কাঁচালঙ্কা

লাস্ট ইনিংস

[শুরুর আগেঃ

রাজর্ষির সাথে আলাপ ফেসবুকে, দেখা করা হয়ে ওঠেনি কখনো। আসলে মনে হয়েছিলো পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ শুধু না, আরও বিভিন্ন জায়গার এলজিবটি+ বাঙ্গালীদের সাথে আলাপ করি, সেভাবেই রাজর্ষিকে খুঁজে পাওয়া। ত্রিপুরা রাজ্যটার নাম ভারতের এলজিবিটি আন্দোলনেই বা কতোবার উচ্চারিত হয়? রাজ্যটাকে ম্যাপে দেখাতে বললেও বা ক’জন বাঙ্গালী পারবে সেটা? যাক সে কথা। বলেইছিলাম, যে এ বছরের কাঁচালঙ্কা শেষ হচ্ছে দুটি “মধুরেণ সমাপয়েৎ” গপ্পো দিয়ে, এটিই তার দ্বিতীয় আর আপাতত কালিজা ২০১৮-এর শেষ লেখা। বন্ধু রাজর্ষি, মার্চের মাঝামাঝি তোমাদের বইমেলায় প্রকাশ পাচ্ছে তোমার বই “ডিউরিং দ্য ফল”। অনেক শুভেচ্ছা রইলো তোমার জন্যে। আচ্ছা বন্ধু, তুমি কি জানতে যে এই লেখা দিয়েই আমরা এবারের কালিজা শেষ করবো? তাহলে নামটা অমন রাখলে যে? লাস্ট ইনিংস?]

লাস্ট ইনিংস

রাজর্ষি ভট্টাচার্য

শিবা ব্যাট করতে নামে তিন নম্বরে। হারু বা বিশু আউট হওয়ার পরেই। আজ শিবার স্কুলের ফেয়ারওয়েল ম্যাচ, বিদায়ী টেন ও টুয়েল্ভের ছাত্রদের মধ্যে। শিবা ক্যান্ডিডেট উচ্চমাধ্যমিকের, জেতার কথা তাদেরই। কিন্তু টেনের প্র্যাকটিস বেশী, জেতার ইচ্ছেটাও। দাদাদের জিতিয়ে বিদায় দেওয়ার খুব একটা ইচ্ছে তাদের নেই। তাই এই ম্যাচ একপেশে হবে, এই কথা বলার মতো লোক আজ খুঁজে পাওয়া ভার।

টেনিস বলের ম্যাচ, তাই প্যাড-গ্লাভস লাগাবার কোনও প্রয়োজন নেই। কাটের গ্যালারীর একপাশে বাকি টিমের সাথে খেলা দেখতে বসা শিবার মনে শুধু একটিই প্রার্থণা – আজ যেন হারু তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যায়। বিশুর সাথে এই লাস্ট ইনিংস খেলার চান্স শিবা কোনমতেই হারাতে চায়না।

লুকিয়ে লাভ নেই, শিবা বিশুকে ভালোবাসে। শরীর-মন দুটো দিয়েই। এই ভালোবাসা যে শুধু বন্ধুত্ব নয়, তা শিবা বুঝতে পারে আজ বছরখানেক হলো। রাতের স্বপ্নে বিশুর এসে শিবাকে চুমু খাওয়া শুধু বন্ধুত্বের চেয়ে যে একটু বেশী, তা আজ শিবার অজানা নয়।

তৃতীয় ওভারের শুরুতেই হারু আউট। ম্যাচের তখনো আরও সতেরো ওভার বাকি। এই সতেরো ওভারের পুরোটাই শিবার বিশুকে চাই। এই লাস্ট ইনিংস হাতছাড়া সে হতে দেবেনা।

শিবাকে নামতে দেখে একটু হাসলো বিশু, সামনে এসে কিছুই বললোনা। স্টান্স নিয়ে বাকি ওভারটা দেখে কাটিয়ে দিলো শিবা।

রান খুব একটা উঠলোনা পরের পাঁচ ওভারেও। শিবা এবং বিশু – কারোরই যেন রান করার খুব একটা ইচ্ছে নেই। দুজনেই সাবধানী – দুজনেই আজ আউট না হওয়ার পণ করে এসেছে।

দর্শকের দুয়ো উঠতে শুরু হওয়ার পরই শিবা এগিয়ে যায় বিশুর দিকে

পরের দু’ ওভার – রান উঠলো কিছু। কিন্তু দর্শকদের দুয়ো বেড়েই চলেছে। গ্যালারী থেকে টিমমেটরাও দু’জনকে আউট হয়ে যাওয়ার ইশারা দিতে শুরু করছে।

দশ ওভারের ইনিংস ব্রেকে ক্যাপ্টেন সুজয় দৌড়ে এলো মাঠে।

——

এক অদ্ভুত নাম-না-জানা আনন্দে ভরে ওঠে বিশুর চোখমুখ।

দু’জনে চুপচাপ একটু। অপোনেন্টের ছেলেরা রিল্যাক্সড। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্রেকের দশ মিনিট কাটাচ্ছে। ম্যাচ এখন তাদের হাতের মুঠোয়।

কথাটা বলেই হঠাৎ দুই তালুতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করে বিশু।

টোটাল অবাক শিবা বুঝতে পারেনা কি করা উচিৎ। মুহুর্ত পরে বিশু মুখ তোলে।

একসাথে লক্ষ প্রজাপতি জনগণমন গাইতে শুরু করলেও হয়তো এতো অবাক হতোনা শিবা। দু’হাতে শিবা জড়িয়ে ধরলো বিশুকে, বুকের মধ্যে, মাঠের একদম মাঝখানে, কয়েকশো উৎসুক চোখের সামনে।

হঠাৎ বাকি মাঠ ঝাপসা হয়ে গেলো বিশুর কাছে, ওর সামনে শুধু শিবা। আর শিবার সামনে শুধুই বিশু।

এর পরেও কি আর কথা চলে? বিশুর ঠোঁটগুলো হঠাৎ খুঁজে পেয়ে যায় শিবাকে, আর দুই জিভের মধ্যে অদ্ভুত ঠাণ্ডা লালার স্রোত যেন কিছু বোঝার আগেই দু’জনের ভিতরের সব ভয়-অভিমান-হতাশাকে উপড়ে ফেলে দিতে শুরু করেছে, পাক্কা সাতশো বাইশটি চোখের সামনে, যারা তাদের সামনে এক খোলা আকাশের নিচে এক প্রেম এবং একদঙ্গল ভালোবাসার জন্ম দেখছিলো – ভয় ভুলে, ঘৃণা ভুলে।

[ছবিঃভুটান]


Exit mobile version