কাঁচালঙ্কা

তিতির

একটা একটা করে ট্যাবলেটগুলো কাঁচের বাটিতে জড়ো করে রাখছিল তিতির। আর দুতো পাতা বাকি, দুটো শেষ করে ফেলেছে।
থেমে গেল। এই তো সেইদিনও ভালো করে কথা বললো,বাইকে করে গঙ্গার ধারে নিয়ে গেল,একসাথে আইসক্রিমও খেলো,কী ভুল করলো তবে ও?যে এতো বড়ো শাস্তি দিল সৌহার্দ্য?
যাক। ভাগ্যিস ডাক্তারকাকুর প্রেসক্রিপশনটা ছিল। তাই দেখিয়েই তো ওষুধগুলো আনতে পারলো।সারা সন্ধ্যে ঘুরে ঘুরে জোগাড় করেছে,একটা দোকানে তো আর একটার বেশি পাতা দেবে না।
যাই হোক,আর ভাবনা নয়,আদ্ধেক হয়ে বেঁচে থাকা সত্যিই আর সম্ভব নয় মনে হয়।
সাদা সাদা ট্যাবলেটগুলো দেখে মনে পড়ছে তিতিরের, আগের বছর ঠিক এইসময়ই কি জ্বর হয়েছিল সৌহার্দ্যের,এরকমই সাদা ট্যাবলেট কিনে ও রাতেই ওর বাড়িতে ছুটেছিল তিতির। সৌহার্দ্যের মা কোথায় যেন গিয়েছিল ,মনে নেই, সারারাত ছিলও,ভোরের দিকে জ্বর কমলো,ও বাড়ি ফিরলো তারপর,সারারাত ওর বিছানাতেই বসেছিল। মাথায় জলপটি দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল ভোরের দিকে বোধহয়, সৌহার্দ্য ঘুম থেকে ডেকে দিল।

সৌ। তিতির! তিতির! মা ফোন করছে বোধহয়! ধরো! তিতিইইইর!
তি। হ্যাঁ কে? কি হলো? একি তুমি উঠেছো কেন আবার?
সৌ। আরে! তোমার মা ফোন করছে ধরো,কেটে যাবে তো
তি। ওহ! আচ্ছা ধরছি,তুমি শুয়ে পড়ো।

রিং বাজছে ফোনের, রবীন্দ্রসঙ্গীত একটা, সৌহার্দ্যের পছন্দেরই, ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রসণ…’
হঠাৎ ঘোর ভেঙ্গে গেলো, সত্যিই ফোন বাজছে,এতো রাতে আবার কে ফোন করছে,উফফফফ!
ফোনের স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠলো, অভীক। এতো রাতে ফোন করছে কেনো?
ও কি কিছু বুঝতে পারলো না কি? নানা ও কী করে বুঝবে?ওকে তো তিতির কিছুই বলেনি আজ দুপুরের কথা।

তি। হ্যালো,কি হলো এতো রাতে ফোন করছিস কেনো?
অ। সরি রে।আসলে না আমি পড়তে বসেছিলাম,দেখলাম ফিফথ পেপারের যে নোটটা স্যার কাল দিলো না,ওটা আদ্ধেক নেই আমার কাছে,শোননা কাল সকালে ব্যাচে নিয়ে আসবি রে একটু,আসলে সকালেই তো বেড়বি,তাই এখন ফোন করলাম।
তি। ওহ! হ্যাঁ,সব নোট পেয়ে যাবি কাল,চিন্তা নেই।কাল হয়তো আমার সবই তুই পেয়ে যাবি…
অ। মানে! সে আবার কি? তুই কোথায় বলতো? সৌহার্দ্যদার বাড়িতে না?
তি। নারে, নিজের বাড়িতেই আছি। মা-বাবা দিদার বাড়ি গেছে।
অ। কি জানি, কেমন অদ্ভুত ভাবে কথা বলছিস,কাকু কাকীমা নেই জানলে আমি গিয়ে থাকতাম, যাইহোক, সাবধানে থাক,আমি রাখলাম বুঝলি।
তি। হ্যাঁ,ঠিক আছে,বাই।
অ। বাই।

ফোন রাখলো তিতির।
তিতির সেনগুপ্ত, জেভিয়ার্স এ ইংলিশ অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনায় চিরকালই ভালো।
তিতির,যার জন্য তিতির বাবা-মা হোক আর প্রতিবেশী-আত্মীয় সবারই চোখের মণি ছিল। কিন্তু ছোট থেকেই সে আর পাঁচটা ছেলের মতো নয়, চুপচাপ ভিতরগোঁজা, বন্ধু বলতে ওই পাশের পাড়ার অভীক, এখন কলেজের বন্ধুও বটে। বাবা-মায়ের প্রিয় হলেও তিতির কোনদিনই বাবা-মায়ের বন্ধু হয়নি বা,নিজের মতো করে নিজের জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত সাজাতে চেষ্টা করেছে।
ফার্স্ট ইয়ারেই রেজাল্ট অপ্রত্যাশিত হওয়াতে ওর বাবা ওকে ভর্তি করলো নতুন এক টিউশনে,দেখাদেখি ভর্তি হলো অভীকও। দু-চারদিন যাওয়ার পর বেশ ভালো লাগতে লাগলো তিতিরের নতুন ব্যাচটা।
ব্যাচ বলতে জন পাঁচেক স্টুডেন্ট, তিতির-অভীক-ঝিমলি-ঈশান আর সৌহার্দ্য। যদিও সৌহার্দ্য মাস্টার্সের স্টুডেন্ট তাই একসাথেই পড়াতো স্যার সবাইকে, স্যার বলতে সায়নদা,তিতির চেনে ওকে ছোটবেলা থেকেই, ওরই বাবার কলিগের ছেলে,খুব স্টুডিয়াস আর ব্রিলিয়ান্ট।
এখানে ভর্তি হওয়ার পর তিতিরের একটা ভালো হয় সেটা হলো ও একটা খুব নিজের মতো পরিবেশ পেলো, নাহলে ফার্স্ট ইয়ারের টিউশন ব্যাচে তো ওর দমবন্ধ লাগতো। যাই হোক, এতো সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনা করায় তিতিরের রেজাল্ট ভালোই এলো ইন্টারনাল এক্সামে। তিতিরও খুশি, ওর বাবা-মাও খুশি, আর খুশি সৌহার্দ্য। কেন সৌহার্দ্য খুশি কেন?
সৌহার্দ্য খুশি তিতিরকে পেয়ে, ব্যাচের মধ্যের আলাপটা আস্তে আস্তে ব্যাচের বাইরেও ছড়াতে থাকলো। প্রথম প্রথম তিতির , সৌহার্দ্য আর অভীক তিনজনে মিলে ব্যাচ থেকে বেরিয়ে কফি বা মোমো খেতে যেতো কিন্তু অভীকের গানের ক্লাস ঠিক ব্যাচের পরেই হওয়ায় অভীক আর যেতে পারলো না।

তি। তুই যাবি না?
অ। না রে, গানের ক্লাসটার টাইমিং হঠাৎ চেঞ্জ করে দিলো কি করবো বল? রাগ করিসনা, দেখ আমরা অন্য টাইমেও তো যেতে পারি বল।
তি। ভালো।তাহলে আর কি,আমিও যাবো না।
অ। আরে, তোরা যা না, আমি যাবোনা তো কি? এই সৌহার্দ্যদা তুমি ওকে নিয়ে যাও তো,আমি চললাম,আমার দেরী হচ্ছে,বাই।
তি। হ্যাঁ, বাই।
সৌ। আমার সঙ্গ কি এতই খারাপ যে অভীক না থাকলে যাওয়া যায় না?
তি। না তা নয়, তুমি তো সৌহার্দ্যদা ও আমার বেস্টফ্রেণ্ড। ঠিকাছে, চলো।

ওরা মোমো খেতে গেলো,এরকমভাবেই সৌহার্দ্য আর তিতির কবেই যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ালো সেটা সায়নদা, অভীক, তিতিরের বাবা-মা, ঝিমলি, ঈশান, এমনকি সৌহার্দ্যের মা-ও বুঝলোনা বা হয়তো বুঝলো, কিন্তু জানার চেষ্টা করলো না বা জানার চেষ্টার ইচ্ছা করলো না।
মানুষ এমন অনেক সময়ই সত্যিকে কেমন যেন ইচ্ছা করেই চাপার চেষ্টা করে, না অন্যের চোখ থেকে নয়, নিজের চোখ থেকে,আসলে সব সত্যি যদি মানুষ নিজের চোখকে দেখাতে যায় তাহলে ভালোবাসা-প্রেম-সম্পর্ক এসবগুলো কেমন যেন পাথরের মতো কঠিন হয়ে যাবে, আর এই স্বভাবের জন্যই তো স্ত্রী-এরা স্বামীর পরকীয়া জেনেও নিজের মনকে বোঝায় ,মায়েরা বাবাদের আস্বস্ত নিজের সন্তানদের বিষয়ে।
দুজনের জন্মদিন গেলো,সেলিব্রেশন একসাথে সবাই মিলে,ভ্যালেনটাইন্স ডে সেলিব্রেট করলো ওরা দুজনে মিলে, এইতো আগের মাসেই তো হলো, হ্যাঁ, আগের মাসেই তো, কই তখন তো সৌহার্দ্যকে দেখে একবারও মনে হয়নি যে ও আর একমাস বাদেই তিতিরের মতো বহমান একটা নদীর বুকে এমন বজ্রকঠিন পাথরের বাঁধ দিয়ে ওর নব্য জলধারাকে রুখে দেবে, যাতে ওই নদীটা নিজেকেই নিজে শেষ করার চেষ্টা করে।
আজ তিতিরকে যা হোক করেই হোক এগুলো সবকটা খেতে হবে,না না এরম জীবন রেখে কোনো লাভ নেই। একাকীত্বের অন্ধকারে সৌহার্দ্যই তো ছিল তিতিরের আলো,যাকে ও নিজের মনের সবচেয়ে গোপন সত্যিটাও বলতে পারতো,তাই আজ যদি বেঁচে যায় তিতির তাহলে একটা গতিহীন-ছিন্ন নদীর মতো জীবন হবে ওর।

ভাবতে ভাবতে সবকটা ট্যাবলেট খোলা হয়ে গেছে তিতিরের, খেতে হবে সবকটা একটু একটু করে। আস্তে আস্তে প্রেমের ছোরাটাকে বুকে ঢুকিয়ে নিতে হবে।
না! ওয়েট! মা তখন ফোন করে কি যেন বলল হোয়াটস আপে পাঠিয়েছে, দেখবে?
কী হবে দেখলে, মায়ের শেষ ইচ্ছাটা রেখেই যাক আজ, ও তো মরেই যাবে একটু পরে, আর মা-বাবা আস্তে তো কাল বিকেল। ততক্ষণে কেউ জানতে পারবে না, আর এই দুবছরের মতো সৌহার্দ্যও আর কাল সকালে ফোন করে ঘুম ভাঙাবেনা নিশ্চয়ই। ডেটা-টা অন করলো,এইতো মেসেজ ঢুকছে কত্তো, সৌহার্দ্যও কি-একটা মেসেজ করেছে, আগে ওরটাই দেখবে,
‘প্লিজ! ভুল বুঝিসনা টিটস, আমি সিদ্ধান্তটা আমাদের দুজনের ভালর জন্যই নিয়েছি,তুই আরও ভালো কাউকে পাবি, সাবধানে থাকিস, দরকার হলে ফোন করতে পারিস’। আগে মেসেজ করার পর আধঘন্টা হয়ে গেলে আর রিপ্লাই না আসলে কতো ফোন আসতো,আর আজ একটা ফরম্যালিটি করে হাত ধুয়ে নিল,কি সস্তা! কি সস্তা না মানুষের মন! আর ইনোসেন্ট মন নিয়ে খেলার আলাদাই মজা,তাই না?
না! মা কি মেসেজ করলো,ধুর, কি মেসেজ! চাড্ডি কিসব ছবি, যাইহোক, ডাউনলোড তো করি।
প্রায় গোটা বারো কি চোদ্দ ছবি,সব তিতিরের ছোটবেলার, ও তো ছোটবেলায় দাদু-দিদার কাছেই থাকতো,এইতো সেই ব্যাডমিন্টন খেলার ছবি দাদুর সাথে, ওইতো ব্যাটটা এখনও ওরই ঘরে মা ঝুলিয়ে রেখেছে, আরে এটাতো দাদু-দিদার সাথে দার্জিলিং এর ছবিটা, ছোটবেলার এই দুটো মানুষই ওর জগত ছিল। তারপর ও চলে এলো কোলকাতায়, দাদুও মারা গেলো, তারপর ক’মাস পর,
কতদিন দিদাকে দেখেনি তিতির, দিদার চামড়াগুলো কি আরও ঝুলে গেছে? ফোনও করেনি দিদাকে, মা যদিও বলতে এসেছে অনেকবার কিন্তু একপ্রকার শুনেছে কিন্তু মন দেয়নি তাতে।
সৌহার্দ্যর সাথে ইকোপার্কে ঘুরতে ঘুরতে দিদা ফোন করলেও ফোন ধরে বলেছে ক্লাসে আছে।
দাদু যখন মারা গেলো, বাবা-মা নিয়ে গেলোনা সামনে পরীক্ষা ছিল বলে,
দাদু! তুমি কোথায় দাদু!
ফোনের স্ক্রিনেই টপটপ করে দুটো ফোঁটা পড়লো
না! আর না!
আস্তে আস্তে উঠলো তিতির ট্যাবলেট ভর্তি বাটিটা নিয়ে বাথরুমে গেল, প্যানের ওপর পুরোটা উপুর করে ফ্ল্যাসটা টিপে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো আস্তে আস্তে জলের তোড়ে চল্লিশটা ট্যাবলেট ধুয়ে মিলিয়ে গেলো।
ঘরে এলো তিতির, রাত তিনটে কুড়ি,
রিং বাজছে,

মা। হ্যালো! বাবান কীহলো এতো রাতে ফোন করছো! কীহলো বাবাই উত্তর দিচ্ছোনা কেন। হ্যালো
তি। না মা হঠাৎ মনে হলো তুমি ফোন করেছিলে, আমি ভুলে গিয়েছিলাম ফোন করতে,তাই করলাম,দিদা ঠিক আছে?
মা। ওহ! তাই বলো। হ্যাঁ বাবু, দিদা ভালো আছে। তুমি আর জেগোনা ঘুমিয়ে পড়ো, ডিনার করেছো? কফি কে করে দিলো? ববিতা দিদি না তুমিই করলে?
তি। না আমিই করলাম, হ্যাঁ খেয়েছি।আচ্ছা, আমি ডিস্টার্ব করলাম। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো মা।
মা। না,ঠিক আছে,তুমি শুয়ে পড়ো। আমরা কালই দিদাকে নিয়ে চলে যাবো। হ্যাঁ সোনা।
তি। হ্যাঁ মা, গুড নাইট।
মা। গুড নাইট।

কাল দিদা আসবে, দিদাকে বলবো ওই ঝাল নাড়ুটা কত্তদিন খাইনি,গুড নাইট সবাই!

ছবিঃ ভুটান


<< কালিজা ২০২১ (৪র্থ বর্ষ) – সূচিপত্র


Exit mobile version