয়ই হতে পারেনা। আমার মেয়ে সমকামী হলে আমারই বা এতো রাগ কিসের? যৌনতা যেখানে চরিত্রের এক প্রধান অঙ্গ, সেখানে স্কুলের গন্ডির মধ্যে একজন সমকামী ছাত্রী ঠিক কি কি ভাবে নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা রাখে, আর কি কি পারেনা, তাও কিন্তু বেশ তর্কের দাবী রাখে। একজন ছেলে আর একজন মেয়ের মধ্যে স্কুললাইফের প্রেম তো বাঙালীর রোম্যান্টিকতা আর রোম্যান্ঠিকতার পরাকাষ্ঠা, তখনো কি এভাবেই চোখ গোল্লা গোল্লা করে তাকাতাম আমরা? স্কুল লিখিয়ে নিতো? বাবা-মায়েরা ছেলে এবং মেয়েটির হাতে হাত ধরাকে “বন্ধুত্ব বন্ধুত্ব” চিল্লিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাতো?

ঠিক কি ঘটেছে জানা নেই। ১০জন ষোড়শবর্ষীয়া শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহও নেই, নেই এই ঘটনাকে মই বানিয়ে হাততালি জোগাড়ের ইচ্ছে। তবুও লিখছি। কারণ ঘোর আপত্তি। আপত্তি “সমকামীতা” শব্দটিকে মুছে দেওয়ার চেষ্টায়। স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে কিছু নিয়ম থাকবে অবশ্যই। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়ও, তাহলে এটি স্বাভাবিকভাবে অশালীন আচরণের অভিযোগ হিসেবেই চিহ্নিত হওয়ার কথা। কৈ? তা তো হলোনা? নাকি ছাত্রীদের একটু অন্যরকম আচরণ অভিযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো দ্বিগুণ!! “বালক বিদ্যালয়” বা “বয়েজ স্কুল” -এ এরকম ঘটনা ঘটলেও কি একই গাম্ভীর্যে আহত হতো এই সমাজ আর মিডিয়া?

বিসনেস স্ট্যান্ডার্ড নামক একটি ওয়েবসাইটে কর্তব্যরতা প্রধান শিক্ষিকার বয়ান খানিক এভাবে উল্লিখিত হয়েছে….. (লক্ষ্য করার বিশয়, প্রধান শিক্ষিকা এখানে ছাত্রীদেরকে সঠিক পথে চালিত করার প্রসংগ উল্লেখ করেছেন, যা অত্যন্ত আপত্তিকর একটি মন্তব্য।)

“কিছু ছাত্রী এই ১০জন ছাত্রীর বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছিলো আমাদের যে তারা নাকি এরকম করে। তখন আমরা এই ১০জনকে ডেকে পাঠাই আর তারা সেই কথা স্বীকারও করে। বিশয়টি সংবেদনশীল, তাই আমরা তাদের কাছ থেকে এ’মর্মে লিখিত স্বীকারোক্তি নিই। এরা সবাই সেই লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বিশয়টি তাদের অভিবাবকদের জানানোর জন্যে আজ আমরা তাদের ডেকে পাঠাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো, যাতে বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ে যুগপৎ চেষ্টার মাধ্যমে আমরা ছাত্রীদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারি।” (সূত্রঃ http://wap.business-standard.com/article/news-ians/pandemonium-in-kolkata-school-over-allegation-of-lesbianism-against-students-118031201386_1.html)

সঠিক পথ মানে? কোনটি সঠিক কোনটি বেঠিক সেটা আপনি ঠিক করে দেবেন? আপনি? যিনি কয়েকদিন আগে স্কুলের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে ছাত্রীর যৌন-নিগ্রহের অভিযোগ ওঠা সত্বেও চুপ করে ছিলেন।

কি ঠিক করবেন? কিভাবে?

আর অভিভাবকেরা? হাতে হাত কাঁধে কাঁধ শুধু বন্ধুরাই রাখেনা কিন্তু। হতেই পারে আপনার মেয়ে সমকামী নয়। কিন্তু বন্ধুত্ব/প্রেম/কাম এই সমস্তের মধ্যে চুলচেড়া পার্থক্য করতে হঠাৎ আপনারা উঠেপড়ে লাগলেন যে? সমকামীরা কোথায় কি কি রাখে সে বিশয়ে আপনাদের এতো সম্যক জ্ঞান আসে কোত্থেকে? সমকামী শব্দটা ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচেন? ঘা ঠিক কোথায় লেগেছে? মেয়ে পরিক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছে এরকম অভিযোগে এতোটাই আক্রোশ জন্মাতো আপনার ভিতরে?

নাহ! কিছুতেই মানতে পারছিনা। সমাজের সব মানুষেরা মিলে যেন মুছতে চাইছে এই পাঁচটা অক্ষর। স-ম-কা-মি-তা। কখনো চোখ রাঙিয়ে, কখনো গলা ফাটিয়ে, কখনো ভয়াবহ শিরোনামে খবর ছাপিয়ে। আর হয়তো সারাদিন ঝামেলার শেষে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে প্রশ্নবাণে নাজেহাল করে।

“বাঁচাও সমকামীতা এসেছে”… ভাবখানা এমনই।

হঠাৎ সবাই মিলে আকাশ থেকে পড়লেন যে? কেন? হোমোদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে অসুবিধে? বয়ঃসন্ধিতে অনেকেই নিজের যৌনতা আবিষ্কার করে সেটা মেনে নিতে অসুবিধে? যৌন-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে, ছাত্রীদের স্বাভাবিক মানসিক/শারীরিক ইচ্ছেগুলোকে অস্বীকার করে, তাদের শুধু লেখাপড়া করার মেশিন ভাবার আপনার স্বাচ্ছন্দ্য ভেঙে পড়ছে, তাতে? নাকি সবগুলোই?

কমলা গার্লসে “সমকামীতার অভিযোগ” -এর সত্যাসত্য আমি জানিনা। কিন্তু শুনুন মশাই, আপনি যদি মনে করে থাকেন, কোলকাতার স্কুলে আজ অবধি দুজন ছাত্র অথবা দুজন ছাত্রীর মধ্যে কখনো বন্ধুত্বের বেশী কিছু শারীরিক/মানসিক ভাবে ঘটেনি, আর ঘটবেনা, দেন আই এম সরি টু সে হানি, আপনার ঠুলি পড়া মগজ না জানলেও পৃথিবীতে অনেক কিছুই হয়।

সমর্থন করা না করা অবশ্যই তর্কের উর্ধে নয়, আপনার ব্যক্তিগত মতামত রাখতেই পারেন, কিন্তু ভবিষ্যতের অনেক গলাফাটানো সমকামী পুরুষ এবং সমকামী নারীরা, তাদের মনের কারখানায়, নিজেদের যৌনতাকে স্কুল লাইফে খুঁজে পেয়েছে, এবং অনেক সময় তাকে আটকে রাখেনি শুধুমাত্র নিজের একার মন/শরীরের মধ্যে , এটা একেবারে নাকে ঝাঁঝ আনা সর্ষের তেলের মতো সত্যি, আর মাইরি বলছি, বিশ্বাস করুন, এই সর্ষের মধ্যে কোন ভুত নেই। যদি থেকে থাকে সেটা আপনার মগজে।


স্বাধীন বাংলায় পরাধীন সমকামীরা

[শুরুর আগেঃ

লেখক ফেসবুকে বাংলাদেশের এলজিবিটি+ মানুষদের নিয়ে লেখালেখি করেন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে। নতুন কিছু উদ্যোগ অনেকেরই নজর কেড়েছে ইতিমধ্যে। সুরক্ষার খাতিরে পেজের নাম বলবো কি বলবো না, এই ভেবে নাম আর বলছিইনা আপাতত। তবে জুলহাজ হত্যার পরে পরে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলজিবিটি মানুষ যখন আন্ডারগ্রাউন্ড, তখনো দেশে থেকে সামিউল কিন্তু চালিয়ে গেছে তার অকুতোভয় সংগ্রাম, তার কলমের মাধ্যমে। কাঁচালঙ্কার জন্মলগ্ন থেকেই বন্ধু ও সহযোদ্ধা সামিউলকে আমার বিশেষ আর কিছুই বলার নেই। আশা করি চিরটাকাল আমরা সবাই নিজেদের মতো করে, কখনো ছোট। কখনো বা বড়ো উদ্যোগগুলির মাধ্যমে, বাংলাভাষাভাষী মানুষদের সমাজ-অস্বীকৃত যৌনতা আর লিঙ্গচেতনার অধিকারকে ভাষা দিয়ে যেতে পারবো। সমতার পথ এখনও এনেকটা দূর। বিঃদ্রঃ লেখকের নাম, ছদ্মনামে।]

 

স্বাধীন বাংলায় পরাধীন সমকামীরা

সামীউল হাসান সামী 

 

১৯৭২ সালের সংবিধানে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সকল নাগরিকের জন্য আইন, মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা, ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার যে বৈষম্যহীন ও ন্যয়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল তা এখনো অর্জিত হয়নি। স্বাধীন বাংলায় ক্রমাগত যুদ্ধ করে চলেছে ভালোবাসার স্বাধীনতার জন্য সমকামীরা। ভোটের রাজনীতিতে মানুষের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা মূল্যহীন। তাইতো কোন সরকারই সমকামীদের মানবিকতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। সমকামীদের নিয়ে কথা বলতেও এরা বিব্রত হয়। কিন্তু, সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে অনুযায়ী রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে বাধ্য এবং ২৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন আপনা আপনি বাতিল বলে গন্য হবে। একই সাথে,২৬(২)অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্র সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করবে না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। তাছাড়া,২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বলে ঘোষনা করেছে। সংখ্যা গরিষ্ঠরা কখনোই আইন কানুনের তোয়াক্কা করেনা। বিপরীতকামীরা সংখ্যায় বেশি হওয়ায় সমকামীরা স্বাধীন বাংলায় পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দী। স্বাধীন বাংলায় সমকামীরা অস্তিত্ব সংকটে। বাংলাদেশে সমকামীদের মৌলিক অধিকার মানে, নিজেকে লুকিয়ে রেখে বেচেঁ থাকা। এদেশের রক্ষনশীল সমাজব্যবস্থায় কোন ছেলে বা মেয়ের ভিন্ন যৌনতার কথা প্রকাশ হওয়া মানে, সকল প্রকার মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত হওয়া। নিজে মৃত্যুর পথ বেছে নেয়া, নয়তো অন্যের হাতে মৃত্যু বরন করা। বাংলাদেশে সমকামীদের হত্যা করা হলে, সরকার বিচারে বিভিন্ন তদন্তের অযুহাতে ধীরগতি নিয়ে আশে, যা হত্যাকারীদের উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের শিক্ষিত সুশিল সমাজ নামে পরিচিত বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের বুদ্ধি বিক্রি করেছেন বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে, তাই এরা এমন কোন মৌলিক অধিকার, নাগরিক অধিকার অথবা মানবাধিকার নিয়ে মুখ খুলে না, যাতে সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো বিব্রত হয়। এরা কখনোই সমকামীদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি সামাজিকতার রক্ত চক্ষুর ভয়ে। যারাও কথা বলতে চেয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদিরা তাদের চুপ করিয়েছে বিভিন্ন হুমকিতে। বাংলাদেশে সমকামীদের একমাত্র পত্রিকা রূপবানের সম্পাদক ছিলেন জুলহাস মান্নান। ২৫শে এপ্রিল-২০১৫ তাকে ও তার বন্ধু মাহবুব রাব্বি তনয় কে কলাবাগানের বাসায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। কিন্তু আজও পর্যন্ত তাদের সেই নির্মম হত্যা মামলার তদন্ত রিপোর্ট সরকার উপস্থাপন করতে পারেনি। ১৯ মে ২০১৭ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ২৮ জন সমকামীকে আটক করা হয়েছিল। এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা আনা হয়েছিল। যদিও আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাহিদা মতো ঘুষ আদায় করতে না পারলে হয়রানির জন্য যে কাউকেই মাদকের মামলায় জরিয়ে দেন। বাংলাদেশে সমকামীদের আটকের ঘটনা এই প্রথম নয়৷ ২০১৬’র পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন ‘রংধনু’ র‌্যালী বের করার চেষ্টাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা এলাকা থেকে ৪ জন সমকামীকে আটক করে পুলিশ৷ তারা তখন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে এলজিবিটি আন্দোলনের পক্ষে তাদের মতামত দিচ্ছিলেন৷ এমনই পরিস্থিতিতে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বেচে আছে স্বাধীন বাংলার পরাধীন সমকামীরা। এতো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কিছু NGO কিছু আইনি সংস্থা সমকামীদের সাস্থ্য ও আইনি সহায়তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাক্তি পর্যায়ে কিছু ব্যাক্তির চেষ্টায় সচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত সৃষ্টির কাজ চলছে। যা প্রয়োজনে তুলনায় খুবই কম। তবে বাংলাদেশের সমকামী জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার আদায়ে আশাবাদী। জুলহাজ, তনয়ের মৃত্যুতে তারা মৃত্যু ভয় কাটিয়েছে। তারা বুঝতে শিখেছে কোন স্বাধীনতাই বিনা রক্তপাতে অর্জিত হয়নি। তাই বাংলাদেশের সমকামীরা আমৃত্যু লড়ে যাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়।

[ছবিঃ ভুটান]


 


রেঙ্গু

[শুরুর আগেঃ

রিয়াজকে প্রথম দেখেছিলাম ইউটিউবের একটি ভিডিওতে, অনেক বছর আগে। তখন বাংলাভাষায় সমকামিতা নিয়ে ইউটিউব ভিডিও সত্যি দুর্লভ একটি বস্তু। কথা বলছি প্রাক-রূপবান সময়ের। কিন্তু লাজুক আমি তার সাথে আলাপ করতে অনেকটা সময় লাগিয়ে দিলাম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রিয়াজ খুব সক্রিয়ভাবে নিতে চলেছে কিছু উদ্যোগ, অদূর ভবিষ্যতে। সুরক্ষার খাতিরে সে’সব বিষয়ে কথা আপাতত এড়িয়ে যাচ্ছি। তবে ইতিমধ্যে “বৈচিত্র্য.বাংলা” নামক জালপাতা (ওয়েবসাইট) -এর মাধ্যমে সে সুযোগ করে দিয়েছে অগণিত বাংলাদেশী বন্ধুদের, তাদের নিজের যৌনতা আর লিঙ্গচেতনার কথা, নিজেদের কলমে প্রকাশ করবার। তার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ কর্মসূচীর সবগুলির সফল রুপায়ন আশা করবো বাংলাদেশকে আরো আধুনিক করে তুলতে সাহায্য করবে। এক নতুন বাংলাদেশ, যেখানে এলজিবিটি+ মানুষদের চাপাতির ভয়ে দিন গুজরান করতে হবেনা।]

রেঙ্গু

 রিয়াজ ওসমানী

দু’হাজার (২০০০) সাল কিংবা তার থেকে এক বা দুই বছর আগের কথা। আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব খবরাখবর আর যোগাযোগ রাখতে শুরু করি। বাংলাদেশেও তখন থেকে আস্তে আস্তে নেটের প্রসার শুরু হয়। ভ্রমণ সংক্রান্ত জালপাতা থর্নট্রি’র বাংলাদেশ শাখায় এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়। সেখানে আমার মত তিনিও বাংলাদেশে বেড়াতে আসার জন্য উদগ্রীব বিদেশী পর্যটকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং বাংলাদেশ সম্বন্ধে সাধারণ তথ্য বিলি করতেন। দেখলাম যে এই দিক থেকে তাঁর আর আমার চিন্তাভাবনা এক। তবে বিরাট একটা পার্থক্য ছিল আমাদের নিজস্ব অবস্থানে। আমি বাস করতাম মিশিগান অঙ্গরাজ্যের এন আরবার উপশহরে আর তিনি থাকতেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। কিন্তু এই দুই প্রান্ত থেকেই আমরা বিদেশী প্রশ্নদাতাতের সাহায্য করতে থাকি এবং সময়ের সাথে সাথে নিজেদের মধ্যে একটা ভাল বন্ধুত্ব তৈরি করে ফেলি।

আমি আস্তে আস্তে তাঁর একটা গভীর আসক্তির সাথে পরিচিত হই। তিনি একটি ভ্রমণ সংস্থা চালাতেন যার নাম বাংলাদেশ ইকোট্যুরস। এ কোন পাঁচ-দশটা ট্রাভেল এজেন্সির মত ছিল না। এ ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসীদের নিয়ে একটা “লাভের জন্য নয়” সংস্থা। বিদেশী বা প্রবাসী বাংলাদেশী পর্যটকরা অল্প সংখ্যায় কিন্তু প্রতিনিয়ত বেড়াতে এসে আদিবাসী পল্লীগুলোতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। বিনিময়ে অতিথিরা পেতেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এবং এ থেকে পাওয়া উপার্জনের সিংহভাগই ব্যয় করা হত আদিবাসী পরিবারগুলোর কল্যাণে।

আমি এতই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম তাঁর এই উদ্যোগে যে আমি ক্ষণিক সময়ের জন্য আমার তখনকার আরামদায়ক জীবন ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে চেয়েছিলাম তাঁর কাছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম – এইসব জায়গায় ঘাটি করে তাঁর সাথে কাজ করবো পর্যটক আর আদিবাসী পরিবারের কল্যাণে। সাথে তাঁর ব্যাবসার সহায়তা আর প্রসার করে বাংলাদেশের পর্যটন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখারও সুযোগ পেতাম। কিন্তু তা আর হয়নি নানা কারণে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কিভাবে তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারি সেই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। এবং সেই থেকেই তাঁর আরেকটি লক্ষনীয় ব্যাপার সম্বন্ধে জানতে পারি।

তিনি নিজে ছিলেন একজন সমকামী পুরুষ। আমার যত দূর মনে পড়ে, তিনি অর্ধেক বাংলাদেশী আদিবাসী আর অর্ধেক ক্যানাডিয়ান অর্থাৎ মিশ্র জাতির ছিলেন। আমার সাথে পরিচয় হওয়ার সময় তাঁর বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মত হবে। দীর্ঘ দিন ক্যানাডাতে বড় হওয়া ও বাস করার পর তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন আদিবাসীদের কল্যানে জীবনটা উৎসর্গ করতে। ভদ্রলোকের নাম ছিল রেঙ্গু। তবে তিনি খালি ম্রো, চাকমা, ইত্যাদি মানুষদের জন্যই নিজেকে নিবেদিত করেন নি – তিনি সতর্কতার সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন সমকামীদেরকেও সহায়তা করতেন। তিনি ইয়াহুতে যথাযথ নাম দিয়ে একটি দলের পাতা খুলেন যেখানে নেটের মাধ্যমে দেশের সমকামীরা নিজের গোপনীয়তা বজায়ে রেখে একে অন্যের সাথে মিলিত হতে পারতো, কথা বলতে পারতো। আমার জানা মতে এটাই ছিল বাংলাদেশী যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য প্রথম আন্তর্জাল ভিত্তিক একটি মিলন স্থান। এখানে তিনি ডেভিড নামে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন এবং তখন শুধু ইংরেজীতেই কথোপকথনের ব্যাবস্থা ছিল।

আমি তো এতো দিন ভেবে বসেছিলাম যে আমিই একমাত্র বাংলাদেশী সমকামী। বাংলাদেশে আর কোন সমকামী নেই, থাকতেও পারে না। কিন্তু সেখানে ঢুকে দেখি অজস্র প্রোফাইল। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশী গে দের সাথে কথাবার্তাও শুরু হয়ে গেলো। আমি নতুন এক ভুবন আবিষ্কার করলাম। আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ভালবাসার মানুষটা আমাকে বলেছে যে সে নাকি তখন থেকেই আমাকে চেনে যদিও আমরা দুই বছর আগ পর্যন্ত ভালভাবে কথা বলার সুযোগ পাইনি (এখন ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাস)। এবং এর সব কিছুরই উদ্যোক্তা ছিলেন রেঙ্গু। আমি আর রেঙ্গু তারপর প্রায়ই চিন্তা করতাম কি ভাবে বাংলাদেশ ইকোট্যুরসে বিদেশী সমকামী পর্যটকদেরকেও আকৃষ্ট করা যায়।

বেশ কিছু দিন তার কোন খবর না পাওয়ার পর তাকে একটা ইমেল পাঠাই খোঁজ নেয়ার জন্য। অনেক দিন পর একটা উত্তর এলো তাঁর এক ঘনিষ্ট বাঙ্গালী সহকর্মীর কাছ থেকে যে রেঙ্গু আর নেই – পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণের সময়ে তিনি এক প্রকার মশার কামড়ের ফলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তারপর তিনি মারা যান। এই খবর আমি কি ভাবে হজম করতে পেরেছি এখন আর মনে নেই। নিজের জীবন তখন বেশ চড়াই উতড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল এবং আমি ২০০৩ সালে বিলেতের লন্ডনে নতুন জীবন শুরু করি। সেজন্যই বোধ হয় শোক প্রকাশ করার সময় পাই নি। কিন্তু আজ তাঁর কথা মনে না করলেই নয়। আমার জীবনে দুইজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশী অনুপ্রাণিত করেছে। দুইজনই বাংলাদেশের ভ্রমণ শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন আর দুইজনই আজ আর নেই। আর বেঁচে থাকার সময়ে রেঙ্গু বাংলাদেশের সমকামীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যেই অবদান রেখে গেছেন তার জন্য বাংলাদেশের যৌন সংখ্যালঘুরা চিরকাল ঋণীই হয়ে থাকবে। তিনিই বলতে গেলে বাংলাদেশে তখন নবাগত আন্তর্জালের মাধ্যমে সামান্য হলেও সাংগঠনিক কাজ শুরু করে দিয়ে গেছেন আমাদের জন্য। আর আদিবাসীদের জন্য তিনি যা করে গেছেন সেটা তো প্রশংসার দাবীদার বটেই। বাংলাদেশ ইকোট্যুরসকে ভুলে না গিয়ে আমরা সেটাকে সমর্থন করতে পারি। রেঙ্গুর অনুসারীরা এখনও এটা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে আমার বিশ্বাস।

—————————————————–

বিঃ দ্রঃ দ্বিতীয় ব্যাক্তি যিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি হচ্ছেন মাহমুদ হাসান খান যার সাথেও থর্নট্রি’র বাংলাদেশ শাখায় পরিচয় প্রায় দশ বছর আগে। তিনি নিজের সফল কর্মজীবনের বাইরে দেশ প্রেমে উদবুদ্ধ হয়ে বিদেশী ও কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশ ভ্রমণ নিয়ে সব রকম সহায়তা করতেন। প্রাথমিক তথ্য বিলি থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানো, সব বাজেট অনুযায়ী আবাস জোগাড় করে দেয়া, সকল ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিট কেটে দেয়া এবং সূযোগ পেলে বরিশালে তার গ্রামের বাড়ির দেশে আতিথেয়তা প্রদান করা – কোন কিছুই বাকি রাখেন নি তিনি। এবং এগুলো সব তিনি অনেক বছর করেছেন সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় এবং দেশব্যাপী তার স্বেচ্ছাসেবক মানুষদের কাজে খাটিয়ে। পরে বিদেশীদেরই অধিক অনুরোধে তিনি একটি ভ্রমণ সংস্থা ট্রিপটুবাংলাদেশ খুলে বসেন স্বল্প বাজেটের বিদেশী পর্যটক বা ব্যাকপ্যাকারদের স্বল্প মূল্যে সকল প্রকার সেবা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। সেই সাথে ফেসবুক দল বেড়াই বাংলাদেশ এর মাধ্যমে তিনি দেশের ভেতরে বিভিন্ন জানা অজানা জায়গায় দেশী ভাই-বোনদের বেড়ানোর একটা চল শুরু করে দিয়েছেন। রেঙ্গুর সাথে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু মাহমুদ ভাইয়ের সাথে দেশে দেখা হয়েছে অনেক বার। তিনি ঢাকায় বসে কাজ করতেন, আমি ছিলাম লন্ডনে অবস্থিত তারই এক সহকর্মীর মত। তবে এক বছরও হয়নি তিনি হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে তার ছোট্ট পরিবার ও আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। দেশ-বিদেশের বহু অনুরাগী এই শোকে আজ মর্মাহত।

[ছবিঃ ভুটান]