কাঁচালঙ্কা

দু কূল ভেসে যায়

আটের বি ইটন স্কোয়ার গার্ডেন । হ্যাঁ, এই বাড়িটাই হবে।
অনুজ্বল সাদা রঙের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল তুষার। আর যেন মোটে পা এগোচ্ছে না। পাঁচিলঘেরা বাড়ির সামনে কালো রঙের মাঝারি উচ্চতার লোহার গেটের ভেতর দিয়ে ভেতরের বাগান, পাশের গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা ডিজায়ার গাড়ি সবই দেখা যাচ্ছে। এখানে বাইরে কোনো বেল-টেল নেই তো! ভেতরেই সটান ঢুকে যেতে হবে মনে হয়। পাঁচিল, গেট সবই আছে, কিন্তু বাড়িটার কেমন যেন একটা নিশ্চিন্ত ভাব, যেন যে কেউ সটান ভেতরে চলে যেতে পারবে।
ভাড়ার গাড়িটা সেই কোন দূরে মোড়ের মাথায় মেন রাস্তাতেই ছেড়ে দিতে হল। চায়ের দোকানের ছেলেটা বলল,
— আটের বি? বি? নাহ্, বি আবার কোনটা? জানি না।
গাড়িওয়ালা বলল,
— আমি আর গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারব না, আপনি আমায় এখানেই ছেড়ে দিন।

অগত্যা, গাড়ি ছাড়তে হল তুষারকে। তুষারের নিজের গাড়ি নেই। তবে যে অ্যাড এজেন্সিতে ও কাজ করে, সেই গাড়িটিই প্রায় সর্বক্ষণের জন্য ওর সাথে থাকে। তাই নিজের গাড়ি যে নেই তা মোটেই মনে হয় না তুষারের। এখন যেন কেমন খালি খালি লাগছে, গাড়ি যন্ত্র হলেও সাথে থাকলে মনে হয় যেন কেউ একটা সঙ্গে আছে। মন খারাপ হল, ভাল হল, আর কিছু না হোক গাড়িতে এসে ধুপ করে বসে পড়া যায়। এ যেন চলতি ফিরতি একটা বাসস্থান। আর হবে নাই বা কেন! স্টেটসে তো কত লোকে গাড়িতেই রাত কাটায়। তুষার উচ্চাকাঙ্খী, আর দু-তিন বছরের মধ্যে হয় কিংডম নয় স্টেটসে যেতে চায় ও। এই এখন যে কাজে ও কলকাতায় এসেছে, এসব কাজে জড়াতে ওর মোটে ভাল লাগে না। কিন্তু এই কাজ যেন একটা চ্যালেঞ্জ মতো ওর কাছে। মনের মধ্যে এক আগুন জ্বলছে তুষারের। আর যে এই আগুন জ্বালিয়েছে সে যদি এই হৃদি দাবাগ্নি সম্পর্কে একটু যত্নশীল হত, একটু সচেতন হত তবে মনে হয় তুষারকে এইসব কাজে জড়াতে হত না। রাতের ফ্লাইটেই ব্যাঙ্গালোর ফিরে যাবে তুষার, কলকাতায় একদিনও অতিরিক্ত থাকার তার কোনও প্ল্যান নেই। সত্যি! সাথে করে গাড়িটা আনলে অন্তত একটা জোর পাওয়া যায়, বিত্তের জোর নাকি মনের জোর, ফাঁকা সেই জোর। কিছু জায়গায় সঙ্গীহীন হয়ে যেন একেবারেই যাওয়া যায় না।

কালো লোহার গেট খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে তুষার। একধারের বাগানে সুন্দর রঙীন ফুল ফুটে রয়েছে। বাড়ির অন্যদিকে গ্যারেজে একটা গ্রে ডিজায়ার গাড়ি । সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল সে। মানুষ ঘরবাড়ি কত সাজিয়ে রাখে, মানুষ বাইরেটা কত সুন্দর করে রাখে। ইশ! যদি অন্তরের বাগানটাও ঠিক এমনি সুন্দর করতে পারত, তবে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। ভেতরটা পারে না বলেই কি বাইরের সাজসজ্জার প্রতি লোকের এত ঝোঁক? না! আর সময় নষ্ট করা চলবে না, তাড়াতাড়ি কাজ করে ফিরে যেতে হবে। যারা তার সুকুমারবৃত্তির খেয়াল করেনি, সেই বা শুধু শুধু কেন তাদের নিয়ে ভাববে! এবার ভবনের ভেতরের দরজার কাছে চলে এসেছে, দরজার মাথায় মাধবীলতা যেন মাথা দুলিয়ে তুষারকে স্বাগত জানাচ্ছে। কী এক মহৎ কাজ করতে এসেছে সে তা এই মাধবীলতা জানে। হয়তো তার ছায়াসঙ্গীনির ছায়াজীবনের পর্দা উঠে গিয়ে অমল আলো প্রবেশ করতে চলেছে দেখে সেই মাধবীলতা আলোকবর্তিকা বাহীকে সুখ সম্ভাষণ জানাচ্ছে। তুষার কলিং বেলটা চাপল। মুহুর্তের মধ্যে চিচিং ফাঁকের দরজা খুলে গিয়ে বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো একদল সুন্দর ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল। প্রায় একইরকমের পোশাক তাদের। হাস্যমুখর সেই নরনারীর সকলেই গেটের বাইরে চলে যাচ্ছে। শেষের একটি সুন্দর কিশোরকে ধরে তুষার জিজ্ঞেস করল,
— মিসেস চ্যাটার্জী আছেন ভেতরে? একটু ডেকে দেবে?
— কে? ম্যাডামের কথা বলছেন?
— রমোলা চ্যাটার্জী।
— হ্যাঁ, ম্যাডাম।
— হুম। উনি কি কিছু পড়ান?
— হ্যাঁ, ভরতনাট্যম শেখান।
— ক্লাস চলছিল?
— হ্যাঁ, এইমাত্র শেষ হয়েছে। দাঁড়ান, আমি বলছি ম্যামকে।

তুষার ভাবল ভুল সময়ে চলে এসেছে। এখন বোধহয় রমোলা ব্যস্ত থাকবে, কথা বলা হবে না ঠিক করে, অথবা কথা শুনলেও ঠিক করে গুরুত্ব দেবে না। ঠিক করে না শুনলে তুষারের প্রতিহিংসা চরিতার্থ হবে কী করে, নাকি সে মিস্টার চ্যাটার্জীর কাছে হেরে যাবে! মিস্টার চ্যাটার্জীর কথা গুলো কানে ঝনঝন করে বেজে উঠল তুষারের,
— রমোলা এসব কথার কোনও গুরুত্ব দেবে না। আজ পনের বছর ধরে ওকে চিনি। কিস্যু করতে পারবে না তুমি…

মাথাটা ধরে গেল তুষারের। সে এখনও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, চলে যাবে? থাক, যা হবার হবে, মনে যা জিনিস জমে আছে তা না বলা পর্যন্ত শান্তি নেই। সেই ছাত্র ছেলেটি ফিরে এসে বলল,
— যান, আপনাকে ভেতরে যেতে বলল। আসুন আমি নিয়ে যাচ্ছি বরং ।
ছেলেটির সাথে তুষার এগিয়ে গেল ভেতরে। ছেলেটিও নরম তরম, তুষার ভাবল এ ছেলেও আমাদের কমিউনিটিরই হবে। অন্য জায়গা হলে একটু কথা বলা যেত। ভাবল ছেলেটিকে কি একটু অপেক্ষা করতে বলবে তুষার। ভেতরে বসার জায়গায় বড় সোফা, তাতে সাদা সুতোর ক্রুশের কাজের কভার দেওয়া আছে। ছোট টেবিলে সুসজ্জিত ফুলদানি, বসার এইখানটুকু মেঝেতে রঙীন নক্সার কার্পেটের আস্তরণ। তুষার ফিরে তাকাতেই দেখল সেই ছেলেটি চলে গেছে। তার বদলে সামনে ছিপছিপে এক মাঝবয়েসী মহিলা এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু এক ঝলক দেখলে মহিলাকে না মাঝবয়েসী বলে মনে হয় না মহিলা বলে সম্বোধন করতে ইচ্ছে করে। একটা সাদা আর গোলাপি ক্রেপের শাড়ি পরে আছেন মহিলা। সোফার একটি সিঙ্গল ইউনিটে বসে মহিলা বললেন,
— আপনি কি অনুষ্ঠানের জন্য এসেছেন?
— না।
— তবে?
— আমি বেঙ্গালুরু থেকে এসেছি। মিস্টার আকাশনীল চ্যাটার্জী সেখানে একটা এজেন্সিতে আমার বস ছিলেন।

মহিলা এবার সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। মহিলার দেহভঙ্গি দেখে তুষারের মনে হল যেন মহিলা তুষারকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেন তুষারের কথাগুলো শোনার জন্য মহিলার হাতে অনেকটা সময়। এটা দেখে তুষারের খুবই ভাল লাগছে, লড়াইয়ের প্রথম অঙ্কটা যেন জিতে গেছে সে।

তুষারের সাথে আকাশনীলের প্রথম আলাপ প্রায় আড়াই বছর আগে ব্যাঙ্গালোরের একটা আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। একটা তুখোড় প্রেসেন্টেশনের পর আকাশ এসে হ্যান্ডসেক করে গেল,
— তোমার তো আরও ভাল জায়গায় থাকা উচিৎ! আমাদের ফার্মে চলে এসো। হতাশ করব না।
হতাশ করব না! শেষের এই কথাগুলো তুষারের মর্মস্থলে একেবারে সর্পের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল কনফারেন্সের পরের বেশ কয়েকটা দিন। আর কেনই বা দিবানিশি আকাশের মুখের ভাবটি বারবার তুষারের সামনে আসবে না! অতো দামী ফার্মের একজন কর্তাব্যক্তি অথচ চোখেমুখে কী অনিয়ন্ত্রিত ইঙ্গিত তার! ওইটুকু সময়েই নিজের ঠোঁট কামড়ে, চোখ ছোট করে যে অভিব্যক্তির প্রসার মিস্টার আকাশনীল ঘটিয়েছিলেন তাতে তুষারের বুঝতে বাকি ছিল না ‘ তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ ‘। হায় রে! সর্বনাশ হবে জেনেও সে রূপের অরূপ হাতছানি উপেক্ষা করা যায় নি। কিচ্ছু জানতে চায় নি তুষার, কিচ্ছু না। শুধু জেনেছে আকাশ তার নতুন ফার্মের সিংহভাগ শেয়ার হোল্ডার,আকাশ ভাল ডিজাইনার, আর…! আকাশ মাঝবয়েসী একজন সুপুরুষ। সমুদ্রের পাড়ে একটা হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো পরলেই আকাশের বয়স এক কুড়ি কমে যায়, আকাশ ঘরে বাইরে, অন্তরে বাহিরে, শরীরে মনে ভীষণ উদ্দাম। আর এই উদ্দামতাই তুষারকে একঝটকায় তার নবনির্মিত স্বপ্নের সাথে ডেকে নিয়ে গেছে আকাশের অ্যাপার্টমেন্টে।
বিগত আড়াই বছর ধরে ফার্মের যা কিছু উন্নতি তার পেছনে তুষারের অবদান কিছু কম নয়। আর সে কথাই যেন নিরলস শরীরী আবেগে, চুম্বনে, শয়নে স্বপনে জাগরণে আকাশ একটু একটু করে বুঝিয়ে দিয়ে ঋণ শোধ করেছে । একসময় কাজের ভার কমে এল,
— তুমি বিয়ে কর নি কেন?
ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই আকাশ বলল,
— কতবার করব?
— মানে?
— মানে আবার কী! আমার বিয়ে হয়ে গেছে…
প্রথমটা তুষারের বিশ্বাস হয় নি। বলল,
— ইয়ার্কি করছ?
— না!… কিন্তু তুমি এত অবাক হচ্ছো কেন ?
এ ঘরে বেশি জায়গা নেই, জিনিসপত্রে ঠাসা। এই নিয়ে তুষারের অভিযোগ আছে। তবু যেন হঠাৎ ঘরটা বড্ড ফাঁকা হয়ে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি যেন একলাফে দূরে চলে গেছে।
— আমায় তো কোনওদিন বল নি…
— কী বলব? সবাই কে গিয়ে বলব! শোনো, আমার না বিয়ে হয়ে গেছে, বউয়ের এই বয়স।আর আট বছরের একটা ছোট বাচ্চা ছেলে আছে, আরও দুটি মেয়ে আছে…আজব! তুমি আমায় জিজ্ঞেস কর নি, তাই বলিনি…
তুষারের এক বিচিত্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। কিন্তু সে এই হঠাৎ প্রকট হওয়া পাষানরূপের কাছে সেই প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটাতে নারাজ। ঢোক গিলে ফেলছে, কিছুটা ভয়ে, কিছুটা অনিশ্চয়তায়, বাকিটা ঘৃনায়। বিশেষত আকাশের শেষদিকের ব্যঙ্গ করে বলা কথাগুলো যেন তাদের এই দু-আড়াই বছরের নিভৃত নিশ্চিন্ত সংসারে বড়ই বেমানান। তুষার বিশ্বাসই করতে পারছে না এই মানুষটা এত সুচারুভাবে, এত দক্ষতার সঙ্গে তার বৈবাহিক জীবন লুকিয়ে যেতে পারে! আর সেই মানুষই একদিন হঠাৎ এমন নির্বিকার ভাবে একটা বড় জাহাজকে এইভাবে মগ্নপাষাণে আছড়ে ফেলে নষ্ট করার মতো সেই সব গোপন কথা এমন নির্বিকার হয়ে বলে দিতে পারে! তার কোনও ভয় নেই! এমন পরিপাটি মানুষের মনে এমন কালসর্প লুকিয়ে থাকে! তুষার নিজেকে বড় দোষ দিল, লালসা কি তার কম ছিল? এতদিন ধরে তিলে তিলে এই মানুষটার সাথে স্বপ্নসংসার গড়েছে সে। এই করে সে তার পেশাগত সাফল্যের সাথেও আপস করেছে , আর আজ হঠাৎ এমনি করেই…
আকাশনীল আড়চোখে সারাটা সন্ধ্যে তুষারকে দেখে নিয়ে শেষে বলল,
— একটু বেশিই ভাবছ, আমরা তো আর বিয়ে করতাম না!
— ঠিকই বলেছ, শুধু বিয়েটাই যা বাকি ছিল।
আকাশ ভেংচি কেটে বলল,
— বড্ড ন্যাকা তুমি, ছেলেদের এমন ন্যাকামি দেখলে জুতোপেটা করতে হয়…

জুতোর ঘা এসে লাগল তুষারের গায়ে। আর একসাথে থাকা যায় না। মানুষের রূপ বদলে গেছে। তুষার যেন সেই কনফারেন্সের দিনে এই লোকটিরই অসভ্য ইঙ্গিতের ছবি সামনে দেখতে পেল। দুই ছবির আশ্চর্য মিল। আকাশ হাত চেপে ধরল,
— তুমি এ বাড়ি থেকে যেতে পারবে না…
— কেন?
— কারণ আমি বলছি তাই…
একমুহুর্তের জন্য তুষারের মনে হয়েছিল, সামান্য ভালবাসার জোরটুকুই যেন এই দাবি খাটাচ্ছে। ঘোর কেটে গেল সাথে সাথেই। তুষার বুঝল এ কোনও অসহায় প্রেমিকের আর্তনাদ নয়, বরং এক দাম্ভিক স্বেচ্ছাচারের হুঙ্কার। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তুষার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার নিষ্ফল চেষ্টা করল। আকাশ যেন একটু শান্ত হয়েছে,
— আচ্ছা ঠিক আছে, রাগ করো না, মুখ ফসকে বলে ফেলেছি।
আর একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করছে না তুষারের। লোকটার একটা সংসার আছে সেটা জানতে পারাটা বেদনাদায়ক, কিন্তু তার পরের ব্যবহারটা আকাশের খুবই খারাপ। নিমিষে যেন মনের কুয়াশা কেটে গেছে তুষারের। আকাশ কে এতদিন ধরে দেখেছে তুষার, আকাশ যতই বাইরে থেকে খুব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করুক, আসলে ও নিজেও উদ্বেগে আছে। আকাশ বিবাহিত হবার পরেও একটা ছেলের সাথে এমন প্রেমজ সম্পর্ক রেখে চলেছে, সেটা এমন সরলায়িত করার ছেলে আকাশ নিজেও নয়। তবু কী পরিহাস! সে কাজে জড়িয়ে পড়া, এই ধরনের একটা সম্পর্ক রাখা যেন জীবন অতিবাহিত করার জন্য তার কাছে খুবই জরুরি।
আকাশের সাময়িক অনুতাপকে পাত্তা না দিয়ে তুষার বেরিয়ে এসেছে, শুনতে পেল,
— যাও, যাও, সাথে সাথে অন্য একটা চাকরিও খুঁজে নিও।
নাঃ! অসভ্য লোকটার দাঁতনখ পুরোটাই বেরিয়ে পড়েছে। তুষারের চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। আকাশের বাক্যবাণ এখনও থামে নি,
— পেটি মিডল ক্লাস, লোয়ার মিডল ক্লাস মেন্টালিটি। এই মনোভাব নিয়ে থাকলে বেশি উন্নতি করতে পারবে না। সাফল্যের পথে পথে অনিয়ম, মনের দুর্বল ভাবগুলো কে পায়ে দলে এগিয়ে যেতে হয় সেখানে। তুমি এসব পারবে না, কোনওদিনও না…

কথাগুলোতে তুষারের মনে হয় জেদ চেপে গিয়েছিল। একবার দেখতে চাইছিল সে, নিজের মনের দুর্বল জায়গাগুলোকে সে দগদগে ঘায়ের মতো একেবারে হাট করে অন্য কারো সামনে খুলে দিয়ে সেগুলির মেরামত করতে পারে কি না। সাফল্য কি শুধুই তার পেশাগত উচ্চাশায় আটকে? যে লোকটা তার সবটা জেনে নিয়ে তাকে এভাবে অপমান করে একেবারে ভিখারি করে দিতে পারে, তার সাথে তুষারের দ্বৈরথ জয়ের কোনও সফলতা নেই নাকি! নিশ্চয়ই আছে। আর সেই মনোবীক্ষণে বিবশ হয়ে তুষার একেবারে রমোলার কাছে এসে হাজির। স্ত্রীকে স্বামীর সব কীর্তি কুকীর্তির কথা জানিয়ে তবে শান্তি তার।

রমোলা বললেন,
— বলুন, কী বলবেন…
রমোলার চোখের দিকে যেন তাকাতে পারছে না তুষার। এই পঁচিশ বছরের জীবনে ছেলেসঙ্গ তার কম হয় নি। কিন্তু এ কথা তার খুব কাছের বন্ধুও জানে না, কাউকে সে বলে নি। বলার সুযোগ পায় নি, সাহস করে উঠতে পারে নি, বলার প্রয়োজন মনে হয় নি। যেভাবে দিনের পর দিন নিজের ভীষণ পরিচয়, জীবনের একেবারে গোপন যাপনটিকে সে সকল উদযাপনের থেকে এড়িয়ে গেছে তাতে যেন তার নিজেরই মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এই ছেলেসঙ্গ যেন সে নিজেও মন থেকে মেনে নিতে পারে নি, নিষিদ্ধ সে অভ্যেস যেন কারও অভিশাপের কষাঘাত হয়ে ক্ষণে ক্ষণে এসে নাড়া দিয়ে গেছে। আর আজ এই কঠিন সত্যি কথাগুলো একেবারে অপরিচিত এক অতিশয় সুন্দর রমণীর কাছে এমন কদর্য ভাবে বলতে হবে দেখে তুষারের গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে যাচ্ছে। মনে হল আকাশের অন্যায়ের কাছে তার এই অভিযান যেন খুবই ক্ষুদ্র, কম সাহসী, তাই বলল,
— কীভাবে যে শুরু করব সেটাই বুঝতে পারছি না…
রমোলা সেই একইরকম দৃঢ় ও শান্তভাবে বসে অপলক দৃষ্টিতে বললেন,
— সোজাসুজি বললেই হবে… আমি কিছু সাহায্য করব?
রমোলার এই কথায় তুষার প্রথমে মনে মনে হাসল। তারপরেই অবাক হল, কেমন যেন একটা সন্দেহের দানা মনে জমেছে তার। প্রশ্ন করল,
— আপনি সাহায্য করবেন মানে? আপনি জানেন আমি কী বলতে এসেছি?
— আন্দাজ করতে পারি।
তুষার ভ্রূ কুঞ্চিত করল। রমোলা যেন সেটা দেখেই সরাসরি বললেন,
— আকাশ তোমার সাথে কিছু করেছে?
বিদ্যুৎ খেলে গেল তুষারের সারা শরীরে। এ কী! এ কী করে সম্ভব! এই মহিলা আগে থেকেই কী করে জানেন যে তাঁর স্বামী তুষারের সাথে কিছু করতে পারে? কী করার দিকেই বা তাঁর ইঙ্গিত? তুষার যেন আরও হতভম্ব হয়ে পড়েছে। রমোলা সেটা বুঝে ফেলে বললেন,
— দ্বিধা কোরো না, যা বলতে এসেছ, বলো। মন হালকা করো। আর কার কাছেই বা বলবে!
রমোলার কথা যত শুনছে ততই যেন অবাক হয়ে যাচ্ছে তুষার। এই শেষের কথাগুলোতে রমোলা কে যেন মাতৃমূর্তি মনে হচ্ছে, সেই একটা স্নেহের পরশ এই দূরের বসার জায়গা থেকে যেন তুষারের মাথায় হাত বোলাচ্ছে এই বলে যে, এসো, তোমার ভারলাঘব করি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তুষার আরোই নিশ্চুপ হয়ে গেল, বেকুবের মতো বসে হাঁ করে রমোলার দিকে তাকিয়ে আছে। রমোলা বললেন,
— এই বাড়িতে আমরা পাঁচ বছর হল এসেছি। আগের পাড়া থেকে হঠাৎ উঠে আসতে হল। বাড়ির চারপাশে আকাশ কে নিয়ে পোস্টার পড়েছিল। লজ্জায় মাথা কাটা গিয়েছিল আমাদের সকলের। সেখানে আর থাকতে পারি নি আমরা। আমার একার তো আর অত সামর্থ্য ছিল না। আকাশই এই নতুন বাড়িতে আমাদের নিয়ে আসে। সেই সময়েই ও ঠিক করে যে ও বেঙ্গালুরুতে চলে যাবে, কিছুদিনের জন্য। কিন্তু পাঁচ বছর হয়ে গেল।
পোস্টার পড়েছিল, বেঙ্গালুরু চলে যেতে হল! কী এমন হয়েছিল? তুষার উৎসুক হয়ে উঠল,
— কী – হয়েছিল?
— এই… যা তোমার সাথে হয়েছে… বোধকরি…
— আপনি জানেন আমার সাথে কী হয়েছে? কেন এসেছি?
— ওই যে বললাম, আন্দাজ করতে পারি। নইলে কাজের জায়গা থেকে আকাশের স্ত্রী-র কাছে এমন একজন তরুণ কী দাবি নিয়ে আসতে পারে? তোমার মত কেউ এলে অন্য কোনও কিছুর আগে আমার এটাই মনে হয় যে আকাশের সাথে কোনও প্রেমজ সম্পর্কের খতিয়ান নিয়ে জবাবদিহি চাইতে এসেছে তার কোনও প্রেমিক। তোমাদের মুখ এখন চেনা হয়ে গেছে। কী জানি! মনে হয় যেন তোমাদের মুখের মধ্যে আশ্চর্য এক মিল। সে মিল হয় দীর্ঘদিন আকাশের সাথে সহবাসের ফলে হয়েছে, নতুবা একই রকম আঘাতজাত। মনে হয় যেন ফুটফুটে মুখগুলোর মধ্যে কেউ যেন কষিয়ে একটা চাবুকের বাড়ি মেরেছে, আর আমি সেই দাগ দেখতে পাচ্ছি। কে আর মারবে! যে মেরেছে সে তো তোমার আমার দীর্ঘদিনের চেনা । কী আশ্চর্য না! তোমরা সকলেই ভাব যে আমি, যে কিনা আকাশের স্ত্রী, স্বামীর সকল কাজের বিচার, ন্যায় অন্যায়ের পরিমাপ করে ফেলে একটা সাজা দিতে পারব। তোমরা সকলেই যে কী বোকা! ভাব যে এতটা শক্তি এখনও সমস্ত মেয়েদের হয়ে উঠেছে।
আরও শূন্য হয়ে যাচ্ছে তুষার। এই মহিলা এসব কী বলছেন। তবু যেন একটু যুঝে নিতে ইচ্ছে হয়,
— তোমরা মানে?
— বিয়ের পর নজরেই এসেছে অন্তত জনা পাঁচ ছয়েক তো হবেই। বেঙ্গালুরু থেকেই দুজন মেসেজ করত। আমি কয়েকবার কথা বলেছি, তারপর ব্লক করে দিয়েছি। আমিও তো মানুষ! এ নিয়ে আকাশের সাথে কম ঝগড়া হয় নি আমার। এক সময় তো মনে হতো ওই-ই আমার যোগাযোগের ঠিকানা, নম্বর ওই ছেলেদের দিয়ে দেয়। যে জায়গাটা ও ধরে রাখতে পারে না, আমার কাছে ঠেলে দিয়ে দায় সারে। এসব মনে হওয়া এমনি এমনি হয় নি। আকাশের বয়ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলেই হয়েছে। সবাই তো আর আমার কাছে অভিযোগ জানাতে আসত না, তবেই বোঝো আরও কত সঙ্গ নানা সময়ে ওর ছিল!
মহিলা কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর বিষাদ নিয়ে আবার শুরু করলেন,
— যে বার পাড়ায় পোস্টার সেঁটে দিয়ে গেল, সেবারের ছেলেটির মতো প্রবল সাহসী ছেলে আমি কখনও দেখি নি। দুর্দান্ত ছিল যেন সে, প্রবল প্রতিহিংসার জ্বালায় সে জ্বলছিল। আমি আকাশ কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি ছেলেগুলোকে এমন মরিয়া করে দাও কেন? সম্পর্ক রাখবে না ঠিক আছে, সম্পর্কের শেষটুকু তো একটু ভাল করে করতে পার! ও বলেছিল, তুমি এসব বুঝবে না, এসব ছেলেদের ব্যাপার,দেখি না কতটুকু করে। খুব রাগ হয়েছিল আমার, ঘেন্না হয়েছিল। বুঝেছিলাম নোংরা খেলায় মাঝে মাঝে ও মেতে ওঠে। বড় অসহায় লেগেছিল নিজেকে। একবার তো ভেবেছিলাম, এক ছেলেকে বলে দিই যে ওর বিরুদ্ধে আইনের সাহায্য নিক। তারপরেই পিছিয়ে এসেছি। আমার কাছেই তো সে পথে যাবার উপায় আছে, কিন্তু নিজে সে সাহসটুকু করে উঠতে পারি নি, অন্য কাউকে আর বলি কী করে ! মেয়েরা তো শুধু আর একা একা মেয়ে নয়, মেয়েরা নিজেরা গোটা একটা পরিবার, কখনও একটা প্রতিষ্ঠান। ছেলেদের কাছে স্বার্থপরের মতো নিজের নিজের উপায় থাকে, কিন্তু মেয়েদের সে উপায় থাকে না। সবসময় ভাবি, এইবার আকাশ ঠিক হয়ে যাবে, বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় চলে আসবে, আমার তিনটি বাচ্চার ভরপুর দায়িত্ব নেবে, বাইরের সাজানো বাগানের মতো একটা সুখের সংসার হবে। টাকা দিলেই তো আর সংসার হয় না। আমি যেন আগে থেকেই হেরে বসে আছি, ওকে ক্ষমা করে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত। আর ও যেন প্রত্যেকবার নিজের সাহসের সীমা বাড়িয়েই চলেছে। আমার এখন মনে হয়, প্রথম যেদিন ওর পুরুষপ্রেমের কথা জানলাম, সে দিনটা আগ বাড়িয়ে ওকে না জানালেই হতো, ঝগড়া মান অভিমান টা সেদিন না করলেই হতো। আমার কাছে ওর এই ব্যাপার চিরগোপন থেকে যেত, আর একটা করে সাহসের গণ্ডি ক্রমশ টপকে গিয়ে আমাদের সম্পর্কের ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকু এইভাবে গলা টিপে হত্যা করতে পারত না… আমরা বেশি কিছু পারি না, খুব বড়লোক বাড়ির মেয়ে হতাম বা একেবারে গরিব বাড়ির, তবে হয়তো একটা বড় প্রতিবাদ হতো, কী জানি! হয়তো তবুও পারতাম না। মধ্যবিত্ত মেয়ের সাধ শখ আহ্লাদ প্রতিবাদ অনেক ছোট বেলাতেই শেষ হয়ে গেছে।
তুষার হতবাক হয়ে গেছে। স্বামীর এমন অন্যায় নিয়ে কী করে এক মহিলা এত নিস্পৃহ হয়ে থাকতে পারে! তুষার তবু একটা মোক্ষম প্রশ্ন করার চেষ্টা করল,
— আমার জায়গায় একটা মেয়ে থাকলেও কি আপনি এমনটা বলতে পারতেন? ছেলে বলেই কি এমন নিস্পৃহ শোনাচ্ছে আপনাকে? ছেলেদের কি মান-ইজ্জত নেই? ব্যাপারটা আমাদের এতই গা সওয়া?
রমোলা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
— ব্যাপারটা অন্যরকমও হতে পারত, তাই না? আমার স্বামীর একাধিক সমকামী সম্পর্ক রয়েছে সেটা শুনে আমার মাথায় বজ্রাঘাত হতে পারত, কিন্তু হয় নি। আমি শুধু দেখেছি আমার স্বামীর বিশ্বাসভঙ্গের দিকটি, আর মিলিয়ে নিয়েছি তার পূর্বের ঘরকন্নার আচরণের সাথে। ঠিক সেদিন থেকেই আমি মানিয়ে নিতে শুরু করেছি। তোমার শুনলে খারাপ লাগবে, তবু বলি, এই যে এতগুলো ছেলের সাথে সম্পর্কের ঘটনাগুলো জানলাম, তারপর আমার মনে হয়েছে দুটো ছেলে যত সহজে সহবাস করতে পারছে, একটা মেয়ে হলে সেদিকটায় এতটা দ্রুত হয়তো এগোত না। যে মেয়ে ওভাবে দ্রুত এগোয়, সে মেয়ে প্রেমিকের বউয়ের কাছে অভিযোগ জানাতে আসে না। তুমি একটু ভেবে দেখো, ওর আকর্ষণ তুমি উপেক্ষা করতে পারতে, তবু তুমি বয়ে গেছ।
— আপনি উল্টে আমায় দোষারোপ করছেন?
— না, দোষারোপ করছি না। এটা বলতে চাইছি, যে রাগ নিয়ে তুমি তোমার প্রেমিকের বউয়ের কাছে নালিশ করতে এলে তার সারবত্তা সত্যিই কতটা। সত্যিই তুমি কতটা দুঃখ পেয়েছে, বঞ্চনা পেয়েছ নাকি আকাশের সাথে হঠাৎ হঠাৎ আকাশকুসুম স্বপ্নে দেখা সুখের প্রাসাদ আচমকা ভেঙে যাওয়াতেই তোমায় আজ এখানে আসতে হল। স্বপ্ন দেখার আগে একবার পরখ করে নিলে না?
— আপনি নিয়েছিলেন পরখ করে?
— না, আমার সে উপায় ছিল না…
— আচ্ছা, আপনি কি সত্যিই এতটা দুর্বল, এতটাই নিরীহ? নাকি আমার রোষ থেকে বাঁচতে আপনি এসব ভণিতা করছেন?
— তুমি আমার উপর রোষ দেখাবেই বা কেন? কেন তোমার মনে হয় যে আমি ভণিতা করছি?
— কারণ আকাশের অনেক কথার সাথে আপনার কথার অনেক মিল…
— যদি বলি আকাশ আমায় এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে, বিশ্বাস করবে?
— বাধ্য করেছে?
— হ্যাঁ।
— কেউ এভাবে জোর করতে পারে? বিশেষত যখন এখানে তার উপস্থিতিই নেই!
— কী করতাম আমি? হয় ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যেতাম, নয়তো এমন কিছু করতে যেতাম যা করার সাধ্য আমার মোটে নেই। সেসব হলে ব্যাপারটা মনে হয় সবার মনের মতো হতো তাই না?

সিঁড়ি বেয়ে এক পা, দু’পা করে একটা বাচ্চা ছেলে এসেছে বসার এই জায়গায় । বছর সাত-আট হবে। বাচ্চাটিকে কোলে টেনে নিয়ে রমোলা বললেন,
— আঙ্কল কে হাই করো… এই আমার কনিষ্ঠ, বাকি দুজন এখনও স্কুল থেকে ফেরেনি।
ফুলের মতো নিষ্পাপ একটি শিশু , তার মুখে আকাশেরই ছায়া। এপারে ওপারে দুই প্রেমবিরাগী নরনারীর সম্পূর্ণ ভিন্ন আখ্যান বাড়িটির কোণায় কোণায় বাজছে যেন। বাচ্চাটির দিকে তাকিয়েই তুষারের মনে হল, কতই না বিপ্লব করতে এসেছিল সে আজ। নিজের প্রেম বিরহ বিচ্ছেদ প্রবঞ্চনার কথা কীভাবে শুরু করবে, কী কী বলবে তা নিয়ে কতই না মহড়া দিয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। তার নিজের তো কিছু বলা-ই হলো না । কিন্তু রমোলার কাহিনী শুনে যেন এক অন্য পৃথিবীর রূপ দেখতে পেল তুষার। মানুষ এমন হয়! মেয়েরা এমন হয় ?এমন মাটির হয়ে যায় যে ধুলোকাদার মতো পা দিয়ে মাড়িয়ে যাবার পরেও তাদের গায়ে সোনা চিকচিক করে। কী এক অশ্রদ্ধা, অপমান বুকে করে আছে এই সুললিত মুখশ্রী। এতসবের মধ্যেও সে নিজেকে দীপাবলীর প্রদীপের মতো উজ্বল করে রেখেছে।এক ফাঁকে রমোলা উঠে গিয়ে প্লেটে করে তিন-চার রকমের মিষ্টি নিয়ে এলেন । বললেন, খাও, বেঙ্গালুরুতে চট করে কলকাতার মতো মিষ্টি পাও না তো! এমন একটা সময়ে মিষ্টি খেতে ভারী আশ্চর্য লাগল তুষারের, তবু সে সবকটিই খেলো।
— ম্যাডাম, আমি তবে চলি।
— এসো, ওকে একসময় ভুলে যাবে জানি, পারলে ক্ষমা করে দিও, নিজে মনে শান্তি পাবে।
তুষার আর কিছু না বলেই দরজার দিকে মুখ ফেরাল। দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে রমোলার দিকে ফিরে বলল,
— এত কথার মাঝে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম… আপনার বাড়িটি খুব পরিপাটি, সুন্দর ফুলের বাগান, জিনিসপত্রে সাজানো… খুবই সুন্দর!
রমোলা ছেলেকে কোলের কাছে টেনে একগাল হেসে উজ্বল চোখে জবাব দিলেন,
— সুন্দর করে রাখতে হয়…

কীসের যেন একটা সুর বেঁধে দিল এই মাঝবয়েসী মহিলার শেষ কথাগুলো। আসার সময়ের ক্লান্তিটা আর নেই তুষারের । গাড়ি নয়, হেঁটেই সামনের মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত যাবে সে। তারপর মেট্রোর ভিড় ঠেলেই এয়ারপোর্টে যাবে । পথে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে মাটির বড় ভাঁড়ে এককাপ দুধ চা খাবে । বাগানে মাঝের বাঁধানো বাঁকাপথে যখন তুষার সবে পা দিয়েছে তখন চারপাশ থেকে ফের যেন আকাশনীলের বাঁকা কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি শুনতে পেল,
— কী হল! বলেছিলাম না, কেউ কিচ্ছু পাত্তা দেবে না! ছোট খোকা নালিশ কত্তে এচেচিল… উলি বাবালে, আসো আসো তোমায় এত্তু দুদু খাওয়াই… যত্তসব পেটি সেন্টিমেন্ট! মিডল ক্লাস মেন্টালিটি! তোর মতো বহু ছেলেদের আমি নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছি। নতুন চাকরি খুঁজে নিস। দেখব! দেখব! কতদূর কেরিয়ার হয় তোর, আমাকে ছেড়ে দেওয়া…

ইশ! শেষের কথাগুলো একটু ভাল করে বলতে তো পারত লোকটা! মনে ভাবল তুষার। সে এখন কানে হেডফোন গুঁজে দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের একটা কোম্পানি থেকে এইমাত্র একটি অফার লেটার ই-মেইলে ঢুকেছে তার।

ছবিঃ অর্ক ঘোষ

<< কালিজা ২০২২ (৫ম বর্ষ) – সূচীপত্র


Exit mobile version