কাঁচালঙ্কা

সেট অফ নাম্বারস

সেট অফ নাম্বারস

— অনিরুদ্ধ (অনির) সেন

পূর্বরাগঃ

একজন নাট্যদর্শক এবং মানবতাপ্রেমি হিসেবে এই নাটক লিখতে গিয়ে বারবার বুঝেছি যে আমার কার্যকরী অভিজ্ঞতা একদম নেই।
শুধুমাত্র একটা ভিস্যুয়ালাইজেশনের তাগিদে আমার ভাবনাগুলো এভাবে ছড়িয়ে দিলাম।খুব ইচ্ছে ছিলো একটা অনুনাটক লিখবো।
কিন্তু চরিত্র সংখ্যা এর চেয়ে কম আর করা গেলনা।
খুব দুঃসাহস নিয়ে যদি এটুকু আশাও করি যে কোন দল এটাকে মঞ্চস্থ করবে, তাহলে তাদের আমি পূর্ণ স্বাধীনতা দিলাম এই নাটকটাকে দুমরে মুচরে নিজের মতো করে আরো মানবতামুখী করে তোলার। অভিনেতাদের অভিব্যাক্তি নিয়েও বিশেষ কিছু নির্দেশ থাকলোনা। সেটাও পুরোপুরি তাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।
নাটকের শেষে প্রত্যেক অভিনেতাকে তাদের পোশাকের কিছু অংশ খুলে ফেলতে হবে। তাই ভিতরে যথেষ্ট লজ্জা নিবারণ করার মতো পোশাক থাকবে কিনা সে সিদ্ধান্তও আমি নাট্যদলের উপর ছাড়লাম।
এই নাটকের অনেক জায়গা খুব বেশি করে ভিস্যুয়াল করার প্রয়োজন। কি করে, আমার জানা নেই। আমি নাটকের লোক নই।
লেখাটাকে “প্রায় অনুনাটক” হিসেবে অভিহিত করাই শ্রেয় মনে করলাম।
এই শিল্প-অভিব্যাক্তিকে কি নামে ডাকা হবে তাই নিয়ে আমার স্রষ্টা হিসেবে কোন মাথাব্যাথা নেই। উদ্যেশ্য বা বক্তব্যটাই মুখ্য।

[একটা ছোট্ট ঘর। সামনাসামনি বাবা আর ছেলে। বসার জায়গা হিসেবে কাঠের ব্লক ব্যাবহার করা ভালো। তাহলে দৃশ্য পরিবর্তনে বেশি জিনিসপত্র সরাবার হাঙ্গামা থাকবেনা। বাবার পরনে কালো রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি। মাথায় কালো টুপি কিন্তু লালবাহাদুর শাস্ত্রী গোছের। ছেলের বেশভূষাও কালো। কিন্তু মলিন, কোথাও ছেড়া। ঘরের মাঝে একটা আলগা দেওয়াল। বড়ো একটা ভারতের মানচিত্র সাঁটা। পরিষ্কার। ঝকঝকে। এই আলগা দেওয়ালটা চাইলে ঘোরানো যাবে। তখন এর পিছনের অংশ দেখা যাবে। ঘরে পার্মানেন্ট দেওয়ালগুলোয় বিভিন্ন মনিষীর ছবি টাঙ্গানো। তাদের গলায় টাটকা ফুলের মালা, আর মাথার দিকে একটা করে কালো কাকের আকৃতির কাট-আউট। রয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, আম্বেদকর প্রমুখ। মঞ্চের মাঝখানে, ভালোভাবে দেখা যাবে এরকম একটা জায়গায়, কিছু রক্ত। মঞ্চের এক দিকে একটি দরজা, সেখান দিয়ে বেরোলে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে।]

বাবাঃ তাহলে তুমি বাড়ি ছাড়বে ভাবছো? কিন্তু কেন?
ছেলেঃ উপায় দেখছিনা। জীবনটা দিন-কে-দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
বাঃ বাজে বোকোনা। সবকিছুরই কার্যকারণ থাকে। তুমি…
ছেঃ মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছি, তাই তো? কিন্তু বাবা আপনি আমার আইনি অধিকার পেলেও, মায়ের সাথে আমি কোন যোগাযোগ রাখবোনা এরকম তো কোন কথা ছিলোনা।
বাঃ তোমার মা আমার ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জেনেও…
ছেঃ মাও কিন্তু একই কথা ভাবেন বাবা।
বাঃ ওসব মিথ্যে।
ছেঃ সত্যি মিথ্যে আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
বাঃ তুমি অন্ধ তাই।
ছেঃ অন্ধত্ব নয়। দুদিক থেকে দুটো পরস্পরবিরোধী রঙের ছটায় আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আপনারা ডিভোর্স করে বহাল তবিয়তে আছেন। কিন্তু আমি? আমার উপর দিয়ে কি যায় ভেবেছেন কখনো? কতোটা রক্তাক্ত আমি, আপনি বোঝেন? সবাই আমায় সন্দেহের চোখে দেখে। ভাবে আমি মায়ের সাথে মিলে আপনার ক্ষতি করছি। কিন্তু আমার রাগের কারণটা বুঝেতে পারেন?
বাঃ অর্বাচীনদের মতো কথা বোলোনা। শেষের দিকে আমাদের মধ্যে কতোটা ঝগড়া মারামারি সেসবই তুমি দেখেছো।
ছেঃ হ্যা। কিন্তু আপনাদের নিজেদের নিজেদের স্বায়ত্ব পেতে তখন আপনারা এক ফোটাও অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেননা। তাই সব ভাসিয়ে…

[টিংটং শব্দে বেল বাজে।একজন পরিচারিকা ঘরে প্রবেশ করে। সুবেশিত, রঙ্গিন চড়া মেকআপ, হাতে ঝাঁটা। আলট্রাআধুনিক আর সেকেলে মিশিয়ে অদ্ভুত সাজ। ঘরদোর ঝাঁট দিতে শুরু করে কোন কথা না বলে।]

বাঃ মাটিতে কিছু রক্ত লেগে আছে। কেউ দেখার আগে ধুয়ে ফেলো। রক্ত এলো কোত্থেকে?

[নেপথ্য থেকে মেয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।]

“কাল আমায় আমার বাকি ভাইয়েরা ধর্ষণ করেছেন বাবা। ওটা তারই চিহ্ন।”

[একটি তরুণী মেয়ে প্রবেশ করে। এর পরনেও কালো পোশাক। এবং জীর্ণ।]

বাঃ ছিঃ মা। এভাবে বলতে আছে? পাড়াপ্রতিবেশী শুনলে কি বলবে?
মেয়েঃ কেন বলবোনা বাবা? আমি চিৎকার করে বলবো। পাড়া প্রতিবেশীরা জানুক। এতে তো তোমারও পূর্ণ সমর্থন আছে।
বাঃ তুমি স্বাভাবিক হলে এসব কাজ আমাদের করতে হতো? তুমি আমাদের মতো নও কেন? মেয়ে হয়ে মেয়েদেরকে ভালোবাসা, কি স্পর্ধা?
মেঃ কোনটা স্বাভাবিক সেটা কি আপনি ঠিক করে দেবেন বাবা? আপনাদের থেকে আমি একটু আলাদা শুধু এই জন্যই আমি অস্বাভাবিক? ভালো করে খেতে পরতে অবধি পাইনা আমি। সবাই অদ্ভুত নামে আমায় ডাকে। কারোর ঘরে গেলে এমনভাবে তাকায় যেন আমি অন্য কোন গ্রহ থেকে নেবে এসেছি। কি লাভ আমার এ বাড়িতে থেকে?
বাঃ তা তুই এরকম হতে গেলি কেন?
মেঃ আমি যেরকম সেরকমই বাবা। নিজের ইচ্ছেয় হয়নি। হয় আমায় গ্রহণ করো পুরোপুরি, নয়তো মুক্তি দাও।
ছেঃ হ্যা। হয় গ্রহণ করো পুরোপুরি, নয়তো মুক্তি দাও। আমি না হয় মায়ের কাছেও যাবনা। একা নিজের মতো থাকবো।
বাঃ (ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলে) কোথায় যাওয়া চলবেনা তোমাদের। এখানেই থাকবে। পচবে। গলবে। মরবে।

[পরিচারিকা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এতক্ষণ সে কানে হেডফোন লাগিয়ে মেঝের রক্ত ধুচ্ছিলো। হেডফোন সে খোলেনা।]

পরিচারিকাঃ সব ওর মায়ের দোষ।
ছেঃ (হতভম্ব হয়ে) মা কি করলো এখানে? আর যদি করেও থাকে তাহলে সেটা আমায় বলা হবে কেন? মার তো আমার সাথে আইনি কোন যোগাযোগ নেই। আমি তো এখন এ বাড়িরই ছেলে। (পরিচারিকার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।) আর ঐ বা সবসময় আপনার হ্যা তে হ্যা মেলায় কেন?
বাঃ কারন ও টাকাটা আমার হাতে পায়।আমি ওকে চাকরিতে রেখেছি। আমি না চাইলে কবে ও ফুট হয়ে যেত।
ছেঃ সেই মাইনেতে আমার কোন কন্ট্রিবিউশান নেই? আছে।
মেঃ আমারো আছে।
বাঃ তাতে কি কিছু আসে যায়? তোমরাই দেখো।

[দুজনে তাকায়। পরিচারিকা কানে হেডফোন লাগিয়ে সেভাবেই রক্ত মুছে চলেছে।]

বাঃ আর তাছাড়া ও ভুল কি বলেছে। তুমি আর তোমার মাই তো…
[কথা শেষ না করে হঠাৎ ক্ষিপ্র বাবা ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলের দিকে। টুঁটি টিপে তাকে মেঝেতে ফেলে দেন। ছেলে আত্মরক্ষার তাগিদে বাবাকে ধাক্কা দেয়।বাবা দুরে গিয়ে পরেন।]

পঃ ও মা গো। বাবার গায়ে হাত দেওয়া? কি সাহস! দাঁড়াও। আমি সব্বাইকে বলবো। কি ডাকাতে ছেলে গো?

[পরিচারিকা দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায়। এদিকে বাবা ছেলেটির উপর চড়াও হয়ে এলোপাথাড়ি চড়থাপ্পড় চালাচ্ছেন তখন।]

[দৃশ্য পরিবর্তন। দুজন লোক চোখে ঠুলি পরে ঢোকে। সাধারণ কালো পোশাক। তারা আলগা দেওয়ালটি ঘুরিয়ে দেয়। একটা ছবি আঁকা। কিছু মানুষ ঠুলি পরে চলেছে রাস্তা দিয়ে। আরো ছবিতে যা আছে তা হোলো মন্দির, মসজিদ, গির্জা, কোর্ট, টেলিভিশন, শপিং মল, অর্ধনগ্ন মেয়ের ছবি দেওয়া প্ল্যাকার্ড। একটা হাবিলদার ঢোকে, পরনে ইউনিফর্ম কিন্তু কালো রঙের। এদিক সেদিক লাঠি ঠকঠকিয়ে হাঁটে। দর্শকদের হুল দেয়। পরিচারিকা দরজা দিয়ে ঢোকে। তার কাছে গিয়ে, একবার দেখে নেয় আসে পাসে কেউ আছে কিনা। তারপর ফিসফিস করে দুজনে কথা বলে। দুজনে দরজার দিকে এগিয়ে যায় কথা বলতে বলতে।]

[দৃশ্য পরিবর্তন। ঠুলি পরা লোকদুটো আবার এসে আলগা দেওয়ালটা ঘুরিয়ে দেয়। পরিচারিকা হাবিলদারকে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। গম্ভীর পরিবেশ। বাবা, ছেলে, মেয়ে চুপচাপ বসে আছে। ছেলেটির ও মেয়েটির মুখ বেয়ে রক্ত পরছে। মেঝেতেও জায়গায় জায়গায় রক্ত। পরিচারিকা সেই রক্ত মুছতে থাকে। এবার আর হেডফোন নেই।]

হাবিলদারঃ কি হচ্ছে কি এখানে?
বাঃ কিছু না। ওরা বেয়াদপি করছিলো। শাসন করেছি।
হাঃ তা আপনি বাবা। কত্তেই পারেন। আমার কি কোন কাজ আছে?
বাঃ আপাতত না।
হাঃ এতো বড়ো সংসার চালাচ্ছেন। এতরকমের ছেলেমেয়ে আপনার। তবু সবাই মিলেমিশে কত সুখে আছে। পাড়ায় আপনার কত সুখ্যাতি।
পঃ একদম।
হাঃ কটি ছেলেমেয়ে যেন?
বাঃ আজ্ঞে ৩৬টি।
হাঃ সেটাই। এতো বরো সংসার চালানো কি চাড্ডিখানি কথা। কে চালাচ্ছে বাপু শুনি এরকম গোটা পাড়ায়। তাই বল্লাম। কোন চাপ হলে এই শর্মাকে খবর দেবেন।
বাঃ এখন দরকার নেই। এবারটা আমি আর ঐ (পরিচারিকাকে দেখিয়ে) সামলে নেবো। তবে… (হঠাত পরিচারিকার দিকে তাকিয়ে) এই তুই কি গিলছিস রে হা করে? তোর কোন কাজ নেই? বলি রান্নাটা কে বসাবে শুনি? আমার বাবা?

[পরিচারিকা জিভ কেটে গান্ধীজীর ছবিকে পেন্নাম ঠোকে।]

বাঃ হ্যা। যা ভাগ। রান্না বসা। বেশি করে ঝালমশলা দিবি। এ বাড়ির সবাই ওটাই ভালোবাসে। কালকের মাছটা একটু গন্ধ লাগছে। ওটা কড়া করে ভাজবি তো। ঝাল বানিয়ে ফেল। কেউ বুঝতে পারবেনা।

[পরিচারিকা কাষ্ঠ হাসি হেসে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা দিয়ে নয়। সম্ভবত রান্নাঘরের দিকে। বাবা ও হাবিলদার ফিসফিস করে কথা বলে। মাঝে মাঝে হাসির রোল তোলে। ছেলেটি ও মেয়েটি নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে মুখ ঢেকে। নেপথ্যে কিছু নাম্বার ভেসে আসে। সঙ্গে চিৎকার, কান্না, গোলাগুলি। ১২৪এ, ২৯৮এ, ৩৫২, ৩৫৬, ৩৭০, ৩৭৭,……
পর্দা নেবে আসে।]

[পর্দা আবার উঠে যায়। সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে– দুজন ঠুলি পড়া লোক, বাবা, মেয়ে, ছেলে, হাবিলদার, পরিচারিকা।
তারা একে একে নিজেদের পোশাকের কোন একটা অংশও খুলে ফেলেন। এবং আমরা তাদের পরিচয় জানতে পারি। কাগজে সাঁটা।

দুজন ঠুলি পড়া লোক – জনতা ।। বাবা — ভারতবর্ষ ।। মেয়ে — মণিপুর
ছেলে — কাশ্মীর ।। হাবিলদার — আইন
পরিচারিকা — মিডিয়া

সবাই জনতাকে অভিবাদন জানায় একসাথে।]

( পূর্বে বংকু পুজো সংখ্যায় (২০১৬) প্রকাশিত)

ছবিঃ অরূপ দাস 

Exit mobile version